মুক্তিযুদ্ধের সময় দৈনিক ইত্তেফাককে সরকারের নির্দেশ মেনে সংবাদ প্রকাশ করতে বাধ্য করা হয়। সেই অবরুদ্ধ ও কণ্ঠ রোধ করা দিনগুলোতেও কিছু ব্যক্তি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে সতর্কতার সঙ্গে সত্য উচ্চারণ করেছিলেন। শহিদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন ছিলেন একমাত্র সাংবাদিক, যিনি সুকৌশলে, নির্ভীকভাবে সরকারের নানা দিক উন্মোচন করেছেন। আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে তিনি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সরকারি প্রচারণার জবাব দিয়েছিলেন সাংবাদিকের ভাষায়। লিখেছিলেন ‘ঠগ বাছিতে গাঁ উজাড়’, ‘অধুনা রাজনীতির এক অধ্যায়’, ‘নেতা জনতা ও পাঠক’ শিরোনামে বেশ কিছু লেখা। এ লেখায় তিনি বলেছিলেন যে আওয়ামী লীগ নয়, দেশের পরিস্থিতির জন্য দায়ী ইয়াহিয়া খানের পদলেহন করা রাজনৈতিক দলগুলো। আর শেখ মুজিবুর রহমানকে যে দোষে অভিযুক্ত করা হচ্ছে, সে দোষ জুলফিকার আলী ভুট্টো ও ইসলামী দলের নেতারাসহ প্রায় সব রাজনৈতিক দলের প্রধানরাও করেছেন।
১০ ডিসেম্বর, ১৯৭১। রাত প্রায় ৩টা। চামেলীবাগের বাসা থেকে ইত্তেফাকের কার্যনির্বাহী সম্পাদক সিরাজুদ্দীন হোসেনকে তুলে নিয়ে যায় সশস্ত্র ব্যক্তিরা। সেই যে গেলেন আর ফিরে আসেননি। লাশও পাওয়া যায়নি এই শহিদ সাংবাদিকের। পাকিস্তানি বাহিনীর দোসর আলবদর বাহিনীর সদস্যরা সিরাজুদ্দীন হোসেনকে ধরে নিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়েই শুরু করে ঘৃণ্য এই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বুদ্ধিজীবী হত্যা। এদিন রাতে পিপিআইয়ের চিফ রিপোর্টার সৈয়দ নাজমুল হককেও তার বাসভবন থেকে অপহরণ করা হয়।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পাকিস্তান ও তাদের দোসর রাষ্ট্রগুলো যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা চালাচ্ছিল। এতদিনে তারা বুঝে গেছে, এই যুদ্ধে জেতার সম্ভাবনা একদমই নেই। এ সময় তারা দেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করার এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করে। সপ্তাহ খানেকের বেশি সময় ধরে চলছিল এই তালিকা তৈরির কাজ। দেশের শিক্ষিত শ্রেণি অর্থাত্ শিক্ষক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, চিকিত্সক, আইনজীবীদের রাখা হচ্ছিল এ তালিকায়।
এদিকে রণাঙ্গনে ‘মুক্তি’ শব্দটি আতঙ্ক হয়ে দেখা দিয়েছে নিজেদের প্রবল প্রতাপশালী মনে করা পাকিস্তানি সৈন্যদের কাছে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যুদ্ধের মাঠে দ্রুত তাদের নিয়ন্ত্রণ হারাতে থাকে। এতে সৈন্যদের মনোবল ভেঙে পড়েছিল। হানাদারদের হতাহতের সংখ্যা যত বাড়ছিল; ভয়ে, আতঙ্কে প্রশিক্ষিত এই বাহিনী পালানোর পথ খুঁজে পাচ্ছিল না। রণক্ষেত্রে সৈন্যরাই শুধু নয়, বড়ো বড়ো তকমাধারী আর্মি অফিসাররাও পালানোর চেষ্টার ত্রুটি করছিল না। যুদ্ধে পরাজয়ের আশঙ্কায় লে. জেনারেল নিয়াজি পালানোর পাঁয়তারা করে। তার গোপন এই অভিসন্ধি বিবিসি ফাঁস করে দেয়। নিয়াজি স্বীয় দুর্বলতা ঢাকার জন্য একাত্তরের এই দিনে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে দম্ভভরে বলেন, ‘কোথায় বিদেশি সাংবাদিকরা, আমি তাদের জানাতে চাই, আমি কখনো আমার সেনাবাহিনীকে ছেড়ে যাব না।’
