কে যেন কলসি কলসি মেঘ উবুড় করে ঢেলে দিয়েছিল জলধারা—সন্ধ্যায়, আজ এমন দারুণ সবল বৃষ্টি। ভরদুপুরেই আকাশ বিষণ্ন, মলিন। সেই আলো-অন্ধকার দীর্ঘতর হতে হতে কখন ঝুপ করে রাত নেমে এল। ধূসর ঢাকা মহানগরীর গোসল সারা হলো—ফরসা দেহের ভরাট যুবতী যেন সদ্যস্নাত, গোলাপি একটা মোলায়েম টাওয়েলে জড়ানো বুক থেকে হাঁটু, ভেজা গোলাপের লালের মতো যার শরীরে টলমল করছে সুবাসিত জলের বিন্দু।
শহরের অলিগলি, পিচকরা রাস্তা, রংবাহারি দালানের গায়ে লেপ্টে আছে বৃষ্টি হয়ে যাওয়ার চিহ্ন। বৈদ্যুতিক জ্যোত্স্নায় ভেসে যাচ্ছে শহরের রাত, অকারণ উত্সবের ঘ্রাণ আবহাওয়ায়। বিরক্তিকর একঘেয়ে সেইসব নাগরিক কোলাহল যেন এখন বাজছে মোজার্টের সিম্ফনির মতো ওঠা-নামায়, বিদ্যুতের খুঁটির মাথা থেকে চুইয়ে চুইয়ে নামছে চাঁদের দুধ।
অনেকদিন। অনেকদিন পর। নামল, বৃষ্টি।
টিংকু ফোন দিল, তারপর রাশেদ ফোন দিল। রিসিভ করতে ইচ্ছা করল না একবারও। মেসেজে গুঁতা দিল এবার।
কই শালা? বাতিঘরে আয়, আজকে তোরে পিটামু।
না, আড্ডা পেটাতে আজ ভালো লাগছে না।
সারাবেলা বন্ধ জানালায়। নেশা না করে মাতাল। ঝিমঝিম একটা। কী যেন, ঝিমঝিম।
মেসেঞ্জার টুং করে উঠেছিল অপ্রত্যাশিত বর্ষায়।
—মনে পড়ে, তমাল? বৃষ্টি হচ্ছে।
অনি মেসেজ করেছিল, বৃষ্টি তখন পড়ছিল।
ঝমঝম ঝমঝম কড়কড় কড়াত্... যেন একটা ট্রেন চলছে আকাশ থেকে আকাশে, হুইসেল বেজে উঠছে হঠাত্ হঠাত্।
কী মনে করাতে চায় আমাকে অনি? হায়, সব অমানুষ। এ পৃথিবীতে কোথায় মানুষের ঘরবাড়ি?
জমে থাকা পানির মধ্যে গতিশীল চাকার আলোড়নে ছিটকে আসা জলছিটার মতো বিষণ্নতার এত্তগুলো কর্দমাক্ত পানি ছিটকে মলিন করে দিল আমার মনের শান্ত জামাকাপড়। এই হাসিখুশি ছিলাম তো, পলকে মনখারাপ। কী এমন মনে পড়া? একটা ভাঙা দালান ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়ল।
শব্দের কী শক্তি। ওই কয়টা শব্দের সূত্রে অজস্র আনন্দ-বেদনার হুড়মুড় করে মনে পড়া?!
এমনই রাবীন্দ্রিক ঘনঘোর বর্ষামাতাল দিনে অনির সাথে পয়লা আলাপ আমার, ইনবক্সে।
টুক করে লিখলাম তাকে,
একগুচ্ছ কদম হাতে ভিজতে চাই তোমার সাথে...
একটা গান আছে এরকম, সুন্দর। শুনেছেন গানটা?
সে রিপ্লাই করল সুন্দর। তুমি চলে এসো, চলে এসো এক বর্ষায়...
বললাম, একা একা ভিজতে ভালো লাগে না। আমার সঙ্গে ভিজবেন?
সে বলল, বর্ষাকাল তো চলে গেছে। এখন শীত পড়ি পড়ি করছে।
আমি বললাম, নভেম্বর রেইনও কিন্তু সুন্দর। ওই যে একটা গান আছে না, When I look into your eyes
I can see a love restrained...
এভাবেই শুরু। বৃষ্টি দিয়ে, বৃষ্টিকে উপলক্ষ করে, বৃষ্টি এলেই দু’ পাশের দুজনের মন কেমন করা দিয়ে, এভাবেই শুরুটা। বৃষ্টি হলেই দুজনের মন ফুড়ুত্ ফুড়ুত্। ইনবক্সে নকানকি। সে কতদিনের কথা।
আজো তো অনেকদিন পর বৃষ্টি হলো, না?
