দূর নীতি, ধুর নীতি

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৮:০৪

  অয়েজুল হক

 

পাজেরো গাড়িতে ওঠার সময় শফিককে এক পলক দেখেই হতবিহ্বল প্রত্যক্ষদর্শীর মতো থমকে দাঁড়িয়ে যায় মাসুদ। এত্ত দামি গাড়িতে শফিক! পোশাক-আশাকে বিরাট ভদ্রলোক। ভদ্রলোকদের তলা থাকলে বলা যেত দশতলা ভদ্রলোক। উচ্চতা পরিমাপক যন্ত্রের সাহায্যে ভদ্রলোক মাপা যায় না বলেই হয়তো বলা যায় না, তিনি এভারেস্ট টাইপ ভদ্রলোক, তিনি উড়ে চলা মেঘের মতো ভদ্রলোক, আকাশের মতো ভদ্রলোক। মুহূর্তেই ভাবেন, বাড়িটা চেনা দরকার। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রিকশাওয়ালাকে বলেন, ‘যাবে নাকি?’

—কই যাইবেন?

—ওই পাজেরো গাড়ি যেদিকে যায়, সেদিকে।

রিকশাচালক বড়ো বড়ো চোখে তাকায়। ‘এইডা তো প্লেন না, রিকশা; বুঝলেন। রিকশা নিয়ে পাজেরো গাড়ি ধরবে! পাগল একখান।’

‘বাজে কথা বলো কেন? আমি হলাম গ্রামের স্কুলের মাস্টার।’

‘আফনে গ্রামের মাস্টার হন বা লন্ডনের মাস্টার হন, তা দিয়ে আমার কোনো কাম আছে!’ কথা শেষ করেই লোকটা সিগারেট জ্বালায়। সিগারেটে কষে টান মেরে বলে, ‘ওনাকে তো চিনেন না। এলাকার কিং। বয়স হইছে তাতে কী? কথা কইলে পিশাব করে দেবেন।’

‘তাতে সমস্যা নেই। ব্যাগে আরেক সেট কাপড় আছে।’

‘পঞ্চাশ সেট থাকলেও লাভ হবে না। ওনার নাম খান শফিকুর রহমান সাহেব! আগে ছিলেন কিং ভাই, এখন হইল রিং ভাই।’

‘রিং ভাই মানে?’         

‘ওনার কথা, কাজে ঝামেলা পাকালে সোজা রিংয়ে ঝুলায় দেন।’

ছোট বেলার বন্ধুু মাসুদ বুঝে উঠতে পারে না, মন্দ স্বভাবের কারণে লোকজন যাকে বাটপার শফি না বললে চিনত না, সেই লোক কীভাবে ঢাকা শহরে এসে খান শফিকুর রহমান সাহেব হয়ে গেল! যার যা ইচ্ছা তা-ই হোক। মাথা থেকে চিন্তা ঝেড়ে নিজের কাজে মনোযোগী হন। তিনি এসেছেন আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবসের অনুষ্ঠানে যোগদান করতে। সন্ধ্যার পর অনুষ্ঠানের কার্ড পান। অনুষ্ঠানে শফিকের নাম দেখে আরেকবার চমকে ওঠেন। মূর্খ, বাটপার এখন সমাজ সেবক! শক্ত হাতে কার্ড রাস্তায় ছুড়ে ফেলে বিড়বিড় করে বলেন, ‘রাতের গাড়িতেই বাড়ি ফিরছি লীলা। হ্যাঁ হ্যাঁ আসছি। এই তো এখনই টিকিট কাটব। চোরের মুখে ধর্মের কাহিনি শিখতে এসেছি।’

লিলা মাসুদ মাস্টারের স্ত্রী। কথার স্টাইল যেন মোবাইলে কথা বলছেন, অপর প্রান্তে লীলা তার কথা শুনতে পাচ্ছে।

মাসুদ সাহেব একবুক কষ্ট নিয়ে গ্রামে ফিরে গেলেও শফিক সাহেবের বুকের ভেতর আনন্দ কিলবিল করে। ৯ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবসের অনুষ্ঠানে তিনি বিশেষ অতিথি। গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, নেতাদের কাতারে তিনিও বসবেন, খায়-খাতির হবে। তার ইনকামের পথ, নিরাপত্তা হবে সুদূর প্রসারিত। মনে মনে ঠিক করে রেখেছেন, দুর্নীতিবিরোধী দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য হবে, দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের বিরুদ্ধে নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হওয়া! এই হোক দুর্নীতিবিরোধী দিবসের প্রত্যাশা।

