সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে আর্থিক নিরাপত্তা খুব দরকার

আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৮:৩৫

বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনে বহুমুখী গুণের অধিকারী একজন নাট্যশিল্পীর নাম শিশির রহমান। তিনি একাধারে অভিনেতা, নির্দেশক ও নাট্যকার। তবে এগুলোকে ছাপিয়ে ওঠে যখন তার হাতে কোনো বাদ্যযন্ত্র থাকে। শুধু যন্ত্রশিল্পী নন, তিনি কণ্ঠ শিল্পীও বটে। আপাদমস্তক একজন শিল্পী তিনি। গুণী এই শিল্পীর নাট্যপথে যাত্রা শুরু স্কুল কলেজের নাটক দিয়ে। ১৯৯১ সালে নিজ জেলা মুন্সিগঞ্জে ‘মুন্সিগঞ্জ থিয়েটার’-এ নাটকের মাধ্যমে গ্রুপ থিয়েটার চর্চার শুরু। ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন নিজেদের দল ‘থিয়েটার সার্কেল’। এরপর ঢাকায় ২০০১ সালে যুক্ত হন নাগরিকের সঙ্গে। পরে ২০০৫ সালে প্রাঙ্গণেমোর নাটকের দলে। শিশির রহমান অসংখ্য নাটকে অভিনয় করেছেন এবং নাটকের মিউজিক করেছেন। নাটকে অবদানের জন্য জেলা শিল্পকলা একাডেমি মুন্সিগঞ্জের সম্মাননা পেয়েছেন ২০১৫ সালে আর সম্প্রতি পেলেন থিয়েটার প্রবর্তিত জাকারিয়া স্মৃতি সম্মাননা-২০১৯। গুণী এই শিল্পীর সঙ্গে কথা বলেছেন মাহবুব আলম

আপনি দীর্ঘদিন রাজধানীতে নাট্যচর্চা করেছেন। এখন জেলা শহরে। রাজধানী ও জেলার মধ্যে নাট্যচর্চার তফাত্ কেমন দেখেন?

রাজধানীর শান-শওকত ধরন-ধারণ জেলা শহরের চেয়ে একেবারেই আলাদা। দুই জায়গার দুই ধরনের সুবিধা-অসুবিধা। তবে কাজকে আমি কাজ বলেই মনে করি। যেখানেই কাজ করি শত অসুবিধা থাকা সত্ত্বেও সম্পন্ন করার চেষ্টা করি। রাজধানীর নাট্যচর্চার বড় দিক হলো, এখানে যারা কাজ করতে আসে, তারা সারা দেশের ভালো ভালো ছেলেমেয়ে। তারা যে পারফরম্যান্সটা দিতে পারে জেলা শহরের গুটি কয়েক লোক দিয়ে তা সম্ভব হয় না। জেলা শহরের কাজ মানেই কম্প্রোমাইজ, স্যাক্রিফাইস।

জাকারিয়া স্মৃতি সম্মাননার পর আপনার অনুভূতি কী? প্রণোদনা নাট্যকর্মীকে কতটা উত্সাহিত করে?

থিয়েটার করে পদক পাওয়া যায়, বিষয়টি রীতিমতো বিস্ময়কর! একসময় যাদের লিজেন্ডারি ভাবতাম, তাদের কাছ থেকে পদক গ্রহণ সত্যি আমাকে সম্মানিত করেছে। থিয়েটার নিয়ে কাজ কী করেছি জানি না। তবে দেশের অগ্রগণ্য নাট্যদল যখন কোনো নাট্যকর্মী বা শিল্পীকে সম্মানিত করে, তখন মনে হয় কাজ তো মাত্র শুরু হলো। মো. জাকারিয়া এ দেশের নাট্যাঙ্গনের একজন কিংবদন্তি অভিনেতা, তার নামাঙ্কিত পদক আমাকে গর্বিত করেছে। ধন্যবাদ সর্বজন শ্রদ্ধেয় নাট্যজন রামেন্দু মজুমদারকে, কৃতজ্ঞতা থিয়েটারকে আমাকে নাট্য কর্মে প্রেরণা দেওয়ার জন্য।

নাটকে গান বা আবহ সংগীত অনেক গুরুত্বপূর্ণ। নাটকের গল্পের সঙ্গে গানের বা আবহের মিশ্রণ কিভাবে করেন?

