ওরা বিকশিত হোক সমান অধিকারে

আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৭:৪৯

  মারুফা হোসেন

 

একটি শিশুর প্রতিবন্ধিতা যখন শনাক্ত হয়, তখন সেই পরিবারে ঘটে যায় ছন্দপতন। প্রথমত,   মা-বাবা হয়ে পড়েন দিশেহারা। তারা জানেন না সেই সন্তানকে নিয়ে তারা কী করবেন, কোথায় যাবেন, কিংবা তাদের ভবিষ্যত্ কী। এসব কথা চিন্তা করে তারা হয়ে যান বিমর্ষ, হতাশাগ্রস্ত। সচেতনতার অভাবে আমরা অনেকেই জানি না যে, একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বা শিশুরও আছে সম্মানের সঙ্গে অন্য সবার মতো মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার অধিকার। একজন প্রতিবন্ধী শিশু বা ব্যক্তির অধিকার সুরক্ষা এবং তাদের প্রতি বৈষম্য দূর করার জন্য বাংলাদেশে একটি আইন প্রণীত হয়েছে। যার নাম ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন-২০১৩’। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কে বা কাদের বলা হচ্ছে, তাদের কী কী অধিকার ও সুুযোগ-সুবিধা রয়েছে, কোন অপরাধে কী ধরনের শাস্তি হতে পারে, তাদের উন্নয়নের লক্ষ্যে কী করণীয়, আইনটি বাস্তবায়নে কার কী দায়িত্ব ইত্যাদি বিষয়গুলো এ আইনে রয়েছে।

সেক্ষেত্রে জেনে নেওয়া যাক আইনে কাদের প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বলা হচ্ছে— প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হলেন সেই ব্যক্তি যিনি, যে কোনো কারণে ঘটিত দীর্ঘমেয়াদি বা স্থায়ীভাবে শারীরিক, মানসিক, বুদ্ধিগত, বিকাশগত বা ইন্দ্রিয়গত ক্ষতিগ্রস্ততা বা প্রতিকূলতা এবং ব্যক্তির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিগত ও পরিবেশগত বাধার পারস্পরিক প্রভাব, যার কারণে উক্ত ব্যক্তি সমতার ভিত্তিতে সমাজে পূর্ণ ও কার্যকর অংশগ্রহণে বাধাপ্রাপ্ত হন। এরই মধ্যে শুধু একটি দিক তথা ব্যক্তির নিজস্ব অসুবিধার বিবেচনায় আইনে ১২ ধরনের প্রতিবন্ধিতার কথা বলা হয়েছে।

পূর্ণমাত্রায় বাঁচিয়া থাকা ও বিকশিত হওয়া, সর্বক্ষেত্রে সমান আইনি স্বীকৃতি এবং বিচারগম্যতা, উত্তরাধিকার প্রাপ্তি, স্বাধীন অভিব্যক্তি ও মতপ্রকাশ এবং তথ্যপ্রাপ্তি, মাতা-পিতা, বৈধ বা আইনগত অভিভাবক, সন্তান বা পরিবারের সঙ্গে সমাজে বসবাস, বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন ও পরিবার গঠন, প্রবেশগম্যতা, শিক্ষার অধিকার, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মে নিযুক্তি কর্মক্ষেত্রে কোনো কারণে প্রতিবন্ধিতার শিকার হলে সুরক্ষা, নিপীড়ন হতে সুরক্ষা এবং নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশের সুবিধাপ্রাপ্তি, প্রাপ্যতা সাপেক্ষে সবচেয়ে ভালোমানের স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রসহ প্রযোজ্য সব ক্ষেত্রে ‘প্রয়োজনীয় স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য উপযোগী পরিবেশ ও ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তি, শারীরিক, মানসিক ও কারিগরি সক্ষমতা অর্জন করে সমাজজীবনের সব ক্ষেত্রে  সম্পূর্ণভাবে একীভূত হবার লক্ষ্যে সহায়কসেবা ও পুনর্বাসন সুবিধাপ্রাপ্তি, মাতা-পিতা বা পরিবারের ওপর নির্ভরশীল প্রতিবন্ধী ব্যক্তি মাতা-পিতা বা পরিবার হতে বিচ্ছিন্ন হলে বা তার আবাসন ও ভরণ-পোষণের যথাযথ সংস্থান না হলে, যথাসম্ভব, নিরাপদ আবাসন ও পুনর্বাসন, সংস্কৃতি, বিনোদন, পর্যটন, অবকাশ ও ক্রীড়া কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ, শ্রবণ ও বাক্প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য বাংলা ইশারা ভাষা ব্যবহার, ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা, জাতীয় পরিচয়পত্র প্রাপ্তি, ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি, ভোট প্রদান এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ, স্ব-সহায়ক সংগঠন ও কল্যাণমূলক সংঘ বা সমিতি গঠন ও পরিচালনা, বাড়ি-ঘর, দালানকোঠা, যানবাহন, তথ্য-যোগাযোগ, সুযোগ-সুবিধা পেতে যে বাধা রয়েছে তা দূর করা, সরকার কর্তৃক সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা নির্ধারিত অন্য কোনো অধিকার।

পরিশেষে বলতে চাই, সমাজের একটা বিরাট অংশকে আলাদা রেখে জাতির সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই শুধু আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, এর জন্য প্রয়োজন আইনের পূর্ণ ব্যবহার। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, এই আইনসমূহের পূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য যে যে পদক্ষেপ গ্রহণ করার কথা আইনে উল্লেখ করা আছে তার বাস্তবায়ন মোটেই সন্তোষজনক নয়। একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি যে সৃষ্টিশীল হতে পারে এ কথাটি স্মরণ করে তার প্রতিবন্ধিতা না দেখে তার সুপ্ত প্রতিভাকে কাজে লাগাতে হবে। আবার প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী ও তাদের পরিবারকেও অধিকার আদায়ে সোচ্চার হতে হবে। তাদের প্রতি করুণা নয়, প্রয়োজন আমার, আপনার সবার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন যা একীভূত সমাজ বিনির্মাণে অপরিহার্য।

ছবি: ইন্টারনেট