আফগানিস্তানে গত বৃহস্পতিবার হঠাত্ করেই সফর করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেখানে থাকা মার্কিন সেনাদের ধন্যবাদ জানাতে এ সফরের উদ্দেশ্য বলা হলেও মূলত তালেবানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি আলোচনার বিষয়টিই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এ সফর রাজনৈতিক দিক থেকে অনেক গুরুত্ব বহন করে। তাদের বক্তব্য, এর মাধ্যমে তালেবান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে শান্তি আলোচনা থমকে গিয়েছিল তার নতুন একটা পথের সৃষ্টি হয়েছে। সে বিবেচনায় বলা যেতে পারে চুক্তিতে পৌঁছাতে জট অনেকটা খুলতে চলেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন, তিনি তালেবানের সঙ্গে শান্তি আলোচনা চান। সে লক্ষ্যে তার প্রশাসন আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বলে তিনি জানান। বিষয়টি যদি সত্যিকার অর্থে ফলপ্রসূ হয় তাহলে তা অবশ্যই অশান্ত আফগানিস্তানে শান্তি ফিরিয়ে আনতে একটা বড়ো ধরনের পদক্ষেপ। এর আগেও তালেবানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা বেশ দূর এগিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু শেষ পথে এসে তা হোঁচট খায়। একপর্যায়ে আলোচনা বন্ধ হয়ে যায়। সে সময়ে আফগানিস্তানে তালেবানের হামলা মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় শেষমেশ আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে যেতে পারেনি। বিশেষ করে তালেবানের হামলায় তখন এক মার্কিন সৈন্য নিহত হলে সব আলোচনা ভেস্তে যায়। এর প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্টও তখন আলোচনা বন্ধ করে দেন। সর্বশেষ পশ্চিমা দুই শিক্ষাবিদকে মুক্তির বিনিময়ে তালেবানের তিন বন্দি ছাড়া পেলে আলোচনা নতুন করে শুরু করার একটি পথ তৈরি হয়। এর পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে তালেবানও কাতারে ফের আলোচনায় যেতে তাদের আগ্রহের কথা প্রকাশ করে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের আফগানিস্তান সফরে যে তালেবানের বিষয়টিই একমাত্র বিষয় তা নয়। এর সঙ্গে রয়েছে আফগানিস্তানে তাদের সৈন্য কমিয়ে আনার বিষয়টিও। ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সফরকালে ঘোষণা দেন যে, সেখানে থাকা মার্কিন সৈন্য সংখ্যা কমিয়ে আনা হবে। রাজনৈতিক দিক থেকে দুটো বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হলেও মূলত তালেবানের সঙ্গে শান্তি আলোচনার বিষয়টিই ট্রাম্পের এই সফরে অধিকতর গুরুত্ব পাচ্ছে।
২০০১ সালে টুইন টাওয়ারে হামলার পর আফগানিস্তানে ন্যাটোর মাধ্যমে সামরিক অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র। সে সময় সেখান থেকে তালেবান সরকারকে উত্খাত করা হয়। কিন্তু তাদের উত্খাত করা হলেও তালেবানের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়নি। প্রতিনিয়ত তারা হামলা চালিয়ে মানুষ হত্যা করছে। এ কারণে দিনে দিনে সেখানে বাড়ছে লাশের সারি। দীর্ঘ ১৮ বছর কেটে গেলেও আজো আফগানিস্তানে শান্তি ফিরেনি। ট্রাম্প সফরকালে আফগানিস্তানে বাগরাম ঘাঁটিতে তাদের সেনাদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে তালেবানের আলোচনা হয়েছে। এর আগে তারা যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়নি। কিন্তু এখন তারা যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে।’ আফগান সরকার তালেবানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু তালেবানের বক্তব্য ছিল, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো চুক্তি হওয়ার আগে আলোচনায় বসবে না।
আফগানিস্তানে মার্কিন প্রেসিডেন্টের হঠাত্ সফরকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হলেও সমালোচকরা একে আবার ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছেন। তাদের মতে, ট্রাম্প যে পথে হাঁটছেন তাতে খুব বেশি আশার আলো নেই। নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনেও একই ধরনের কথা বলা হয়েছে। পত্রিকাটির খবরে বলা হয়, জঙ্গি গোষ্ঠী তালেবানের সঙ্গে আলোচনা কতখানি ফলপ্রসূ হবে তার সন্দেহ থেকেই যায়। কেননা এ পর্যন্ত কোনো আলোচনাই চূড়ান্ত সমাধানে যায়নি। এছাড়া তালেবানের যে দাবি, আফগানিস্তান থেকে সব মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার—তাও সত্যিকার অর্থে কতখানি সম্ভব হবে সে প্রশ্নও রয়েই যায়। তাদের মতে, ট্রাম্প এখন ঘরে-বাইরে ইমেজ সংকটে রয়েছেন। আর এ সংকট উত্তরণেই তিনি আফগানিস্তান সফর করলেন। যদিও ট্রাম্প প্রশাসন বিষয়টিকে তাদের সাফল্যের আরেকটি সম্ভাবনা বলে মনে করছে।