বুক ভরা খুশি নিয়ে বাড়ি ফেরা। বাড়িতে আছে স্ত্রী কেয়া আর একমাত্র ছেলে নজরুল। আদুরে ছেলে, বয়স পঁচিশ। তার মাথায় কোনো সমস্যা ছিল না। ইদানীং শফিক সাহেবের মনে হচ্ছে, তার মাথায় সমস্যা। ডাক্তার দেখানো দরকার। সারাক্ষণ বিড়বিড় করে। মাঝে মাঝে চিত্কার। মাঝরাতে শোনা যাবে, অশ্রাব্য ভাষার গালিগালাজ। তার রুমে সে একাই। ঝনঝন শব্দে কখনো গ্লাস-প্লেট, কখনো শোকেসের কাচ ভেঙে চুরমার করবে। ছুটে গিয়ে দেখা যাবে, ঘামে ভেজা শরীর। ভাঙাচোরা গ্লাস-প্লেটের ভেতর নির্ভীকভাবে দাঁড়িয়ে আছে। মাঝরাতে কী শুরু করেছিস? প্রশ্নের জবাবে সে সহজভাবে বলবে, ‘শুটিং প্র্যাকটিস করছি। সামনে অডিশন।’ সে নায়ক। নায়িকার সাথে তার বিরাট এক চরিত্র আছে। সেই চরিত্রে অভিনয় করতে হবে। ছেলেকে ডাক্তার দেখানোর আগের কাজটা হলো, তাকে কে বা কারা টেলিফিল্মের নায়কের জন্য মনোনীত করার কথা বলে প্রতারণা করছে, তাদের খুঁজে বের করা। নজরুল, যে নায়কের মতো নয়, ভিলেনের মতোও নয় বলা হয়েছে। তার উত্তরে সে জানতে চেয়েছিল, তাহলে সে কিসের মতো?

শফিক সাহেব কিছুটা রেগেই বলেন, ‘হিজড়া টাইপ।’

‘হিজড়া চরিত্রেও তো অভিনয় হয়।’

সেই ছেলে আজ পথ আগলে দাঁড়িয়ে বলে, ‘এই... বাবা আর এক পা সামনে এগোবে না। তোমার দুর্নীতির প্রাসাদ ভেঙে আমি তামান্নাকে নিয়ে কুঁড়েঘর বানাব।

শফিক সাহেবের মাথায় রাগ ওঠে। ‘ওরে তামান্না! এক পা এগোব না! আমার বন্দুকটা কই। আজ তোকে গুলি করে মারব বদমাশ।’

নজরুল বলে, ‘লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশন।’

চিত্কার শুনে কেয়া ছুটে আসে। ছেলেকে বুকে আগলে বলে, ‘শাক-সবজি দিয়ে শুরু, তারপর বিদেশে মানব পাচার। টেন্ডারবাজি। এখন শিল্পপতি। চাঁদাবাজির ব্যবসা। ছেলে আর কী হবে? তোমাদের মতো মানুষের জন্য ডেঙ্গু রোগী লাখ ছাড়িয়েছে। সামনে কী হয় কে জানে!’

স্ত্রী বাধা হয়ে দাঁড়ানোতে শফিক সাহেব আর বেশিদূর এগোতে পারেন না। মিনমিন করে বলেন, ‘আমি খারাপ।’

—খারাপ তবু ভালো, তুমি তার চাইতেও খারাপ।

—খারাপ হলে মানুষ আমাকে দুর্নীতি বিরোধী দিবসের অতিথি করতো?

কেয়া বিজ্ঞাপনের মতো হাসে। বয়স হয়েছে এই যা। সামনে বাঁধাই করা দুটো দাঁতের হাসি, ‘নীতি! তোমাকে ফেলে সেই কবেই অনেক দূর চলে গেছে।’

—নীতি চলে গেছে! আমি কী নিয়ে আছি?

—তুমি আছ দুর্নীতি নিয়ে। মনে হয় আর বেশি দিন পারবে না।’

শফিক সাহেব উত্তেজিত কণ্ঠে বলেন, ‘রাখো তোমার নীতি! ধুর নীতি!’

নজরুল আছে শুটিং নিয়ে, সে পিতা-মাতার চিত্কার শুনে বলে, ‘লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশন!’  g