দরপতনই যেন শেয়ারবাজারের নিয়তি হয়ে গিয়েছে। ভাল শেয়ারে বিনিয়োগ করেও লোকসান গুনছেন বিনিয়োগকারীরা। আর মূলধন বাঁচাতে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ পাচ্ছেন না তারা। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও একই ভূমিকা পালন করছে। শিগগিরই বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো লক্ষণ নেই বলে বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন। মূলত, জাতীয় নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো ধরণের ঝুঁকি নিচ্ছেন না বিনিয়োগকারীরা। এখন তারা সাইড লাইনে অবস্থান করছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার পাশাপাশি দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগ নিয়ে দ্বিধার মধ্যে রয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। এখন বিনিয়োগকারীরা নিজেদের পুঁজি বাঁচাতে যতটুকু ভূমিকা পালন করা দরকার তার বেশি করতে চাচ্ছেন না। ফলে দীর্ঘ মেয়াদি বিনিয়োগে যাচ্ছে না কেউ। শেয়ারবাজারে বড় ভূমিকা রাখা ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ প্রায় এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এসব খেলাপির বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে মুনাফা থেকে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়েছে। এতে বছর শেষে ব্যাংক খাতের মুনাফা কমে যাবে বলে মনে করছেন বিনিয়োগকারীরা। এ খবরও ব্যাংকিং খাতের শেয়ারে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বছর শেষ হওয়ায় (ইয়ার ক্লোজিং) বাজার থেকে নগদ টাকা উঠে যাওয়ার প্রভাবও বাজারে পড়তে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
বাজারে ভালো মানের শেয়ার সংখ্যা বেশি হলে নির্বাচনী উত্তাপের তেমন প্রভাব পড়তো না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আর নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত এমন ঢিমেতালেই শেয়ারবাজার চলবে বলে তারা মনে করছেন।
এ বিষয়ে পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, ‘নির্বাচনের সঙ্গে পুঁজিবাজারের সরাসরি সংযোগ আগে না থাকলেও এখন কিছুটা রয়েছে। নির্বাচনে পরিস্থিতি কোন দিকে যায় সেজন্য বিনিয়োগকারীরা অপেক্ষা করছেন। অন্যদিকে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতার জন্য। ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের মতো প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগেও একই অবস্থা বলে তিনি মনে করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) একজন পরিচালক বলেন, সিকিউরিটিজ ব্যবসায় এখন আর কাউকে উদ্বুদ্ধ করতে চাই না। নিজের ব্যবসা নিয়েই দুরস্থার মধ্য দিয়ে দিন যাপন করছি। উদাহরণ হিসাবে তিনি বলেন, পুঁজিবাজার তালিকাভুক্ত কোম্পানি কেপিসিএলের (খুলনা পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড) শেয়ার দর কয়েকমাসের মধ্যে ১৩৯ টাকা থেকে ৫৪ টাকায় নেমে এসেছে। ডিএসএলের (ড্রাগন সোয়েটার লিমিটেড) শেয়ার দর কয়েকমাসের মধ্যে ৫০ টাকা থেকে ১৯ টাকায় লেনদেন হচ্ছে। এটা পুঁজিবাজারের বৈশিষ্ট্য না। এভাবে পুঁজিবাজার চলতে পারে না। এভাবে বিনিয়োগকারীরা টাকা হারিয়ে ফেললে নতুন অর্থ কে নিয়ে আসবে?
যেসব শেয়ারের দাম এত বার বার উঠানামা করছে বা অনেক কমে যাচ্ছে সেসব শেয়ার কারা কিনছে বা কারা নিয়ন্ত্রণ সে বিষয়ে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি কার্যকর কোনো ভূমিকা পালন করছে না বলেও অনেকে অভিযোগ করেছেন। এতে পুরো বাজারের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
বাজারের সার্বিক অবস্থা বিষয়ে বিনিয়োগকারীরা বলছেন, আস্থা ও সুশাসনের অভাবে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সতর্কতা অবলম্বন করছে সবাই। এখন মুনাফার চেয়ে বিনিয়োগ রক্ষা করতে ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ নীতিতে চলছেন বিনিয়োগকারীরা। নির্বাচনের পরে অবস্থা বুঝে বাজারে ফিরবেন তারা। বাজারে গতি ফেরাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান আইসিবির (ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ) মাধ্যমে একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয় সম্প্রতি। আইসিবির মাধ্যমে দুই হাজার কোটি টাকার বন্ড ছাড়া হয় পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য। কিন্তু এমন উদ্যোগের কোনো প্রভাব দেখা যায়নি গত সপ্তাহে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন আইসিবির একার পক্ষে ইতিবাচক ফল নিয়ে আসা সম্ভব নয়। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বাজারমুখী করতে হবে। পুঁজিবাজারকে বিনিয়োগকারীদের আস্থামুখী করা গেলেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার উদ্যোগ ফলপ্রসূ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পতনের ধারায় ডিএসই ও সিএসই’র সূচক
গতকালও দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ডিএসই এবং অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সবকটি মূল্যসূচকের পতন হয়েছে। টানা সাত কর্মদিবস দেশের শেয়ারবাজারে দরপতন হচ্ছে। এ কয়দিনে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স কমেছে ১৪৩ পয়েন্ট। টানা দরপতনের সঙ্গে লেনদেনও কমে গিয়েছে। গত নয় মাসের (১৭৩ কর্মদিবস) মধ্যে ডিএসইতে গতকাল সর্বনিম্ন লেনদেন হয়েছে। গতকাল ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে ৩১৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, যা চলতি বছরের ২৯ মার্চের পর সর্বনিম্ন। এর আগে ২৮ মার্চ বাজারটিতে ২৭৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকার লেনদেন হয়।
গতকাল ডিএসইতে লেনদেনে অংশ নেওয়া বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দামও কমেছে। বাজারটিতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ৬১টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম আগের দিনের তুলনায় বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমার তালিকায় স্থান করে নিয়েছে ২৩১টি। আর ৪৭টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের সার্বিক মূল্যসূচক সিএসসিএক্স ৫৬ পয়েন্ট কমে ৯ হাজার ৬৯৭ পয়েন্টে অবস্থান করছে। বাজারটিতে লেনদেন হয়েছে ১১ কোটি ৬ লাখ টাকা। লেনদেন হওয়া ২৩৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৪২টির দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ১৭১টির। আর দাম অপরিবর্তিত রয়েছে ২৪টির।
