লড়াইটা বিশুদ্ধ পানি নিয়ে

আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৮:২৭

কৌশিক

 

স্কুলটির চারদিকে কলকারখানা। জীর্ণ পরিবেশের মাঝে অবস্থিত একটি বিদ্যালয়ে গিয়েই দেখা মিললো শিক্ষার্থীদের একটি ছোটখাটো লাইনের। যেখানে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পানি পান করছে একটি ফিল্টার থেকে। শিশুদের মাঝে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করতেই এই ফিল্টার। অজানা হলেও এটাই সত্য যে, শুধুমাত্র ঢাকা শহরেরই কোটিরও বেশি মানুষ পান করে যাচ্ছেন নোংরা পানি। সেই সমস্যা থেকেই বাঁচানোর লক্ষ্যে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহে ব্যবহূত এই ফিল্টার। দৃশ্যটি রাজধানীর সোমপুর এলাকার। উদ্যোগটি ‘ফুটস্টেপস’ নামক একটি সংগঠনের। তাদের এই প্রজেক্টের নাম ‘প্রজেক্ট তৃষ্ণা’। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি শাহ রাফায়াত চৌধুরী বলেন, ‘বর্তমানে সংগঠনটির সব ব্যস্ততা এই উদ্যোগকে ঘিরেই। আমাদের দেশেরই অর্ধেকের বেশি মানুষ পান করে যাচ্ছেন অনিরাপদ পানি। এই প্রকল্পের অংশ হিসেবে নিরাপদ পানি পান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ঢাকা শহরের ২৮টি বিদ্যালয় এবং ১২টি পাবলিক স্পেসে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা থেকে সুবিধা পাচ্ছেন প্রায় ৩০ হাজার মানুষ।’

এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত টিচ ফর বাংলাদেশের লালবাগ ২ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ফেলো শিক্ষক আবদুল মালেক বলেন, ‘এই প্রকল্পের অধীনে আমাদের বিদ্যালয়ের ৭০০ জন শিক্ষার্থী বিশুদ্ধ পানি পান করা ছাড়াও নিরাপদ পানির প্রয়োজনীয়তার বার্তা অনুভব করতে পারছে।’ প্রজেক্ট তৃষ্ণার শুরুটা কিভাবে? উত্তরে রাফায়াত জানান, রিকশায় করে গুলশান থেকে তেজগাঁও যাচ্ছিলেন রাফায়াত। মাঝপথে রিকশাওয়ালা রিকশা থামিয়ে, রাস্তার পাশ থেকেই পানি পান করছিলেন। নোংরা, দুর্গন্ধময় পানি থেকেই রাফায়েত চিন্তা করেন। সহজেই এতে করে নানাবিধ সমস্যা হতে পারে। মাথায় আসে নিরাপদ পানির প্রকল্পের চিন্তা। গ্রহণ করলেন বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের নতুন এক চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে প্রকল্পটি শুধুমাত্র ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ থাকলেও খুব শিগগিরই সারাদেশের প্রতিটি কোণায় ছড়িয়ে দিতে চান প্রজেক্ট তৃষ্ণা।

 

১০টিরও বেশি উদ্যোগ

নিরাপদ পানির আন্দোলন ছাড়াও তারা কাজ করে যাচ্ছেন আরো কয়েকটি সামাজিক প্রকল্প নিয়ে। সমস্যা সমাধানেই যেন তারা খুঁজে পান নিজেদের আনন্দ। কথা হলো রাফায়াতের সঙ্গে। জানালেন নিজেদের পথচলার গল্প। রাফায়াত বলেন, ‘ফুটস্টেপস বাংলাদেশ একটি উন্নয়নভিত্তিক সামাজিক প্রতিষ্ঠান, যা আমাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্যমান বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার সমাধানের জন্য সামাজিক উদ্যোগের নকশা প্রণয়নের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করে আসছে। সামাজিক সরঞ্জাম এবং প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগের পরে যে কেউই তার সামাজিক চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে উঠতে পারেন, এমন দৃঢ় বিশ্বাসেই আমাদের পথচলা।’

২০১৩ সাল থেকে সামাজিক সমস্যাকে বিদায় জানানোর লক্ষ্যে তারা কাজ করে যাচ্ছে। নিরাপদ পানির গ্রহণযোগ্যতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মহিলাদের ক্ষমতায়ন, যুব উন্নয়ন ও সচেতনতা বিল্ডিংয়ের মতো সামাজিক চ্যালেঞ্জগুলোকে কেন্দ্র করে ১০টিরও বেশি সামাজিক উদ্যোগ বাস্তবায়নে কর্যক্রম পরিচালনা করছে তারা।

 

শুরুর কথা

সমাজকে বদলানোর লক্ষ্যে কাজ করে যাওয়া এই সংগঠনের যাত্রা শুরু হয় ২০১৩ সালে। স্কলাস্টিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ুয়া একদল ছাত্রছাত্রী নিয়ে সংগঠনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়, যার নেতৃত্ব দেন রাফায়েত। শুরুর গল্পটা শোনা হলো রাফায়াতের মুখ থেকেই। তিনি বলেন, ‘এমন একটি সংগঠন করার উদ্যোগ নিতে চেয়েছিলাম, যা আমাদের সমাজকে দারিদ্রমুক্ত করতে সহায়তা করবে। এককালীন সমাধানের বিপরীতে স্থায়ী সমাধান নিয়েই কাজ করতে চেয়েছিলাম।’

এরইমধ্যেই ময়লা নিরসন কিংবা শীতার্ত অসহায়দের পাশে থাকা ছাড়াও বেশকিছু সফল প্রকল্পের মাধ্যমে লাখো মানুষের মনে জায়গা করে নেওয়া সংগঠনটির কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বর্তমানে মূল সদস্য হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন ১০ জন তরুণ-তরুণী। এছাড়াও চেঞ্জমেকারস নামে পরিচিত হাজারো সেচ্ছাসেবী যুক্ত রয়েছেন এই সংগঠনে। সংগঠনের ১০ জন মূল সদস্যদের মধ্যে ৩ জন সদস্য বিদেশ থেকেই পড়াশোনা শেষে করে সমাজে ভালো কিছু করার তাগিতে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। প্রায় ৫ বছরের অধিক পথচলায় অর্জনের ঝুলিটাও যেন খালি নেই সংগঠনটির। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে রয়েছে একাধিক পুরস্কার। পেয়েছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি। সিএসআর ব্যবহার করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের জন্য ২০১৩ সালে জাইকা থেকে সুনিএ এবং ডিএনসিসি পুরস্কার ছাড়াও ২০১৭ সালে এটি সুইসভিত্তিক রাইটস গ্রুপ গ্লোবাল চেঞ্জমেকার্সের কাছ থেকে ৬০টি শীর্ষস্থানীয় বৈশ্বিক যুব সংগঠনের মধ্যে স্বীকৃতি পায় ফুটস্টেপস। ২০১৮ সালে ১৬টি শীর্ষস্থানীয় বিশ্ব যুব প্রকল্পের মধ্যে ইউরোপিয়ান কমিশন এবং চলতি বছর গ্লোবাল এন্টারপ্রেনারশিপ সামিটে বিনিয়োগের জন্য ৬টি বাংলাদেশি সংস্থার সঙ্গে পুরস্কৃত হয় মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর এবং নেদারল্যান্ডসের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকেও।