অন্ধকারে দাঁড়িয়ে যখন কবরের দিকে তাকিয়ে ছিলাম, তখন ফেরেস্তারা এসে শরীরের ওপর ঘন নিঃশ্বাস ফেলছিল। গায়ের লোমগুলো খাড়া হয়েই ছিল। ভয় পেয়েছি কি না, জানি না। গাছের পাতাগুলোও নীরব দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। গাছগুলোর প্রতি আমার ভীষণ রাগমিশ্রিত অভিমান আছে। আমার দুঃসময়ে ওরা নীরবই থাকে, কিবা দিনে কিবা রাতে। কারণ, ওরাই আমার একমাত্র সঙ্গী। সঙ্গীরা তো কখনো কখনো নীরব থাকে না, হয় প্রতিবাদ করে, নইলে বিশ্বাসঘাতকতা করে। কিন্তু এরা বোবা বন্ধু।
মনে মনে গোরস্থানের পাশেই থাকি। এটা বুঝতেও অনেকের কষ্ট হয়। সেদিন আমার চিরসঙ্গী দীনাও বলেছিল, কী সব পাগলামি করে বেড়াও?—মানুষ তো মানবসমাজেই থাকে, তুমিই শুধু কবরস্থানে থাকো। ওর কথা শুনে শুধুই মৃদু হেসেছিলাম, জানি আমার হাসি দেখলে দীনা কাঁদবে। তাই খুব গোপনে হাসি। অন্ধকার রাত হলে, দীনা খুব ভয় পায়। বাড়ি থেকে বের হতে চায় না। তবে আমার কারণে বের হয়, চোখ মোছে—সেও নীরবে কাঁদে। সেদিন ঝড় উঠেছিল, মেঘহীন রাতে। বাম দিকে তাকিয়ে দেখি দীনা দাঁড়িয়ে আছে। খুব আস্তে করে জিজ্ঞাসা করলাম, তুমি এলে
কেন?
বললো, তুমি ছাড়া ঘুম হয় না। চলো বিছানায় যাই। আমার কাছে মনে হলো, বিছানাও একটা গোরস্থান। তাই ওর হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে বিছানায় যাই। বিছানায় শরীর এলিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের গাছের পাতাগুলো নড়ে উঠল, সড়সড় করে শব্দ করা শুরু করল, বাতাসও শোঁ-শোঁ-শোঁ শব্দ করে বয়ে যেতে শুরু করল। অথচ তখন আমরা ঘরের অন্ধকারে চার দেয়ালের মাঝে দোল খাচ্ছিলাম।
কোথা থেকে একঝাঁক জোনাকি এসে, একবার আলো জ্বালছিল, আবার নেভাচ্ছিল। মৃত্যুর মধ্যে নূপুরের ঝংকার বাজছিল। তখন বাইরে অন্ধকারে শকুনের বাচ্চা কাঁদছিল।
জীবন চলার পথে অসংখ্য রকম চমক থাকে, থাকে কৌশল ও অভিনয়। বাস্তবে মানুষ সবচেয়ে বড়ো অভিনেতা। শীতের মিষ্টিরোদে পূর্বদিকে চোখ-মুখ রেখে তাপ পেতে অপেক্ষা করে মানুষ। গোধূলিবেলায় তাড়াতাড়ি কাজ বা সংসার গুছিয়ে ঘরে উঠতে ব্যস্ত থাকে তারা। আমার প্রাণের বান্ধবীটিও এসবের ব্যতিক্রম করেনি কোনোদিন। একসময় তার সবকিছু আমার মনে হতো। এখন মনে হয়, সেও ছিল এক বড়ো অভিনয়। অভিনব কায়দায় কাছে পাওয়ার কৌশল। জৈবিক চাহিদাই ছিল এর মূল কারণ। আমার ক্ষেত্রেও তা-ই ছিল। ভোগের জন্য সুচারুভাবে অভিনয়টা করার চেষ্টা ছিল আমার মধ্যে। এখন এগুলোকে প্রতারণা মনে হয়।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। আমি মেঠোপথ ধরে হাঁটছি। শিশিরভেজা ঘাসগুলো আমার পা দুটো আলতো করে ভিজিয়ে দিচ্ছে। কখনো মনে হচ্ছে, আদর বা স্নেহ, আবার কখনো হালকা ঠাণ্ডা অনুভূত হচ্ছে। যখন আমি বান্ধবীর গা-ঘেঁষে হেঁটে যেতাম, তখন এ রকম আবেগতাড়িত বিভিন্ন ধরনের অনুভূতি আমার মন ছুঁয়ে যেত।
