>> জুনাইদ আল হাবিব
ভ্রমণের কথা মাথায় এলে বিভিন্ন জনের বিভিন্নভাবে ঘোরাঘুরির গল্প আমরা শুনি। কেউ সড়কপথে, কেউবা নৌ-পথে, কেউবা আকাশ পথে ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন। কিন্তু কজনই-বা আছেন, শুধু সড়কপথেই বিশ্ব ঘুরে দেখেন? হ্যাঁ, একজন আছেন। তিনি বাংলাদেশরই একজন তরুণ। যিনি ইতিমধ্যে বিশ্বের ৬৮টি দেশের ৭১৫টি শহর ঘুরেছেন সড়ক পথে। দূরত্বের হিসাবে যা প্রায় ১ লাখ কিলোমিটার।
প্রথম বাংলাদেশি হিসাবে এই রেকর্ড গড়া তরুণের নাম তানভীর অপু। ফিনল্যান্ডে বসবাসকারী এ বাংলাদেশি মূলত একজন ব্যবসায়ী। ব্যবসা থেকে জোগাড়কৃত অর্থ দিয়েই তিনি সড়কপথেই বিশ্বের এতগুলো শহর ভ্রমণ করেছেন।
‘সড়কপথে ভ্রমণ আমার দারুণ পছন্দের। সড়কপথে একসঙ্গে অনেকেই ভ্রমণ করতে পারেন। চার-পাঁচজন একসঙ্গে গাড়িতে চড়া যায়। আর সড়কপথে ভ্রমণের খরচটাও কম। একই দেশ বা শহরে একাধিকবার ভ্রমণ করেছি। যে শহরটি ভালো লেগেছে, সেখানে মনের টানে আবারও ছুটে গিয়েছি। ভবিষ্যতে আরো ভ্রমণ করার ইচ্ছে আছে। ভ্রমণ করার জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার হয় মনের ইচ্ছার। যেখানে মন রাজি থাকবে, সেখানে আর্থিক বাধা কোনো বাধা নয়। আর ভ্রমণে গেলে অনেক কিছু ত্যাগ করতে হয়। আরাম-আয়েশ সবকিছুই,’ বলছিলেন বিশ্ব পর্যটক তানভীর অপু।
তানভীর অপুর বাড়ি রাজশাহীতে। ২০০৬ সালে তিনি পড়াশোনার উদ্দেশ্যে ইউরোপের দেশ ফিনল্যান্ডে পাড়ি জমান। এরপর নেশা চাপে শহর ঘুরে দেখার। প্রথম ভ্রমণে যান এস্তোনিয়ার রাজধানী তালিমে। সেই থেকে দীর্ঘ এক যুগে ভ্রমণ করেছেন পৃথিবীর ৬৮টি দেশের ৭১৫টি শহর। পৃথিবীর নানা দেশে পা রেখে ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেন তিনি। যে দেশেই যান, লাল-সবুজের বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন তানভীর অপু।
তানভীর অপু সর্বপ্রথম ভ্রমণে বেরিয়েছিলেন ২০০৬ সালে। এ সময় তিনি ভ্রমণ করেন জার্মানি, বেলজিয়াম, হল্যান্ড, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, লুক্সেমবার্গ, লিথেনেস্টাইন ও চেক রিপাবলিকে। আর এ বছর ভ্রমণ করেছেন ফিনল্যান্ড, সুইডেন, নরওয়ে, পাঞ্জাব, মানালি, দিল্লি ও কুল্লুতে।
তানভীর অপুর ভ্রমণের পেছনের রহস্যটা কী? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার কাছে পৃথিবীটাই একটি দেশ। আমরা মানুষ, এটাকে ভাগ করেছি। এজন্য বিভিন্ন দেশ সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের যেমন ধরুন ৬৪ জেলা, আমাদের উচিত প্রতিটি জেলায় ভ্রমণ করা। আমাদের ভাষা বাংলা হলেও প্রতিটি জেলার ভাষার আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে। খুলনায় যেমন সুন্দরবন আছে, সিলেটে আছে চা বাগান। সব দেখা উচিত। যখন ভ্রমণ শুরু করেছি, ভেবেছি পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে আমি পা রাখব।’
ভ্রমণে কার কাছ থেকে বেশি অনুপ্রেরণা পেয়েছেন? এমন প্রশ্নে তানভীর অপু বলেন, ‘পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হকের অনুপ্রেরণায় ভ্রমণের প্রতি আগ্রহটা বেড়ে যায়। সেই সঙ্গে আমার ছোট ভাই বিশ্ব পর্যটক তারেক অনু একশটিরও বেশি দেশ ভ্রমণ করে অনুপ্রাণিত করেছে।’
ভ্রমণ করলে কী কী উপকারিতা পাওয়া যায়? তানভীর অপু বলেন, ‘ভ্রমণের মাধ্যমে অর্জিত হয় বাস্তব অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতা বই পড়ে আয়ত্ত করা সম্ভব না। দেশভ্রমণের ফলে নানা শ্রেণি ও পেশার লোকের সঙ্গে পরিচিত হওয়া যায়। বিভিন্ন দেশের মানুষের আচার-ব্যবহার, চাল-চলন, পোশাক-পরিচ্ছদ, রীতি-নীতি, সমাজ-সংস্কৃতি, ভাষা, শিক্ষা, শিল্পকলা ও জীবনধারণের পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা যায়। ভ্রমণের মাধ্যমে মানুষের ভ্রান্ত ধারণা দূর হয় ও দৃষ্টি প্রসারিত হয়। বিষণ্নতা থেকে মুক্তির জন্যও ভ্রমণ করা যায়। ভ্রমণ মানুষকে সতেজ ও প্রফুল্ল রাখে।’
‘যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিন ভ্রমণ করতে চাই। মূলত ভ্রমণ নিয়েই বেঁচে থাকতে চাই। এ জন্য ধীর গতিতে সারা পৃথিবীর প্রতিটি কোনায় কোনায়, এক কথায়, প্রতিটি শহরে যাওয়ার চেষ্টা করছি। এ জন্যই একটি দেশে অনেকবার যাওয়া হয়। যেই শহর ভালো লেগেছে ঐ শহরে বহুবার গিয়েছি। ভবিষ্যতে আরো যাব,’ বলেন তানভীর অপু।
নিজের পরিকল্পনা নিয়ে তানভীর অপু বলেন, ‘আমি ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়া গিয়েছি। এখন আফ্রিকার দেশগুলো ভ্রমণ করছি। ভাবছি, আফ্রিকা শেষ করে ল্যাটিনের দিকে যাব। এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছি।’
দেশে দেশে ঘুরে বেড়ানোর ছবিগুলো নিয়ে এরই মধ্যে চারটি প্রদর্শনী করেছেন। ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রকাশ করেছেন ‘যাত্রা হলো শুরু’ নামের একটি বইও। এখন স্বপ্ন দেখেন নিজের অভিজ্ঞতা স্কুলের শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে।
নিজের স্বপ্নের কথা জানিয়ে তানভীর অপু বলছিলেন, ‘বিভিন্ন দেশ ঘুরে আমার হয়তো অর্থ ফুরিয়েছে, কিন্তু জমে আছে অনেক গল্প। বিচিত্র সৃষ্টির ছবি-ভিডিও এগুলোই আমার সম্পদ। এসবই আমি স্কুলে স্কুলে শিক্ষার্থীদের দেখাতে চাই। আমি তাদের ভ্রমণে আগ্রহী করতে চাই, ভ্রমণ নিয়ে স্বপ্ন দেখাতে চাই।’ g
