আহসান জোবায়ের
‘আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট জরুরি অবস্থা কীভাবে জাতিগত অনাচার ও দারিদ্র্যের সঙ্গে আন্তঃসম্পর্কিত তার একটি উদাহরণ হলো বাংলাদেশ।’—দৃপ্তকণ্ঠে তরুণীর এমন বক্তব্য শুনে সমাবেশের চারদিকে সমবেত লক্ষ লক্ষ জনতার উত্কণ্ঠা। সবার এই উত্কণ্ঠাই বলে দেয় তরুণী যা বলতে চেয়েছেন সমবেত জনতা সে সম্পর্কে জানতে চায়। এই তরুণী আর কেউ নন, তিনি বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত রেবেকা শবনম। খ্যাতি পেয়েছেন ‘দ্য গ্রেটা শবনম’ নামে।
স্পেনের মাদ্রিদে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন চলছিল। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের অধিকার আদায়ে একদিকে বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেমন চেষ্টা করে যাচ্ছেন, অন্যদিকে তেমনি আন্দোলনকারীদের কাতারে থেকে প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন রেবেকা। সেই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তিনি ম্যানহাটানে প্রায় ২ লাখ মানুষের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন। জলবায়ু পরিবর্তন রোধে সোচ্চার সুইডিশ কিশোরী গ্রেটা থানবার্গের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ম্যানহাটানে জড়ো হওয়া আন্দোলনকারীদের সামনের সারিতে ছিলেন রেবেকা শবনম। তাকে নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা।
মাত্র ৬ বছর বয়সে মা-বাবার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান রেবেকা শবনম। গত ১০ বছরে দেশের স্মৃতি তার মন থেকে ম্লান হয়নি, বরং দেশের কল্যাণের ভাবনায় তার পরিকল্পনা দৃঢ় হয়েছে। আর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সে জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের ঝুঁকি ও তা মোকাবেলার প্রয়োজনীয়তা বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার জন্য নিরন্তর চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
পৃথিবীকে রক্ষার আন্দোলনে গ্রেটা থানবার্গের মতো স্কুল শিক্ষার্থীরা এখন অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। গত সেপ্টম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় গ্রেটার ডাকে নিউইয়র্কসহ বিশ্বের বড় বড় শহরে সমাবেশ হয়। সেসময় ম্যানহাটানে ২ লাখের বেশি মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে জলবায়ু পরিবর্তনে চরম ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশ, বিশেষ করে বাংলাদেশি নারী, শিশু ও রোহিঙ্গাদের ঝুঁকির কথা তুলে ধরেন রেবেকা শবনম।
রেবেকা এখন নিউইয়র্কের একটি হাইস্কুলের শিক্ষার্থী। রেবেকা শবনম আল জাজিরাকে বলেন, ‘বাংলাদেশকে নিয়ে কথা বলার সময় ভেবেছিলাম নীরবতা ছাড়া আর কিছুই শুনতে পাব না। কিন্তু জনতার সাড়া দেখে অভিভূত হয়েছি। জলবায়ু সঙ্কট শুধু একটি পরিবেশগত ইস্যু নয়। এটি জরুরি মানবাধিকার বিষয়ক ইস্যুও। বাংলাদেশি নারী এবং রোহিঙ্গাদের আমরা জানাতে চাই যে, বিশ্বজুড়ে যুব সমাজ তাদের জীবন ও নিরাপত্তার জন্য লড়ছে।’
শবনম সবাইকে বোঝাতে চেয়েছেন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশ কতটা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। নিউইয়র্কে হাজার হাজার মানুষের সামনে তিনি বলেন, ‘আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি, যা জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার দেশগুলোর মধ্যে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত।’ বক্তৃতায় জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে কেমন করে বাংলাদেশের মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে তা তুলে ধরেন রেবেকা।
বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে থাকা দেশগুলোর মধ্যে একটি বাংলাদেশ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার মতে, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহারসহ উন্নয়নের বর্তমান পরিবেশ বৈরি ধারা-প্রবণতা বজায় রাখলে ভয়ঙ্কর জলবায়ু ঝুঁকিতে পড়বে বাংলাদেশ। এখানে নারী, শিশু ও রোহিঙ্গা শরণার্থীরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
