খুব ব্যথিত হই, যখন শুনি কেউ আত্মহত্যা করেছে। কেন মানুষ আত্মহত্যা করে সেটা অন্তত খুব ভালো করে ব্যাখ্যা দেওয়াটা অসম্ভব, আর যতটুকু আমাদের কানে বা নজরে আসে তাও সম্পূর্ণ সঠিক নয়। মানুষ মৃত্যুতে বিশ্বাস করলেও নিজের মৃত্যুটি খুব তাড়াতাড়ি হোক সেটা আসলে কেউই চায় না। আমরা মানুষেরা প্রায়ই একটি ইচ্ছা পোষণ করে থাকি এ পৃথিবীতে যদি চিরদিন বেঁচে থাকতে পারতাম! এটিও যে একটি অবান্তর ইচ্ছা তা বিশেষ করে বলা নিষ্প্রয়োজন। তবু এরকম হাজারো কল্পনাকে আঁকড়ে ধরে যে মানুষটা ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছে সে মানুষটিই কেন এক সময় আত্মহত্যার মতো একটি কুিসত ও ভয়ানক অপরাধমূলক একটি সিদ্ধান্ত নেয়?
একেক জন একেক কারণে আত্মহননের পথ বেছে নেন। যে যে কারণেই আত্মহত্যা করুক, সবের মূলে রয়েছে মাত্র একটি বিষয়, মানসিক ভারসাম্যহীনতা; মানসিকতার অপরিপক্বতাও হতে পারে। যতক্ষণ পর্যন্ত একটা মানুষ তার মানসিকতার নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা অধিকার করে থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত আর যাই করুক, নিজের মৃত্যুকে ডাকবে না। কেউ জেদের বসে আত্মহত্যা করছে, বিশেষ কোনো লজ্জা থেকে মুক্তির জন্য আত্মহত্যা করে, দেউলিয়াত্বের দায় নিয়ে আত্মহত্যা করে, পরীক্ষায় আশানুরূপ ফলাফল না করতে পেরেও আত্মহনন করছে কিশোর-কিশোরীরা।
আমার এক আপনজন, মাদ্রাসার ছাত্রী ছিল। ওর মা ওকে অনেক সময়ই বকাবকি করতেন, মুখে যা আসত তাই বলে ফেলতেন। এমনও বলতে শুনেছি তোর মতো মেয়ের দরকার নেই, খোদায় যে তোরে কেন নেয় না? একদিন তুচ্ছ ব্যাপারে মন খারাপ করে ঘরের মধ্যে ঝুলে পড়ে, কেউ টের পায়নি। যতক্ষণে খোঁজ পড়ে গেল ততক্ষণে অভিমানী আর এ পৃথিবীতে নেই। ঘটনার কয়েকদিন বাদেই দাখিল পরীক্ষার ফল বেরোয়, ভালো করেছিল। ওর বাবা চেয়েছিল মেয়ের পাসের সনদটা স্মৃতি হিসেবে রেখে দিবেন, কিন্তু সেটা আর সম্ভব হয়নি, মা এখনো কাঁদেন। এমন হাজারো সত্যগল্প বলা যায় কিন্তু আমি কোনো গল্প বলতে বা কোনো জরিপের ফল প্রকাশ করতে বসিনি। বসেছি দুটো কথা বলার জন্য, যে কথা না বলতে পারলে নিজেকে অপরাধী মনে হবে।
আজ যে লোকটা আত্মহত্যা করছে সে হয়ত আমার, আপনার কিংবা আশপাশে থাকা লোকেদের প্রভাবে বা অসাবধানতার কারণেই করছে। এটা কি বুঝতে পারছি, আমাদের কারণেই ফুটফুটে জলজ্যান্ত একেকটা মানুষ অসময়েই স্মৃতি হয়ে যাচ্ছে? খবরের কাগজে দেখি, ধর্ষণের স্বীকার হয়ে অনেক তরুণী জীবন দিচ্ছে; এই দায় কি সমাজ এড়াতে পারে? আত্মহত্যার কারণ ডিপ্রেশন কিংবা অন্য যাই বলি, সবই পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা কর্মস্থল এবং সমগ্র সমাজের বিভিন্ন রকম কুপ্রভাবের ফল।
যেকোনো মানুষ, যেকোনো বয়সের মানুষ, যেকোনো সময়, যেকোনো কারণেই ডিপ্রেশনে ভুগতে পারে। আর ওই বিশেষ সময়টিতে যদি ডিপ্রেশনে ভোগা মানুষটি যখন আরও কোনো বৈরিতার মুখোমুখি হয় যেমন তার সঙ্গে কেউ কথা বলছে না; বললেও সেটা তা অপ্রত্যাশিত ভঙ্গিমায়, তাকে দেখলে মানুষ কৌতুক করে ইত্যাদি তখন সে অনুভব করে যে, তাকে কেউ চায় না, কেউ তাকে ভালবাসে না, এ পৃথিবীতে তার কেউ নেই, সবাই যে যার মতো, কেউ একটু তার দিকে খেয়াল করে না ইত্যাদি বিপরীত সব চিন্তা তার মাথায় ঘুরপাক খেতে খেতে একসময় এই নিকৃষ্টতম কাজটি করে বসে। সে মনে করে, তার মৃত্যুই ভালো হবে। তার জন্য সবাই দুঃখ করবে, কান্নাকাটি করবে, আফসোস করবে এরকম অগ্রিম ভাবনাই তার একমাত্র সুখ; সে জানে না যে, সে কী মস্তবড় ভুল তথা অপরাধ করতে যাচ্ছে। ঠিক এমনই ঘটেছে ভিকারুন্নেসার ছাত্রী অরিত্রীর ক্ষেত্রে।
সবারই খেয়াল রাখা দরকার যেন কেউ ডিপ্রেশনের হেতু এমন কাজ না করতে পারে, এজন্য যতটা সম্ভব মানসিক সাপোর্ট দিতে হবে এবং সবসময় আপত্তিকর কথাবার্তা ও আচরণ থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখার বিকল্প নেই। আর এমন কিছু করাটাও উচিত হবে না যাতে কেউ এমন কোনো পরিস্থিতিতে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। আত্মহত্যা ব্যক্তি নিজে করলেও এর জন্য পুরো সমাজকেই আমরা দায়ী করব।
প্রতিকূল পরিস্থিতিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিন, অন্তত মগজে কুচিন্তা বাসা বাঁধতে পারবে না। আত্মহত্যা কোনো সমাধান নয়। মনে রাখতে হবে, কেউ আমাকে ভালো না বাসুক কিন্তু আমি সবাইকে ভালোবাসব; হতে পারে আমার ভালোবাসাই সবাইকে আমাকে ভালোবাসতে বাধ্য করবে। পৃথিবীটা আমার জন্য, পৃথিবীটা সবার জন্য।
n লেখক: শিক্ষার্থী, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ঢাকা
