টানা ৩২ বছর টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর উপজেলার কালিয়াকৈর গ্রামের দরিদ্র মানুষদের চিকিত্সা দেওয়ার পর মারা যান ডাক্তার ভাই হিসেবে পরিচিত ডাক্তার এড্রিক বেকার। দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে অনেকেই চেয়েছিলেন ওনাকে ঢাকাতে নিয়ে গিয়ে চিকিত্সা দিতে। তিনি ঢাকা যাননি। তার তৈরি করা হাসপাতালেই তিনি ২০১৫ সালে মারা যান।
মৃত্যুর পূর্বে তিনি চেয়েছিলেন এই দেশের কোনো মানবতবাদী ডাক্তার যেন গ্রামে এসে তার প্রতিষ্ঠিত এই হাসপাতালের হাল ধরেন। কিন্তু হানিফ সংকেতের ইত্যাদিতে প্রচারিত প্রতিবেদন অনুসারে, এ দেশের একজন ডাক্তারও তার সেই আহ্বানে সাড়া দেননি।
দেশের কেউ সাড়া না দিলেও তার আহ্বানে সূদর আমেরিকা থেকে ছুটে এসেছেন আরেক মানবতাবাদী ডাক্তার দম্পতি জেসন ও মেরিন্ডি। যে দেশে যাওয়ার জন্য দুনিয়ার সবাই পাগল সেই দেশ থেকে শুধু নিজেরা যে এসেছেন তা না, নিজেদের সন্তানদেরও সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন। ভর্তি করে দিয়েছেন গ্রামেরই স্কুলে। গ্রামের শিশুদের সঙ্গে তারা খেলছে। ডাক্তার জেসিন কী সুন্দর করে লুঙ্গি পরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন!
আমরা সুযোগ পেলেই গ্রাম থেকে শহরে ছুটি। শহর থেকে বিদেশ পাড়ি দিই। শিশু জন্মের পর থেকেই চিন্তা থাকে কত দ্রুত সন্তানকে আধুনিক ইংলিস মিডিয়াম স্কুলে পড়াবো। লুঙ্গি পরা তো আমাদের রুচির সঙ্গে আজ বড়ই বেমানান। লুঙ্গি পরতে পারি না বলতে পারলে আমাদের আভিজাত্যের পারদ শুধু একটুকু না অনেকটুকুই বাড়ে। বনানী, গুলশান এলাকায় তো একবার লুঙ্গি পরাই নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল। কারণ ওরা জানে না ওদের প্লেটে যে খাবার যায় তা এদেশের লুঙ্গি-গামছা পরা কৃষকরাই তুলে দেয়।
শিশুরা কত সুন্দর করে ইংরেজি বলতে পারে! বাবা-মায়ের এতে গর্বের শেষ নেই। একটা কবিতা আছে। সম্ভবত এ রকম লাইনগুলো—বাবা-মা খুব অহঙ্কার করে সন্তানদের নিয়ে বলছেন, জানেন মশাই, ওদের বাংলাটা ঠিক আসে না।
একবার বিদেশ পাড়ি জমাতে পারলেই আমরা মাটি কামড় দিয়ে পড়ে থাকি। কোনো একটা লেখায় পড়লাম বিদেশের এক শিক্ষক বাংলাদেশের এক অধ্যাপককে বলছেন, আপনাদের ছেলেমেয়েরা বাইরে পড়ালেখা করে কী দেশে ফিরে যায়?
উনি লজ্জায় বললেন, বেশিরভাগই যায় না।
অবাক হয়ে বিদেশি অধ্যাপক বললেন, যায় না কী বলেন। এটা তো ভারি অন্যায়। কারণ জনগণের ট্যাক্সের টাকা সরকার তাদের শিক্ষার পেছনে ইনভেস্ট করলো। আর ভোগ করলো অন্য একটা দেশ।
অধ্যাপক বললেন, ওদেরকে দোষ দিয়েও লাভ নেই। কারণ দেশে এসে উচিত কথা বলতে চাইলে ঘটে পদে পদে দুর্গতি। যেমন-উচিত কথা বলায় সম্প্রতি দারণ এক দুর্গতির শিকার হয়েছেন ঢাবি’র অর্থনীতির এক অধ্যাপক। কোর্ট থেকে রায় পেয়েও শরণার্থীর মতো নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন, ক্লাস নিতে পারছেন না।
দেশপ্রেম মাটি, মমতা, মানুষ ইত্যাদি নিয়ে আমরা কত কথাই বলি। আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি, জাতীয় সংগীত। সোনার বাংলার প্রতি আমাদের ভালোবাসা কত বেশি তা একবার ইউরোপ-আমেরিকার অ্যাম্বেসির সামনে দেখা গেলেই বোঝা যায়। কাকডাকা ভোর থেকেই বিদেশের স্বপ্নের আশায় মানুষের লাইন।
দেশপ্রেম নিয় কত কথা, আমি নিজেও তো কম বলি না। কিন্তু বিদেশেই তো পড়ে আছি।
ইত্যাদির প্রতিবেদনটি দেখলাম। ডা. জেসন ও মেরিন্ডি দম্পতি আমাদের এক বিশাল লজ্জায় ফেলে দিলেন।
কেউ যদি না দেখে থাকেন, দেখার আমন্ত্রণ রইলো। গ্রামকে ভালোবাসুন, গ্রামের মানুষকে ভালোবাসতে চেষ্টা করুন। এক আমেরিকার সিটিজেন ডাক্তারের পক্ষে যদি সম্ভব হয়, তবে আমি-আপনি নই কেন?