অনির মেসেজটা সিন করে রেখে দিলাম। রিপ্লাই দেওয়া গেল না, কারণ, মনের মধ্যে গলগল রক্তপাত আরম্ভ হয়েছে। অনেক কিছু মনে পড়ছে। থামাতে হবে এটাকে। অনেক হাঁটতে হবে। নেমে যাই, আবারও বৃষ্টিতে হাঁটি।
বাতিঘরে চলে যাই রেললাইন দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে। বলা যায় ঘোরগ্রস্ত দৌড়। টিংকু, রাশেদ, পিডি, জুবেল। টলতে টলতে আড্ডায় হাজির হয়েই বললাম—রাশেদ, আমারে অনেকক্ষণ জড়ায়ে ধরে রাখতে পারবি? আমি কিছুক্ষণ কাঁদবো। পরস্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি হলো, বিভ্রান্ত, ইতস্তত। পুরুষ মানুষ এভাবে কাঁদবে সবার সামনে, গা জড়িয়ে? কী যেন ভেবে রাশেদ আমাকে হঠাত্ জড়িয়ে ধরল। পিডি আমার কাঁধে একটা প্রগাঢ় মায়ার হাত রাখল। এভাবে অনেকক্ষণ কাটল।
একটু পর হো হো করে হেসে উঠলাম। যাহ্, সময় আছে ওসব মনখারাপের। জীবনের অফুরন্ত ফূর্তির মদের পেয়ালা এবার বুকভরে খাবো। লাফিয়ে দাঁড়ালাম, একটা উষ্টা খেলাম। সবাই হো হো করে হাসল আগের মতো। বৃষ্টির ঝাপটা বাড়ছে। একাই হাঁটছি এক পাগলের দল।
উষ্টা খেলাম একটা দোকানের সাইনবোর্ডের সাথে। আমি উড়ে উড়ে হাঁটিনি, ঝড়ো বাতাসের ধমকে নামফলকটি পড়ে গেছে, কখন থেকে যে পড়ে আছে। পরিচিত গলির চিরায়ত নাস্তার হোটেল। একটা চিংড়ে ছেলে এইক্ষণে দোকান সামলাচ্ছে। কী আছে রে খাওয়ার? উঁকি দিয়ে দেখে রাশু, রাশেদ। কাচের তপ্ত বাক্সের ভেতরে সমুচা, পেঁয়াজি, চপ, সিঙাড়া ও পুরিরা এলোপাথাড়ি শুয়ে আছে। তাদের ওপর হলুদ একটা তপস্বী বাল্ব জ্বলছে। ওতে হাত ডুবিয়ে পিডি একটা চপ মুখে নিতেই রাশু চেঁচাল, খবরদার পিডি, ভাজাপোড়া খাসনে। সারারাতের জন্য পেটের মধ্যে রকেটের ইঞ্জিন চালু হয়ে যাবে রে।
ওদের হাস্য কলস্বর আজ আমাকে স্পর্শ করছে না। যেন ঝাপসা হয়ে আছে বোধ, ভোঁতা হয়ে আছে অনুভূতি। এই যে হাসি আনন্দের ঘটমানতার ভেতরে থেকেও মনে হচ্ছে আমি আসলে অন্য কোথাও—অনেক দূরে শূন্যে ঝুলছি।
হঠাত্ আবার বিজলি চমকাল, সশব্দে বাজ পড়ল কোথাও, বিকট সুন্দর আওয়াজে ট্রান্সমিটার ব্লাস্ট হলো কোথাও, পুরো মহল্লা তলিয়ে গেল সুখদ অন্ধকারে।
আড্ডা ছেড়ে এলাম। দ্রুত পা চালাই আমি। আকাশে আবার মেঘ ধরে আসার আগেই বাস কাউন্টারে পৌঁছাতে হবে। ঢাকা-রাজশাহীর একটা টিকিট বুক করা। রাজশাহীতে আমার জন্য অপেক্ষা করছে অথৈয়ের অথৈ অপেক্ষা।
২.
সর্বগ্রাসী শূন্যতার অন্ধকারে তোমাকে পেতে চাই # MTV
আমাকে রেখে আর কারো প্রেমে পড়ে যেয়ো না প্লিজ! # MTV
ফেসবুকের ডে তে ছবি, একপৃষ্ঠা জুড়ে শুধু লেখা MTV
সব মনে পড়ে না, প্রথম প্রথম এরকম বিভিন্ন কথা।
মানে প্রথম দুটো MT-তে আমার দুই নামের প্রথম দুই অক্ষর। V-তে ভাইয়া।
এমটিভি নামে একটা টিভি চ্যানেল আছে। শেষমেশ হয়ে গেলাম টিভি!
