আমাদের দেশের রপ্তানি পণ্য তালিকায় সোনালি আঁশ পাটের স্থান সবার শীর্ষে ছিল। বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে এদেশের পাট রপ্তানির পরিমাণ কমে যায়। কিন্তু সাম্প্র্রতিক সময়ে পাট রপ্তানি কিছুটা হলেও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পাট উত্পন্ন হলেও বাংলাদেশে সবচেয়ে উন্নতমানের পাট উত্পন্ন হয়ে থাকে। আমাাদের দেশে দুই ধরনের পাট উত্পন্ন হয়। সাদা এবং তোষা জাতীয় পাট আমাদের দেশে উত্পন্ন হয়ে থাকে। সাদা পাটের তুলনায় গুণমানের দিক দিয়ে তোষা পাট বেশ উন্নত। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তোষা পাটের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। পাট চাষের জন্য বাংলাদেশের মাটি এবং জলবায়ু খুবই উপযোগী হওয়ায় এদেশে ব্যাপক পরিমাণে পাট উত্পন্ন হয়ে থাকে। বর্তমানে পৃথিবীর ১৮৮টি দেশে আমাদের দেশের পাট এবং পাটজাত পণ্য রপ্তানি হচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত ২৫টি দেশ ছাড়াও দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি, ব্রাজিলসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ আমাদের দেশের পাটের প্রধান গ্রাহক। আমাদের দেশ থেকে কাঁচা এবং প্রক্রিয়াজাত পাট ছাড়াও পাটের তৈরি কার্পেট, চট, পাটের ব্যাগ, বস্তা, ঝুড়ি, বিভিন্ন ধরনের কাপড়, সুতা, তুলা, জুতা, ঘর সাজানোর দ্রব্য বিলাস সামগ্রীসহ বিভিন্ন পাটজাত পণ্য বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন বাস্তবায়নের ফলে স্থানীয় বাজারে পাটজাত পণ্যের বিক্রি এবং চাহিদা বহু গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানিতে বিশ্বে প্রথম এবং পাট উত্পাদনে বিশ্বের দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। বর্তমানে বিশ্ব বাজারে পাটের চাহিদা এবং গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। দূষণ রোধ করে প্রকৃতিও জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষায় বিশ্ববাসী এখন পাটজাতপণ্যের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। আমাদের দেশের সোনালি আঁশ পাট বিশ্ব বাজারে বিস্তৃতি লাভ করছে। শুধু পাট নয়, পাটজাত পণ্যের রপ্তানি দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১১ সালে ফ্রান্সের কান চলচ্চিত্র উত্সবে ১৫ হাজার অংশ গ্রহণকারীর হাতে যে আকর্ষণীয় ডিজাইনের পাটের ব্যাগ তুলে দেওয়া হয়েছিল সেগুলোও গিয়েছিল বাংলাদেশ থেকে। পরিবেশবান্ধব পণ্য হিসেবে বিশ্বের বেশির ভাগ পরিবেশবিষয়ক সম্মেলনে পাটের ব্যাগ ব্যবহূত হচ্ছে। এগুলোর বেশির ভাগ যাচ্ছে বাংলাদেশ থেকে। শুধু তা-ই নয়, একসময় পাটের দড়ি, চট, ছালা, বাজারের ব্যাগ বস্তার মতো সস্তা পণ্যের মধ্যে সীমিত ছিল পাটের ব্যবহার। বর্তমানে সেই পাট এখন বিশ্বের নামিদামি গাড়ি তৈরির কোম্পানি ব্যবহার করছে। পাটের শপিং ব্যাগ, বাসাবাড়ির আসবাব সামগ্রী, বাগানে ব্যবহূত শৌখিন সামগ্রী থেকে শুরু করে শাড়ি সালোয়ার কামিজ, শার্ট, প্যান্ট, সুট এমনকি জিন্স বা ডেনিমও বাংলাদেশের পাট থেকে তৈরি হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের পাট বিশ্বের ১৩০টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। পাটজাত পণ্য সামগ্রী উত্পাদনে দেশের প্রায় ৪০০টি প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এসেছে। যার ৭০ ভাগ উদ্যোক্তা, নকশা করে ও শ্রমিক হচ্ছে নারী। মণিপুরী পাড়ায় পাটজাত সামগ্রী বিক্রির জন্য একটি বিক্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সেখানে পাটের তৈরি ১৩১ রকমের আকর্ষণীয় সামগ্রী পাওয়া যাচ্ছে।
পাটবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল জুট স্ট্যাডি গ্রুপের হিসেব অনুযায়ী বর্তমানে বিশ্বে প্রতি বছর ৫ হাজার কোটি পিস শপিং ব্যাগের চাহিদা রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ পাটের শপিং ব্যাগের ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। অল্প কিছু দিনের মধ্যে পাটের তৈরি পলিথিনের ব্যাগ বাজারে আসছে। আমাদের জাতীয় রপ্তানি আয়ের শতকরা ৪ দশমিক ৯ ভাগ পাট খাত থেকে অর্জিত হচ্ছে। এই খাত রপ্তানি আয়ের বৃহত্তম খাতও বটে। বিভিন্ন দেশে পাট এবং পাটজাত পণ্যসহ পরিবেশবান্ধব পণ্যের তৈরি ব্যাগের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ যদি এই সুযোগে গ্রহণ করে তবে এদেশের পাট এবং পাটজাত পণ্যের রপ্তানি বহু গুণ বেড়ে যাবে।
