সাইক্লিংয়ের আয়রনম্যান তাম্মাত

আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৭:৪৯

>>  মুহাম্মদ শফিকুর রহমান

 

তখন তাম্মাত খুব ছোট। বিটিভির ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’তে তিনি দেখলেন, এক বৃদ্ধ সাইকেল চালিয়ে দেশ ঘুরে বেড়াচ্ছে। ছোট তাম্মাতের মনে দৃশ্যটা গেঁথে যায়। ভাবলেন বড়ো হয়ে তিনিও দেশ ভ্রমণে যাবেন সাইকেলে। তবে অভিভাবকেরা সাইকেল নিয়ে তাকে পরিবার থেকে দূরে যেতে দিতে চাইতেন না। কিন্তু সাইক্লিংয়ে প্রতি তাম্মাতের অসীম ভালোবাসা। লুকিয়ে লুকিয়ে রাতে সাইকেল নিয়ে বেরোতে হতো তখন। ২০১৭ সালে ৬৪ জেলা ভ্রমণেও রাতের আঁধারে লুকিয়ে বের হয়েছেন। লুকিয়ে সাইকেল চালানো সেই তাম্মাতের নামের পাশে এখন অসংখ্য রেকর্ড শোভা পাচ্ছে। মাত্র ১৫ দিনে দেশের ৬৪টি জেলা ভ্রমণ করেছেন তিনি। পুরো নাম তাম্মাত বিন খায়ের। জন্ম গোপালগঞ্জ হলেও থাকেন চট্টগ্রামে। পড়াশোনা করছেন চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে গণিত বিষয়ে। বাবা  পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নেয়ামত আলী সিকদার। ছয় ভাই এক বোনের মধ্যে তাম্মাত সবার ছোট। তাম্মাত বলেন, ‘শুরুতে পরিবার বাধা দিলেও এখন সহযোগিতা করছে। বাবা-মা যখন আমার সফলতার খবর পড়েন, তখন তাদের চোখেমুখে আনন্দ খেলা করে।’ তরুণদের জন্য তাম্মাতের ঘটনা শিক্ষণীয়। তিনি বলেন, ‘আপনার সব স্বপ্নে পরিবার কখনো আপনাকে প্রথমে সাপোর্ট দেবে না। তার মানে এই না যে হাল ছেড়ে দিতে হবে। আন্তরিকতভাবে সর্বোচ্চ চেষ্টা করলে সফলতা আসবেই। পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গিও তখন পাল্টে যাবে।’

সম্প্রতি তাম্মাত বিন খায়ের মাত্র ১৫ দিনে ৬৪ জেলা সাইকেল চালিয়ে ভ্রমণ করেছেন। এত কম সময়ে যা কেউ করতে পারেনি। প্রতিদিন ২৭০ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়েছেন তিনি। তাম্মাত নতুন আরো যে রেকর্ডগুলো করেছেন, তা হলো—সবচেয়ে কম সময়ে সাইকেলে ১ হাজার কি.মি. পথ পাড়ি (মোট সময় :চার দিন), সবচেয়ে কম সময়ে সাইকেলে ২ হাজার কি.মি. পথ পাড়ি (মোট সময় :আট দিন), সবচেয়ে কম সময়ে সাইকেলে ৩ হাজার কি.মি. পথ পাড়ি (মোট সময় :১২ দিন), ১৪ দিন ২০ ঘণ্টা ২৩ মিনিটে বাংলাদেশের ৬৪ জেলা সাইকেলে পাড়ি, সবচেয়ে কম সময়ে সাইকেলে ৩৯৭০.৭ কি.মি. প্রায় ৪ হাজার কি.মি. পথ পাড়ি (মোট সময় :১৫ দিন ১৭ ঘণ্টা ৯ মিনিট)। এই ট্রিপে মোটর বাইকে করে তাম্মাতের পাশে থেকে দুই বন্ধু সার্পোট দেয়। এর আগে ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে তাম্মাত ২৫ দিনে পুরো দেশ ভ্রমণ করেন। তাম্মাত আসলে একজন পুরোদস্তুর অ্যাথলেট। দৌড়, সাঁতার, সাইক্লিং, ট্রেইল রান, ক্লাইম্বাথনসহ বিভিন্ন বিষয়ে তার দক্ষতা রয়েছে। এ জন্য ক্রীড়া জগতের অনেকে তাকে ‘স্পিডস্টার’ বলে থাকে। সবচেয়ে কম সময়ে পায়ে হেঁটে তাম্মাত টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া গিয়েছেন। ২০১৮ সালে মাত্র ২৪ দিনে পায়ে হেঁটে তিনি টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া যান। গত তিন বছরে প্রায় ম্যারাথন, ডুয়াথলন, ট্রায়াথলন, সাইকেল রেসসহ ৫০টির মতো প্রতিযোগিতায় তাম্মাত অংশ নেন। তিনি জানান, এর মধ্যে প্রায় ৪০টির বেশি প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ান হয়েছেন। শুধু সাইক্লিং নয়, জনকল্যাণেও কাজ করেন। বিদ্যালয়ে স্যানেটারি ন্যাপকিন বাক্স রাখার বিষয়ে প্রচারণা চালান তাম্মাত। স্কুলে ইমার্জেন্সি স্যানিটারি প্যাড বাক্স স্থাপনের জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘দেশের প্রতিটি স্কুলে ইমার্জেন্সি স্যানিটারি প্যাড বক্স স্থাপনে সচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করতে চাই। পারিবারিক ও সামাজিক বিভিন্ন গোঁড়ামি ও অসচেতনতার ফলে পিরিয়ড নিয়ে সবচেয়ে বেশি অস্বস্তি কিংবা ভোগান্তিতে পড়তে হয় স্কুলগামী ছাত্রীদের। তাই সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন।’

