বায়ুদূষণ রোধে যে পদক্ষেপগুলো নেওয়া প্রয়োজন

আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০১৯, ২১:৩৯

দীর্ঘদিন ধরে দূষিত শহরের তালিকায় দিল্লির শহরটি শীর্ষে অবস্থান করছে। ইত্তেফাকে প্রকাশিত একটা সম্পাদকীয়তে দেখলাম অতিসাম্প্রতিক সময়ে শহরটির প্রায় ২২ লাখ লোক বায়ু দূষণের ফলে ফুসফুসের বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়েছে। দূষণের ভয়াবহতা এতই বেশি যে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। দেশটির সর্বোচ্চ আদালতে দায়েরকৃত এক পিটিশনে, আদালত কর্তৃপক্ষকে ভর্ত্সনা করেছে এবং দূষণ রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বলেছে।

এত সময় তো বললাম দিল্লির কথা, এখন আমাদের দেশের কথায় আসি।

বায়ুদূষণ নিয়ে কাজ করা এয়ার ভেজ্যুয়াল ১৯ নভেম্বর তাদের ওয়েব সাইটে যে তথ্য প্রদান করল তা হচ্ছে—ঢাকার বাতাসের দূষণ দিল্লিকে ছাড়িয়ে ১ নম্বরে অবস্থান করছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সে ঢাকার স্কোর ৩০৯ যা ভয়ংকর।

বিশ্বের অন্যতম জনবহুল এ শহরে বায়ুদূষণ দীর্ঘদিনের  একটি সমস্যা। কিন্তু অতিসম্প্রতি এটি আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। প্রতিনিয়ত জনসংখ্যার চাপ বেড়েই চলছে এ শহরে। যেসব কারণগুলোর জন্য বায়ুদূষণ হচ্ছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বাতাসে ধুলাবালুর উপস্থিতি অত্যাধিক, এছাড়া ঢাকার আশপাশে অবস্থিত ইটভাটাগুলো বায়ুদূষণের জন্য সবচেয়ে দায়ী, যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্পকারখানার ধোঁয়া, তা ছাড়া আরেকটা বিষয় হচ্ছে মাটি দূষণে এবং পানি দূষণের সঙ্গে বায়ু দূষণের একটা সম্পর্ক আছে। ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা রাখা হয়, যেসব জলাধার আছে সেগুলোও দূষিত। এসব ময়লা আবর্জনা থেকেও প্রচণ্ড দুর্গন্ধ বাতাসের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, যা বায়ুদূষণের জন্য দায়ী।

বায়ুদূষণের এই ভয়াবহ পরিণাম থেকে শহরে বসবাসকারী কেউই মুক্ত নন। ফুসফুসের বিভিন্ন রোগের জন্য বায়ুদূষণ দায়ী। অ্যাজমা, হাঁপানি, অ্যালার্জি সমস্যা, নিউমোনিয়া—এছাড়া আরো অনেকগুলো রোগের জন্য বায়ুদূষণ দায়ী।আমাদের শিশুরা সব চেয়ে বেশি স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে।

ঢাকার বায়ুদূষণকে  অবশ্যই সহনীয় মাত্রায় আনা সম্ভব। প্রথমত, দূষণের জন্য সবচেয়ে দায়ী ইটভাটার ধোঁয়া, সুতারাং ইট ভাটাকে রাজধানী থেকে আরো দূরে সরিয়ে নিতে হবে। দ্বিতীয়ত,যানবাহনে ধোঁয়া থেকে বাঁচতে অবশ্যই ফিটনেসবিহীন পরিবহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। ফিটনেসবিহীন গাড়ি বেশি পরিমাণ ধোঁয়া নির্গত করে। তৃতীয়ত, রাজধানীতে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা অত্যধিক পরিমাণে বাড়ছে,এটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে এ ক্ষেত্রে দূষণ কিছুটা কমানো সম্ভব। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের জোড়, বেজোড় পদ্ধতি কিছু দিনের জন্য অনুসরণ করা যেতে পারে। চতুর্থত, রাজধানীতে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড চলমান রয়েছে, ফলে ব্যাপক রাস্তা খুঁড়তে হচ্ছে, যা বায়ুদূষণের জন্য অন্যতম দায়ী। যেহেতু বায়ুদূষণ শীতকালে বা শুষ্ক মৌসুমে বেশি হয়, সুতরাং এই কাজগুলো করতে হলে অন্যসময় করতে হবে বা কম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। ধুলা থেকে বাঁচতে প্রতিদিন রাস্তায় পানি দিতে হবে। প্রয়োজনে হেলিকপ্টার থেকে কৃত্রিম বৃষ্টির ব্যবস্থা করতে হবে। পঞ্চমত, যেখানে-সেখানে ময়লা আবর্জনা যাতে না ফেলা হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ষষ্ঠত, যেসব জলাধার বা নদী রয়েছে সেগুলো যাতে দূষিত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সপ্তমত, রাজধানীতে বসবাসরত জনগোষ্ঠীকে পরিবেশ সুন্দর রাখার ব্যাপারে সতর্ক করতে হবে। অষ্টমত, পরিবেশসংক্রান্ত বিধিনিষেধ যারা মানছেন না, তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। নবমত, রাজধানীতে সবুজায়নের জন্য আরো অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

সবচেয়ে বড়ো বিষয় হচ্ছে, রাজধানীমুখী যে জনস্রোত অব্যাহত রয়েছে সেটি যদি কমানো না যায়, বায়ু দূষণ কোনোভাবেই কমানো যাবে না। ঢাকাকে বসবাসের উপযোগী শহর করতে হলে অবশ্যই জনগোষ্ঠীর ঢাকামুখী হওয়ার যে প্রবণতা এটা বন্ধ করতে হবে। আসলে এটির জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। আশা করা হচ্ছে—১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার যে প্রকল্প মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গ্রহণ করেছেন, সেটির বাস্তবায়ন হলে এই সমস্যার কিছুটা সমাধান হবে।

ভয়াবহ বায়ুদূষণ থেকে এখনই যদি ঢাকাকে রক্ষার কোনো উদ্যোগ গ্রহণ না করা হয়, চরম হুমকিতে পরবে ঢাকায় বসবাসরত জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য। দ্রুততম সময়ের মধ্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানাই।                                 

n লেখক : শিক্ষার্থী ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়