গোলটেবিল আলোচনা

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৮:০৪

 

প্রচণ্ড শীতকে এবার নাকানি-চুবানি দিচ্ছে বাজারঘাটের জিনিসপত্র। আরেকটু সহজ করে বলতে গেলে দ্রব্যমূল্যের যা দাম, তাতে মগজ-শরীর গরম হয়ে যাচ্ছে। শীত কোত্থেকে আসছে আর কোথায় যাচ্ছে, তার কিছুই টের পাওয়া যাচ্ছে না। মাঝে মধ্যে আপনি হয়তো শুনে থাকবেন বাজারে আগুন লেগেছে। শুনে পড়িমরি করে গেলেন আগুন নেভাতে অথবা দেখতে। কিন্তু পরমুহূর্তেই আবিষড়ার করবেন এই আগুন সাধারণ আগুন নয়, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির আগুন। যা নেভানো এক কথায় অসম্ভব ব্যাপার। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে এই যে গোটা দেশে সংশয়, অশান্তি আর আলোচনা-সমালোচনা চলছে, তা নিয়েই ঠাট্টা আয়োজন করেছিল এক গোলটেবিল আলোচনা। অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিল নামগন্ধহীন একেবারে উড়ে এসে জুড়ে বসা একজন রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, সংস্কৃৃতিবিদ এবং রাস্তা থেকে ধরে আনা একজন সাধারণ ব্যক্তি। আলোচনা সভার সঞ্চালক হিসেবে ছিল জামসেদুর রহমান সজীব। চলুন সেই আলোচনার একাংশ উপভোগ করা যাক—

সঞ্চালক :আপনাদের সকলকে শুভেচ্ছা। পরিচয় পর্বের তো কোনো বালাই নেই। যেহেতু আপনারা পরিচয় দিতে ইচ্ছুক নন। পরিচয় পর্ব ছাড়াই তবে চলুন শুরু করা যাক।

রাজনীতিবিদ :হ সেইটাই। এক মহীষী বলেছিলেন, নামে কী আসে যায়। পরিচয় দিয়ে কী হয়, নাথিং।

অর্থনীতিবিদ :তাই নাকি! ভূতের মুখে রাম নাম শুনলাম মনে হয়। আপনাদের ঐ এক পরিচয় ছাড়া আছেই বা কী? যেখানেই যান নাম আর পদবির বড়াই করে বেড়ান। ক্ষমতা দেখিয়ে বেড়ান। এখন আবার অন্য বুলি আওড়াচ্ছেন।

রাজনীতিবিদ :আপনি আমাকে অপবাদ দিচ্ছেন। জানেন আমি কে? আপনি কোন দল করেন? কিসের সাপোর্টার?

অর্থনীতিবিদ :আমি হালা মাদ্রিদের সাপোর্টার। আপনার কোনো সমস্যা?

সংস্কৃতিবিদ :এসব কী শুরু করলেন আপনারা, আজব! আর অর্থনীতিবিদ সাহেব, আপনে হালা মাদ্রিদ কেন সাপোর্ট করবেন? আপনাদের কারণেই আসলে আমাদের দেশ, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ধ্বংসের দিকে। আপনি দেশের মধ্যে থাকেন। মোহামেডান কিংবা আবাহনী সাপোর্ট করেন।

সাধারণ ব্যক্তি :স্যার, আমার মনে হয়, আপনারা আলোচনার মূল বিষয়বস্তু থেকে কিঞ্চিত্ সাইডে চলে গেছেন।

সঞ্চালক :এ ভাই, আপনি কে?

সাধারণ ব্যক্তি :আমি একজন সাধারণ ব্যক্তি। রাস্তা দিয়ে বাসার পথে হাঁটছিলাম। আপনারাই তো ধরে আনলেন পাঁজাকোলা করে।

সঞ্চালক :ওহ আচ্ছা। চুপচাপ বসেন। এত বেশি কথা বলেন কেন? আচ্ছা যাই হোক, আমরা বিষয়ভিত্তিক কথা বলি। এই যে জিনিসপত্রের এত দাম, হোয়াই? রমজান মাস তো বহুদূরে, তাহলে এখনই কেন দ্রব্যমূল্যের দাম হু-হু করে বৃদ্ধি পাবে?

অর্থনীতিবিদ :এইটা আপনে মজা নিলেন ব্রো। একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে আমি মনে করি, সবকিছুতে সমতা থাকা জরুরি। ফেয়ার থাকা জরুরি। কেন শুধু রোজা এলে জিনিসপত্রের দাম বাড়বে, সারাবছরই বাড়ুক। ব্যালেন্স থাকুক।

সাধারণ ব্যক্তি :এ কী কয়!

সংস্কৃতিবিদ :দেখেন সংস্কৃতি তখনই উজ্জ্বলিত হয়, যখন তা পালন করা হয়। এই ধরেন, পহেলা বৈশাখ। এইদিনে পান্তা-ইলিশের কদর বেড়ে যায়। এগুলোর দামও হয় আকাশচুম্বী। সংস্কৃতিচর্চার কাছে দাম কোনো বিষয়ই না।

অর্থনীতিবিদ :আমিও তো সেটাই বলি। আমরা বাঙালিরা আমাদের অ্যাবিলিটি অনুযায়ী জিনিসপত্রের দাম বাড়াই। কিনতেই যদি না পারি, দাম কেন অহেতুক বাড়বে? কিনতে পারি বলেই তো দাম বাড়ছে।

সাধারণ ব্যক্তি :স্যার, আপনারা এসব কী কন! দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সাথে সংস্কৃতি চর্চা, অ্যাবিলিটির কী সম্পর্ক? একটু জেনে-বুঝে কথা বলেন। আমি কিন্তু হার্টের রোগী। আমার কিছু হইলে দায়ভার নেবেন আপনারা...

