>> মাহবুব নাহিদ
বন্ধুদের একটা ফেসবুক গ্রুপও যে হয়ে উঠতে পারে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দারুণ প্ল্যাটফর্ম; তা প্রমাণ করেছে এসএসসি ২০০৮, এইচএসসি ২০১০ ব্যাচের ছেলেমেয়েরা। ফেসবুকে একটা গ্রুপ রয়েছে তাদের। সারা বাংলাদেশ থেকে ৪০ হাজারের উপরে সদস্য আছে এই ‘ব্যাচতো দোস্ত’ গ্রুপে। তাদের গ্রুপে বন্ধুদের আড্ডা, মজা, ফুর্তি সবকিছুই চলে নিয়মিত। কিন্তু তারা শুধুই এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গ্রুপের মাধ্যমে তারা অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে, প্রয়োজনে রক্তদান করছে। এমনকি দেশের জন্য কল্যাণকর এমন কাজও করছে তারা।
গ্রুপের একজন মডারেটর আরাফাত পাভেলের সঙ্গে কথা হয়। তার কাছ থেকেই শুনে নেওয়া হয় তাদের এগিয়ে যাওয়ার গল্প। ২০১০ সালের ১৫ নভেম্বর শুরু হয় এই গ্রুপ। গ্রুপের অ্যাডমিন ডা. শারমিন টুকটুকি এই গ্রুপের সূচনা করেন। তার সঙ্গে ছিলেন তানজিম, বাকিব, সাইফুল, সজিবসহ ২০ জন তরুণ। কিছুদিন আগে তারা গ্রুপের নবম জন্মদিন পালন করলেন। নবম জন্মদিন পালন করলেন অভিনব কায়দায়। তাদেরই ব্যাচের একজন সদস্য ভিনসেন্ট উইলসন ডিজিজ নামক লিভারের সমস্যায় আক্রান্ত। তারা তাদের গ্রুপ থেকে ভিনসেন্টের চিকিত্সার খরচ বাবদ টাকা তোলেন এই জন্মদিনে। তারা ভিনসেন্টের পরিবারের হাতে ইতিমধ্যেই কিছু টাকা তুলে দিয়েছেন। কিছুদিন পরে আরো দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এর আগে তারা পিয়াল নামের এক বন্ধু ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ায় গ্রুপ থেকে প্রায় ৪ লাখ টাকা তুলে পৌঁছে দেন তার পরিবারের হাতে। তারা এবছর উদ্যোগ নেন বৃদ্ধাশ্রম নিয়ে কাজ করার। রাজধানীর উত্তরায় আপন নিবাস নামের এক বৃদ্ধাশ্রম বেছে নেন তাদের কাজের জন্য। গত কোরবানির ঈদে তারা এই বৃদ্ধাশ্রমের মাতৃতুল্য বৃদ্ধাদের হাতে তুলে দেন নতুন পোশাকসহ খাদ্যসামগ্রী।
তাদের ব্যাচের রয়েছে একটি ব্লাড স্টোর। এই স্টোরের মাধ্যমে তারা দেশের যেকোনো প্রান্তে মানুষের প্রয়োজনে পৌঁছে দেন রক্ত।
স্বেচ্ছাসেবী কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি তাদের রয়েছে নিজেদের এগিয়ে যাওয়ার একটি প্ল্যাটফর্ম। প্রতি শুক্রবার তাদের গ্রুপে চাকরির সার্কুলারগুলো দেওয়া হয়। গ্রুপের যারা ভালো অবস্থায় আছে, তারা সাহায্য করেন অন্যদের। গ্রুপের মাধ্যমে অনেকেরই ইতিমধ্যে চাকরি হয়েছে। প্রতিমাসের দুটি সোমবার তারা পালন করে বিজনেস ডে। বিজনেস ডেতে গ্রুপের যারা ব্যবসা করে, তারা শেয়ার করতে পারে নিজেদের ব্যবসার আইটেম। এর মাধ্যমে নিজেরা নিজেদের বিজনেসকে সমৃদ্ধ করতে পারে।
তাদের রয়েছে নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়ন করার অনেক প্রকল্প। তারা প্রতি বৃহস্পতিবার মিউজিক লাইভ করে থাকে। যেখানে নিজেদের শিল্পীরাই গান গাওয়ার সুযোগ পায়। বিভাগ, জেলা এমনকি এলাকাভিত্তিকভাবে হয়ে থাকে গেট টুগেদার। গত রমজানে ঢাকায় হয়েছে একটি গ্র্যান্ড ইফতার মাহফিল। কয়েকদিন আগে খুলনায় হয়ে গেল বিশাল একটি বিভাগীয় গেট টুগেদার। গ্রুপ থেকে বিভিন্ন সময় আয়োজন করা হয় খেলাধুলার। তাদের গ্রুপের রয়েছে একটি বাইকার্স টিম। এই টিম মোটরসাইকেলে নিজেদের ব্যাচের স্টিকার লাগিয়ে বিশাল বহর নিয়ে প্রতি মাসেই একটি করে ট্যুর দেয়। তাদের ব্যাচের অনেকেই পৌঁছে গেছেন অনেক গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়। ৩৯তম বিসিএসে প্রথম স্থান অধিকার করেছেন তাদের ব্যাচের নীলিমা ইয়াসমিন। তাদের ইচ্ছা আছে সফল মানুষদের নিয়ে অভিজ্ঞতা শেয়ার ইভেন্টে করার।
তারা এখন হাতে নিয়েছে ঢাকা শহরে ওভারব্রিজ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার প্রজেক্ট। ঢাকার ব্যস্ততম কিছু ওভারব্রিজ তারা নির্ধারণ করে সেখানে মানুষকে সচেতন করার কাজ করবেন। এই প্রক্রিয়ায় ইতিমধ্যেই তারা অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছেন। কিছুদিনের মধ্যেই শুরু করবেন এই কর্মকাণ্ড।
বর্তমানে আব্দুল্লাহ, মিল্টন, ফারহানা, শিমুসহ অনেকে এগোচ্ছেন বিভিন্ন নতুন নতুন কাজের প্ল্যানিং নিয়ে। তাদের গ্রুপের মূল স্লোগান হলো ‘মেকিং মেমোরিস ব্রেকিং ডিস্ট্যান্স’ তারা স্বপ্নে দেখেন নিজেদের একটা ব্র্যান্ড হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে। দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য কাজ করবেন। বন্যাসহ অন্যান্য দুর্যোগের সময় দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অসহায় মানুষদের শীতবস্ত্র বিতরণসহ নানা পরিকল্পনা ও স্বপ্ন নিয়ে কাজ করছে তারা। এই ‘ব্যাচতো দোস্ত’রা হয়ে উঠতে চান দেশের একেকজন আন্তরিক সেবক। g