গতবছরের চেয়ে এবারের জলবায়ু সম্মেলনে আরো জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে আশা শবনমের। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই এই সম্মেলনে যেন শুধু প্রাপ্ত তথ্যের ওপর নোট নেওয়া না হয়। বরং জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার বন্ধে যেন পদক্ষেপ নেওয়া হয়।’ তার আশা, শুধু পুনঃব্যবহারযোগ্য সম্পদ ব্যবহারে পরিবর্তিত না হয়ে এমন পদক্ষেপ নেওয়া হোক, যেন এর ঝুঁকিতে থাকা মানুষগুলোর জীবন পরিবর্তিত হয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনে সৃষ্ট ঝুঁকির কারণেই ১৬ কোটি মানুষের অনেকেই অভিবাসনের আশ্রয় নিচ্ছেন। ছেড়ে আসছেন নিজ এলাকা, ফলে জলবায়ু উদ্বাস্তুর সংখ্যা বেড়েই চলছে। এতে শহরগুলোতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাচারকারীরা শিশু ও নারীদের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। চলতি বছর জুলাইয়ের জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নারীদের ঘর ছেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন। আর এতে পাচার হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছেন তারা।
ইউনিসেফ বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাপক শাকিল ফয়জুল্লাহর উদ্বৃতি দিয়ে আল জাজিরা জানায়, জলবায়ু পরিবর্তনের এ বিষয়টি আসলে নীরব ঘাতক। প্রতিদিনই আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি, কিন্তু তাত্ক্ষণিকভাবে কিছু দেখা যাচ্ছে না।
গত এপ্রিলে প্রকাশিত ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ১ কোটি ৯০ লাখ শিশু জলবায়ু পরিবর্তনে সৃষ্ট দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। ফয়জুল্লাহ বলেন, ‘এই শিশুরা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যেতে বাধ্য হওয়ায় তাদের শিক্ষা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যখনই কোনো বন্যা হয় স্বাস্থ্যসেবা বিঘ্নিত হয়। বিশেষ করে টিউবয়েল ভেঙে যায়, স্কুল বন্ধ হয়ে যায়। একজন শিশু যদি স্বাস্থ্যসেবা না পায়, শিক্ষা না পায়, এমনকি খাবার পানি না পায়, তাকে আপনি আর কী দেবেন?’
শবনম তার ভাষণে তুলে ধরেন কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তনে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু তৈরি হয়, আর বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া বিশ্বের সবচেয়ে নিপীড়িত জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গারা কতটা ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশ্লেষকরাও বলছেন, নারী ও রোহিঙ্গারা বিশেষভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবিতে ২০১৮ সালে প্রতি শুক্রবার সুইডিশ পার্লামেন্টের বাইরে অবস্থান নেওয়া শুরু করেন স্কুলছাত্রী গ্রেটা থানবার্গ। তার এই অবস্থানের মধ্য দিয়ে বিশ্বজুড়ে বেগবান হয় জলবায়ু আন্দোলন। সম্প্রতি তার প্রতি সমর্থন জানিয়ে দুনিয়াজুড়ে এই আন্দোলনে সামিল হয় লাখ লাখ মানুষ। সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ আয়োজিত এক সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বিশ্বনেতারা যথাযথ ভূমিকা রাখছেন না অভিযোগ করে তাদের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ তোলেন এই জলবায়ুকর্মী। বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত রেবেকা শবনমও গ্রেটার মতো করেই অনেক পথ পাড়ি দিতে চান।
এখনও স্কুলজীবন শেষ হয়নি শবনমের। তিনি মনে করেন, সামনে হাঁটতে হবে আরো অনেক পথ। ভয়াবহ ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের নারী, শিশু ও রোহিঙ্গাদের জন্য বিশ্বের দরবারে কীভাবে সুবিচার প্রত্যাশা করা যায়, সেটাই তার চিন্তার মূল বিষয়। আল জাজিরাকে শবনম জানিয়েছেন, সে চেষ্টা করছে বাংলাদেশকে যেন ভুলে যাওয়া না হয় এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে।