একাত্তরের এই দিনে খুলনা শিপইয়ার্ডের কাছে দায়িত্ব পালন করছিলেন বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ রুহুল আমীন। পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের মুখে মৃত্যুকে তোয়াক্কা না করে প্রতিরোধ গড়ে শহিদ হন এই যোদ্ধা।
বাংলাদেশের দামাল মুক্তিযোদ্ধারা এবং ভারতীয় বাহিনী কয়েক দিন ধরে সম্মিলিতভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল। এদিন এসব বাহিনীকে এক কমান্ডের অধীনে এনে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সিনিয়র কমান্ডারদের যৌথ বাহিনী পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
এদিন মিত্র বাহিনীর জঙ্গিবিমানগুলো ঢাকা বেতারকেন্দ্রের ওপর আক্রমণ করে এবং কুর্মিটোলার ওপর বারবার রকেট হামলা অব্যাহত রেখে নিজেদের কর্তৃত্ব স্থাপন করে। মিত্র বাহিনীর বিমান আক্রমণে চট্টগ্রাম ও চালনা বন্দর অচল হয়ে পড়ে। কয়েকটা জাহাজভর্তি পাকিস্তানি বাহিনী বঙ্গোপসাগর দিয়ে পালানোর সময় ধরা পড়ে। একটি জাহাজে নিরপেক্ষ দেশের পতাকা উড়িয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর সিঙ্গাপুরে পালানোর পথে মিত্র নৌবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে।
এ সময় সম্মিলিত বাহিনী উত্তরাঞ্চলের যুদ্ধে সর্বাত্মক সাফল্য অর্জন করেছে। মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী যৌথ অভিযান চালিয়ে দিনাজপুর, রংপুর ও সৈয়দপুরের শত্রুবাহিনীকে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। যৌথ বাহিনী এই তিন শহর ছাড়া রংপুর ও দিনাজপুর জেলা সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত করে। রাতে পাকিস্তানি বাহিনী, সেনাবাহিনী জামালপুর গ্যারিসন ছেড়ে ঢাকার দিকে পালানোর সময় শহরের অদূরে যৌথ বাহিনীর মুখোমুখি হয়। এ যুদ্ধে প্রায় দেড় হাজার পাকিস্তানি সেনা হতাহত হয়। বাকিরা আত্মসমর্পণ করে।
পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি আগা শাহি জাতিসংঘের রাষ্ট্রদূত উ থান্টের সঙ্গে সাক্ষাত্ করে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারের দাবি ব্যক্ত করেন। চীনের অস্থায়ী পররাষ্ট্রমন্ত্রী চিপো ফেই বলেন, ভারতের কার্যকলাপে তার সম্প্রসারণবাদী নগ্ন রূপ প্রকাশ হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, সমাজতন্ত্রী সাম্রাজ্যবাদীরা নির্লজ্জের মতো ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের ত্রাণকর্তার ভূমিকা গ্রহণ করে বর্বরোচিত কাজ করেছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী নয়াদিল্লিতে বলেন, যুদ্ধবিরতি-সংক্রান্ত জাতিসংঘের আহ্বান ভারত প্রত্যাখ্যান করেনি বা গ্রহণও করেনি। প্রস্তাবটি সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিজয় শুধু তখনই সম্ভব হবে, যখন বাংলাদেশ সরকার কায়েম হবে এবং বর্তমানে ভারতে অবস্থানরত ১ কোটি শরণার্থী তাদের বাস্তুভিটায় ফিরে যেতে পারবে।