নাটকের গান নিয়ে ১৯৯৬/৯৭ দিকে কাজ করতে শুরু করি। পল্লিকবি জসীমউদ্দিনের ‘নকশীকাঁথার মাঠ’ নাটকের গান নিয়ে কাজ করতে গিয়ে নাটকে আবহ সংগীত করা শুরু। নাটকের গান বা আবহ সংগীত দুটোই নির্ভর করে নাটকের গল্পের ওপর। গল্প বা নাটকের মুহূর্তকে দর্শকের কাছে আরো হূদয়গ্রাহী করে তোলাই মূল লক্ষ্য। সেটা করতে মূলত নাটকের গল্পের সঙ্গে নিজের একটি জার্নি লাগে। কখনো কখনো বিশেষ সময়কে ধরতে গিয়ে সেই সময়ের আলোকে আবহ সংগীত বা গানের সুর করতে হয়। যেমন :যদি মহাভারতের কোনো কাহিনি নিয়ে নাটক হয়, তাহলে সেখানে তো আর আধুনিক কোনো সুর ব্যবহার করা যাবে না। এই বিষয়গুলোকে মাথায় রেখেই নাটকের আবহ সংগীত বা গান করতে হয়।

নির্দেশনার ক্ষেত্রে কোন ধরনের গল্প আপনার পছন্দ এবং কেন?

নাটক নির্দেশনার ক্ষেত্রে আমি যে দলে কাজ করি, সেই দলের কর্মীদের দক্ষতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে থাকি। তারা যে ধরনের নাটক, অভিনয়কে আয়ত্ত করতে পারবে, সেই ধরনের গল্প নির্বাচন করে থাকি। তবে ইতিহাস আমাকে খুব টানে। আমি মনে করি, আমাদের প্রজন্ম বা তরুণ প্রজন্মের নির্ভুল ইতিহাস জানা জরুরি, তাই ইতিহাসনির্ভর নাটকের প্রতি আমার আলাদা ভালোলাগা আছে। আমি যেহেতু গানের লোক আর বাংলা লোক নাটকের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো গান, সেই কারণে বাংলা লোক নাটকের উপর আমার বিশেষ আগ্রহ।

চলচ্চিত্রে জাতীয় পুরস্কার দেওয়া হয় বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে; থিয়েটারে এমন কোনো রাষ্ট্রীয় প্রণোদনার ব্যবস্থা নেই। থাকা কতটা প্রয়োজন?

সরকারিভাবে মঞ্চ নাটকে কোনো প্রণোদনার ব্যবস্থা নেই, কারণ আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থায় মঞ্চ নাটকের কোনো স্থান নেই। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় কোনো পৃষ্ঠপোষকতা না থাকার কারণে শিল্পচর্চার তাগিদে নাট্যচর্চা কিছু শিল্পমনা মানুষের হাত ধরে গ্রুপ থিয়েটার চর্চায় রূপ নিয়েছে। তবে সরকারিভাবে প্রণোদনা না থাকলেও নাট্যজনেরা নানাভাবে বেসরকারি উদ্যোগ নিয়ে প্রতি বছরই কিছু কিছু কাজ করে যাচ্ছে। যদিও এই প্রণোদনা দেশের লক্ষ শিল্পী কর্মীদের প্রতিভার সম্মানের তুলনায় সামান্য। দেশের সরকার খেলাধুলায় যে পরিমাণ আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে থাকেন, তার অর্ধেক যদি সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে দেওয়া যেত তাহলে এই শিল্পে আরো গতি আসত এবং শিল্পীরা নির্ভাবনায় কাজটি করতে পারত। সত্যি কথা বলতে কি, এই শিল্পে আর্থিক নিরাপত্তা নেই। সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে আর্থিক নিরাপত্তা খুব দরকার। তবে হ্যাঁ, শিল্পীর অবশ্যই যোগ্য, মেধাবী ও কর্মঠ হওয়া উচিত।