সাইক্লিংয়ে খরচপাতির প্রয়োজন আছে। একজন স্টুডেন্ট হয়ে কীভাবে তা ম্যানেজ করেন? তাম্মাত বলেন, টিউশনির টাকা, পুরস্কার থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে খরচ চালাতে চেষ্টা করি। মাঝেমধ্যে বন্ধুবান্ধব ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা সহযোগিতার হাত বাড়ান।’

তাম্মাত বিন খায়ের স্বপ্ন দেখেন ‘আয়রনম্যান’ প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার। যদিও এটা অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার। কারণ আয়রনম্যান প্রতিযোগিতার ব্যাপ্তি প্রায় ১৭ ঘণ্টা। এর মধ্যে ৩.৮ ঘণ্টা সমুদ্রে সাঁতার কাটতে হয়। দৌড়াতে হয় ৪২ কিলোমিটার। পাশাপাশি সাইকেল চালাতে হয় ১৮০ কিলোমিটার। প্রচণ্ড মানসিক, ফিজিক্যালি শক্তি-সামর্থ্যসম্পন্ন অ্যাথলেটরা এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকে।

দেশের মাটিতে সাইক্লিংয়ে ব্যাপক সাফল্য পেলেও তাম্মাতের কোনো স্পন্সর নেই। কোথাও ট্রিপে যেতে চাইলে তাকে খরচের কথা ভাবতে হয়। অথচ তাম্মাত স্পন্সর পেলে অনেক ভালো করতে পারেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘২০১৭ থেকে আজ অবধি অসংখ্য বেসরকারি কোম্পানি ও সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের কাছে গিয়েছি। আশ্বাস দিলেও কেউ এগিয়ে আসেনি।’ তিন বছরে একটি স্পন্সর না পাওয়া তাম্মাতের অ্যাথলেট জীবনে সবচেয়ে বড় দুঃখ বলে জানান। মিডিয়ায় তার সফলতার খবর ফলাও করে ছাপা হয় বটে। তবে স্পন্সর করতে কেউ এখনো এগিয়ে আসেনি। জানা গেল, নতুনদের স্পন্সর করতে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর প্রবল অনীহা। আবার মাধ্যম হয়ে স্পন্সর চাইতে যাওয়ার মতো লোক তাম্মাতের নেই। ইউটিউব, নেটে ঘাটাঘাটি করে তাম্মাত শেখেন বলে জানান। অথচ দেশের বাইরে থেকে তাকে ট্রেনিং দিয়ে আনলে আরো ভালো করতেন তিনি। এমনটাই তার আশাবাদ। সরকার তাম্মাতের পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে আসতে পারে। এ ধরনের অল্প বয়সী তরুণ অ্যাথলেট পৃষ্ঠপোষকতা পেলে অনেকে ভালো করবে, এমনটাই মনে করে বিখ্যাত অনেক সাবেক  অ্যাথলেট। তাম্মাতের স্বপ্ন আয়রনম্যান হয়ে দেশের মুখ পৃথিবীর বুকে উজ্জ্বল করবে। আর সে জন্য কেউ না কেউ তাকে স্পন্সর করতে এগিয়ে আসবে।