রাজনীতিবিদ :দায়ভারের কথা বলে লাভ নেই। এই যে দেশে এত অরাজকতা, কত দুর্ঘটনা, এমনকি দ্রব্যমূল্যের দাম যে বৃদ্ধি পাচ্ছে, জানেন এর পেছনে কাদের হাত রয়েছে? বিরোধী দলের! আপনারা তো এসব ব্যাপারে টু শব্দ পর্যন্ত করেন না। এখন আসছেন দায়ভারের কথা বলতে।

সঞ্চালক :আপনারা কথায় কথায় এত চেতেন কেন? একটু শান্ত হন। একে অপরকে বাঁশ... থুক্কু, চলুন একে অপরের মন্তব্য শুনে নিজস্ব মতামত দিই। আচ্ছা কিছু পয়েন্ট তোলা যাক। এই যে পেঁয়াজের দাম বেড়ে গেল, এমনকি মাঝারি সাইজের একটা ফুলকপির দামও ৫০ টাকা, চড়া দামের কারণে করলার দিকে তো তাকানোও কঠিন... নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছুর দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে, আপনাদের নিজস্ব মতামত দিন।

সংস্কৃতিবিদ :একটাই কারণ। অপসংস্কৃতি। যে জাতি সংস্কৃতির মূল্য দিতে জানে না, তারাই তো সবকিছুর চড়া মূল্য পরিশোধ করবে। আজ যদি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বেঁচে থাকত...

সাধারণ ব্যক্তি :বেঁচে থাকলে কী হতো, পেঁয়াজের কেজি ১০/২০ টাকা হতো?

সংস্কৃতিবিদ :তা হতো না। কিন্তু তিনি পেঁয়াজ নিয়ে সাহিত্যচর্চার সুযোগ পেতেন। পেঁয়াজের উপর কবিতা হতো, গল্প হতো, উপন্যাস হতো, আর আমরা পেতাম আরেকটি নোবেল!

অর্থনীতিবিদ :নোবেল তো দূরের বিষয়, কদবেলও জুটত না। আজ পর্যন্ত কাউকে দেখলাম না পেঁয়াজের উপর সাহিত্য চর্চা করতে, আর রবীন্দ্রনাথের তো খেয়ে কাজ নেই পেঁয়াজ নিয়ে লেখালেখি করবে! শোনেন, এদেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে কারণ কৃষিকাজে অগ্রগতি নেই। অগ্রগতি না থাকার কারণ কৃষিকাজে এখন টাকা নেই। টাকা আছে ক্যাসিনোতে। কাজেই যার কাছে ৫ কেজির বেশি পেঁয়াজ আছে নিয়ে আসেন, দুই দান খেলে দিই। দেশের অর্থনীতি চাঙা করি।

সঞ্চালক :ধুর মিয়া। আপনে আবার কোত্থেকে ক্যাসিনো টেনে আনলেন। আপনাদের মতো মানুষ নিয়ে আর পারি না। কোথাও শান্তি নেই। যে দুজন বাকি আছেন, দ্রব্যমূল্য নিয়ে কিছু বলার থাকলে বলেন।

রাজনীতিবিদ :সত্যিটা বললে তো আপনারা বিশ্বাস করবেন না। আমি তো জানি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পেছনে কাদের কাদের হাত আছে। তাদের দলকে আমি থোরাই কেয়ার করি। রাজপথে নামতে বলেন। এই আমি তাদের সাথে মোকাবিলা করব। তারা ৫০ টাকার জিনিস ১০০ টাকা বানাতে পারে তো আমরা কি আঙুল চুষি নাকি, আমরা ১০০ টাকার জিনিস ৪০০ টাকা বানিয়ে দেখাব!

সঞ্চালক :ইয়া খোদা। হইছে স্যার। আপনে আর কথাই বইলেন না। আরে, জনাব সাধারণ ব্যক্তি। কাঁদছেন কেন? আপনার কিছু বলার আছে?

সাধারণ ব্যক্তি :আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে! বাজার থেকে দুই হালি পেঁয়াজ কিনছিলাম। একপিস পেঁয়াজ খুঁজে পাচ্ছি না। আমি এখন কোথায় যাব, কী করব, কিছুই বুঝতেছি না। এ জীবন রেখে কী লাভ...

সঞ্চালক :হায় হায়, বলেন কী! প্লিজ আপনি টেনশন নেবেন না। আমরা সবাই মিলে আপনার পেঁয়াজ খুঁজে দিচ্ছি। কেবলমাত্র এই আলোচনা সভা কেন, পৃথিবীর কোনো আলোচনাই একপিস পেঁয়াজের চাইতে মূল্যবান হতে পারে না। আমাদের এবারের সংগ্রাম, হারিয়ে যাওয়া পেঁয়াজ খুঁজে দেওয়ার সংগ্রাম...