শিফারুল শেখ
১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর ৭০টি বছর কেটে গেল উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট বা নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশনের (ন্যাটো)। স্নায়ুযুদ্ধের শুরুতে রাজনৈতিক ও সামরিক এই জোট গঠনের উদ্দেশ্য ছিল সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে সমন্বিত সুরক্ষা দেওয়া। ৭০ বছর পরে পরিবর্তিত বিশ্বে যেখানে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের সুরক্ষার অগ্রাধিকার রয়েছে সেখানে কি এটি এখনো প্রাসঙ্গিক? আর ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো এখন একে অপরের সমালোচনা করছে। প্রভাবশালী মার্কিন থিংক ট্যাংক আটলান্টিক কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী ফ্রেডারিক ক্যাম্পে বলছেন, লন্ডন সম্মেলনকে ঘিরে মিডিয়া ন্যাটোভুক্ত দেশের নাটককে বেশি ফোকাস করেছে। ফলে আড়ালে থেকে গেছে এর মূল বিষয়। তার মতে, ন্যাটোর মূল চ্যালেঞ্জ এখন চীন, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ।
মরতে বসেছে ন্যাটো!: ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ মনে করেন, সামরিক জোট হিসেবে ন্যাটো মরতে চলেছে। বর্তমানে ন্যাটোর ‘ব্রেন ডেথ’ চলছে। তার মতে, সদস্য দেশগুলোর মধ্যে কৌশলগত সমন্বয়ের অভাব এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে আমেরিকার গতিপ্রকৃতি বোঝা যেভাবে কঠিন হয়ে পড়েছে, সে কারণেই এই জোটের এমন অবস্থা হয়েছে। এই বাস্তবতা সম্পর্কে তিনি ইউরোপের দেশগুলোকে সতর্ক করে দিয়েছেন। তবে জার্মানি কিংবা তুরস্ক সেটা মনে করেন না। তুর্কি প্রেসিডেন্ট রেসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান তো উলটো ফরাসি প্রেসিডেন্টের ব্রেন ডেথ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন।
সম্মেলনের ফাঁকে বিশ্ব নেতাদের এক আড্ডায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে উপহাস, ট্রাম্পের সংবাদ সম্মেলন বয়কট এবং কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দুমুখো বলা—এসব নাটকীয় বিষয় মিডিয়ায় গুরুত্ব পেয়েছে। যদিও সদস্য দেশগুলো একটি যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন যাতে ভাষাগত অস্পষ্টতা রয়েছে। আবার বিবৃতিতে এটা স্পষ্ট যে, চীন মৌলিক চ্যালেঞ্জ না কী অর্থনৈতিকভাবে দেশটি সুবিধাজনক সেই বিষয়ে একমত হতে পারেনি দেশগুলো। দুই দিনব্যাপী সম্মেলন শেষে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আমরা স্বীকার করছি যে, চীনের ক্রমাগত অর্থনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি এবং বর্তমানের আন্তর্জাতিক নীতি উভয়ই সুযোগ ও চ্যালেঞ্জের। এটাকে আমাদের জোটগতভাবে মোকাবিলা করতে হবে।
চীন যেভাবে চ্যালেঞ্জ: চীন এখন বিশ্বে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে। এর অধিক জনসংখ্যা মানবসম্পদে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পর একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বেশি সামরিক ব্যয় করে থাকে। অর্থনীতিতেও যুক্তরাষ্ট্রের পরে অবস্থান। দেশটির নীতি আপনি কী চান? তারা সেটাই দিতে আগ্রহী। এমন নীতির কারণে খুব শিগগিরই এটা বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশে পরিণত হবে। হয়তো বা এরই মধ্যে হয়েও গেছে।
সম্মেলনে গুরুত্ব পায়নি চীনে উইঘুর মুসলিমদের ওপর নির্যাতন, হংকংয়ে বিক্ষোভ ও স্থানীয় নির্বাচন, এমন কি চীনা প্রযুক্তি কোম্পানি হুয়াওয়ের ফাইভ জি নেটওয়ার্কও গুরুত্ব পায়নি। খুব কম আলোচিত হয়েছে, রাশিয়ার সঙ্গে চীনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বিশেষ করে দুই দেশের মধ্যে ১৮০০ মাইল দীর্ঘ গ্যাস পাইপ লাইনের সংযোগ স্থাপন এবং রাশিয়ার শীর্ষ আট বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে হুয়াওয়ের সম্পর্ক। আটলান্টিক কাউন্সিলের বেরি পাভেল এবং আইয়ান ব্রজেজিনিস্কি পরামর্শ দিয়েছেন, ন্যাটো যেন ন্যাটো-চায়না কাউন্সিল গঠন করে। তাহলে উদ্বেগের বিষয়গুলো তাদের জানানো যাবে। আবার রাশিয়ার কাছেও সেগুলো উপস্থাপন করা সম্ভব হবে। আর সেই উদ্বেগের তালিকা এরই মধ্যে দীর্ঘ হয়েছে বলে মনে করেন এই দুই নিরাপত্তা বিশ্লেষক। হুয়াওয়ে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার ডিজিটাল অবকাঠামোকে টার্গেট করেছে; ইউরোপের বড়ো বড়ো সব সমুদ্র বন্দরে চীনের কর্তৃত্ব বাড়ছে যা ন্যাটোর কাছে স্পর্শকাতর বন্দর হিসেবে পরিচিত; রাশিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া বিশেষ করে নর্ডিক-বাল্টিক অঞ্চলে এবং সাইবার হামলা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ চুরি।
রাশিয়া কত বড়ো হুমকি?: ন্যাটো জোট বিগত বছরগুলোতে যে ধরনের কৌশলগত হুমকির মোকাবিলা করেছে, তা এখন বদলে যাচ্ছে। আগের হুমকির ধরনটা ছিল স্পষ্ট। কিন্তু এখন তা অনেক বেশি জটিল। রাশিয়ার পুনরুত্থান থেকে শুরু করে সাইবার যুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ থেকে ব্যাপক অভিবাসন এ রকম নানা ধরনের হুমকির মুখে ন্যাটো। এমন কি রাশিয়ার হুমকিও একেবারেই ভিন্ন প্রকৃতির। এটি সেই পুরোনো আমলের সোভিয়েত ইউনিয়ন নয়। রাশিয়ার বিশাল সেনাবাহিনী ট্যাংক নিয়ে পশ্চিমের দেশগুলোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে দৃশ্যটা ঠিক এ রকম নয়। বরং এই হুমকি সাইবার হামলা থেকে শুরু করে, প্রচার যুদ্ধ, যার মাধ্যমে পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে অস্থিতিশীলতা তৈরি করা যায়।
রাশিয়া তুলনামূলকভাবে দুর্বল দেশ। কিন্তু দরকার হলে সামরিক শক্তি প্রয়োগে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া পিছপা হবে না বলে মনে করা হচ্ছে। জর্জিয়া এবং ইউক্রেনে গত কয়েক বছরে যা ঘটেছে, সেটা অন্তত তাই বলে। বিশ্লেষকরা বলছেন, রাশিয়া অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হওয়ায় চীনই বড়ো চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে ন্যাটোর কাছে।