বলাকওয়া নেই, ফেসবুক দেখে আমার প্রেমে পড়ে গেল। মাত্র সপ্তম শ্রেণির বালিকা। অনেক পড়ে। বই পড়ে পড়ে পেকেছে অল্পে। ওর মা বলে। হেসে খেলে নিলাম ব্যাপারটা। মেসেঞ্জারে নিকনেম দিলাম পিচ্চি। সেই পিচ্চি এখন রাজশাহী ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। বরেন্দ্রভূমে যাচ্ছি। ভাবলাম, এখন তো বরেন্দ্রকন্যায় আত্মহত্যা করে আসাই যায়।
৩.
কোথায় যেন ফিরছি। বাসের মধ্যে নীল অন্ধকার। গতিতে ঝাঁকি নেই। খুব ঠাণ্ডা তালে স্নিগ্ধ আওয়াজে একটা সংগীত বাজছে এসির হিমহিম হাওয়ায়। সময় থমকে যাওয়া একটি স্থবিরতা মাথার মধ্যে ঢুকে পড়েছে। শুধু অতলে নেমে যাওয়া, অতলে নেমে যাওয়া। হঠাত্ ঝলকে ওঠে ধাঁ ধাঁ আলো।
হঠাত্ বাস থামাল। হাইওয়ে পুলিশ উঠল গাড়িতে। কিছুক্ষণ ভিডিও করল। দুয়েকজনের ব্যাগ চেক করল। আমার ব্যাগ চেক করল না। করলে কি কিছু পেত?
একগোছা চুল আছে। একটা প্যাকেটে। অথৈর মাথার। বাসায় একটা শোকেস আছে, সেখানে নিয়ে সাজিয়ে রাখব। এটার ট্যাগে লেখা থাকবে ৯ নাম্বার। মানে নবম। তার মানে আগে আরো আটটা?
আমার ছোট্ট একটা শখ আছে। যেসব মেয়েরা আমার প্রেমে পড়ে, আমি তাদেরকে প্রথম দেখার দিনে মেরে ফেলি। শুধু অচিন্তিত দ্রুত ও ঠান্ডা একটি পদ্ধতিতে খুন করে একগোছা চুল রেখে দেই। লাশের মধ্যে রেপের কোনো আলামত পাওয়া যায় না। কারণ ব্যাপারটা ঘটেই না। শুধু বুকের ওপর হাতদুটো একটা সাইন আঁকার মতো বিছিয়ে রাখা।
শুধু চুল ব্যাগে পেলে পুলিশ আর কীই-বা সন্দেহ করত।
অন্ধকার অন্ধকার। হঠাত্ আলো ঝলসে ওঠে ফ্ল্যাশবাতির মতো, সেখানে দেখি অনির মুখ। গর্বিত, বিজয়িনীর হাসি। কানাডার সিটিজেনশিপ পেয়ে গেছে বউ হওয়ার সুবাদে। যেমন স্বামী লোকটার এদেশীয় রেজার, জাঙ্গিয়া, টুথব্রাশ এসবও কানাডা গিয়েছে স্বামী লোকটার রেজার, জাঙ্গিয়া, টুথব্রাশ হওয়ার সুবাদেই।
ও হাসছে আমার দিকে তাকিয়ে, হঠাত্ করে একটা জংধরা পুরনো বর্শা ছুটে এসে বিদ্ধ হলো ওর পিঠে এ-ফোঁড় ও- ফোঁড় করে দিয়ে। কিন্তু আর্তনাদ করে উঠল অন্য কেউ, মরণ-চিত্কার বেরোলো অন্য কোথাও অন্য কারু করুণ কণ্ঠভরে—যে কিনা ছিল একান্তই নিষ্পাপ। স্বপ্নের মতো দূরদেশ থেকে ভেসে আসা মাদকতাময় খুনের গন্ধ রক্তের ভেতর পাক বেঁধে ওঠে। এত রক্ত মেয়েদের গায়ে!
ক্ল্যাচ ক্ল্যাচ, সাদাকালো দৃশ্যটায় উপুর্যুপরি ফাটল, তারপর নিভে গেল চেতনার টিভি স্ক্রিন জুড়ে ঝিঁঝিঁ পোকার ঝা-ঝা উপস্থিতি। দপ করে অনি নিভে গেল। মগজের গহিন কোটরে গাঢ় অন্ধকারে ঝিকিয়ে উঠল তারার মতো লাখ লাখ ছুরিকা।
পরবর্তী শিকার উপলক্ষে তূণীরে সাজাও তীর, হে আদিম নিষাদ।