রাত গভীর হতে থাকে। ঘুমহীন এপাশ-ওপাশ করতে থাকি। উঠে যাই বিছানা থেকে। চমত্কার ও মায়াবী আলো ছড়িয়ে চাঁদটা পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে। সোনা রংয়ের চাহনিতে আমার মন ভেঙেচুরে গুঁড়োগুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে। তুমুল বেদনা আমাকে আঁকড়ে ধরেছে। তীব্র কান্না ভেতরে ভেতরে এক ছায়া ফেলে স্মৃতি রোমন্থন করছে। হূদয়ের সবটুকু আবেশ দিয়ে অনুভব করছি। হাঁটছি শেষ রাতের আজান-ঘুমে ছাদের ওপর দিয়ে। কিছু কিছু ধর্মবিশ্বাসী মানুষ মসজিদের দিকে যাচ্ছে। তাদের বয়স বেশির ভাগই পঞ্চাশোর্ধ্ব, তাদের গলার স্বর ও ঘনঘন কাশিতে সেটা অনুমান করা যাচ্ছে। অল্পবয়সী যুবক-যুবতীরা হয়তো হেমন্তের ঠাণ্ডায় শরীরের ওমে জড়াজড়ি করে ঘুমিয়ে আছে।
হাঁটতে হাঁটতে ঝাপসা স্মৃতির বারান্দা আলোকিত হয়ে যাচ্ছে। এক ঘোরের মধ্যে জেগেছিলাম, বেশ সময়টা কাটছিল। মায়াবী চাঁদের ছড়ানো আলো, পূর্বদিকের সূর্যের আগ্রাসনে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। দূর রাস্তা থেকে ব্যস্ততার ডাক ভেসে কানের পর্দায় আঘাত করছে। বাসের ড্রাইভাররা হঠাত্ জেগে যেন খুব জোরে জোরে চলন্ত মানুষকে প্যাঁ-পুঁ-ভোঁ-ভাঁ শব্দে ডেকে দিচ্ছে। অথচ ঘোরলাগা, আত্মভোলা ও আরামপ্রিয় মানুষগুলোর যন্ত্রণা ওরা বোঝে না, হয়তো বোঝার মতো বোধও ওদের নেই। ওরা ব্যস্তজীবনের চলন্ত রোবট। এরমধ্যে খুব ধীরপায়ে, ছন্দ তুলে ডালা হাতে লাবণী এগিয়ে এল শিউলি ফুল গাছের নিচে। বেশ পুরনো হওয়ায়, গাছটি বেশ বড়ো। বিল্ডিংসংলগ্ন দক্ষিণ দিকে গাছটি দাঁড়িয়ে আছে। হেমন্তের শেষ সপ্তাহেও বেশকিছু ফুল ঝরে পড়েছে। ছোটবেলা থেকেই মেয়েটি শরতের শুরু হলে, ফুল কুড়িয়ে নিয়ে গিয়ে মালা গাঁথে। ও যখন খুব ছোট ছিল, তখন আমার কোলে উঠে লাফাত। ওর আম্মু রমা বৌদি, প্রায় ঝলমলিয়ে হেসে, লাবণীকে আমার কোলে তুলে দিত।
দীনা একদিন বৌদিকে কী যেন বলেছিল, সেই থেকে বৌদি খুব ধীরে ধীরে, বেশ কিছুদিন ধরে, বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে, আমার কাছ থেকে, দূরে সরে গেছে। আমি বৌদিকে কোনোকিছু বলতে গেলেই, কাজের ওছিলায়, ব্যস্ততা দেখিয়ে সরে যায়। অথচ আমিও যে বিষয়টি বুঝি, সেটা বৌদিও হয়তো জানে। তবু না-বলা কথাগুলো আর বলা হয় না। চোখে চোখে মনে মনেই থেকে যায়। বৌদির কাছে আমার অনেক লেনা-দেনা রয়ে গেছে, এ পৃথিবীতে বৌদি আর আমি ছাড়া কেউ জানে না। নীরব শিউলি গাছটির মতোই, ফুল ফোটে আর ঝরে যায়, বৌদির সারা অঙ্গে।
লাবণী এখন বড়ো হয়ে গেছে। একবারে বৌদির ফটোকপি। পিঠে ছড়ানো লম্বা চুল, গোলাপি শরীরটা আকাশি রংয়ের সালোয়ার কামিজে ঢাকা। আমি লাবণীর দিকে তাকাতেই, ও হাত উঁচু করে বলল, হাই আঙ্কেল। আবছা আলো-ছায়ায়, আমি ডান হাতটি তুলে, কয়েকবার ইশারায় শুভেচ্ছা জানালাম। লাবণী যখন মিষ্টি করে গাল জড়িয়ে, লাল ঠোঁট একজায়গায় করে, গোলাপ পাপড়ির মতো করে হাসল, তখন বৌদির ঠোঁটের কোণের লবণাক্ত স্বাদ আমার জিহ্বায় অনুভব করলাম। কবিতার চরণ দুটি বার বার বৌদির ঠোঁটে সুরেলা হাসিতে নেচে ওঠে—
ঝরে গেল রংচটা বসন্ত
মনে পড়ে শীত পোড়ানো মিষ্টি দুপুর।
