কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত। আমাদের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৮০ ভাগ এবং শ্রমশক্তির ৬০ ভাগ কৃষিতে নিয়োজিত। কৃষির অগ্রগতির ফলে বাংলাদেশ খাদ্য উত্পাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার প্রায় দ্বারপ্রান্তে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র আয়তন ও বিপুল জনসংখ্যার একটি দেশ। কিন্তু দেশের অধিকাংশ জমি আবাদযোগ্য ও উর্বর হওয়ায় এইখানে কৃষি খাতের সম্ভাবনাও অনেক। তবে সম্প্রতি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)-এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে যে উপাত্ত ফুটিয়া উঠিয়াছে তাহা খানিকটা দুর্ভাবনার সৃষ্টি করিয়াছে। গবেষণা প্রতিবেদন অনুসারে, দেশে বত্সরে প্রায় ৭১ হাজার হেক্টর কৃষিজমি অকৃষি খাতে চলিয়া যাইতেছে। এইরূপ চলিতে থাকিলে একসময় দেশে আবাদযোগ্য কৃষিজমি বলিতে আর কিছু অবশিষ্ট থাকিবে না। অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, নগরায়ণ, বনভূমি ও জলাশয় তৈরি এবং আবাসনই ইহার মূল কারণ। দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাইতেছে, মানুষের মধ্যে শহরমুখিতা বাড়িতেছে, নগর বিস্তৃত হইয়া লোকালয়কে গ্রাস করিতেছে। সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই সমস্ত প্রবণতা বাড়িবে তাহা বলাই বাহুল্য। তবে নজর রাখিতে হইবে, একদিকে যেমন শিল্পায়ন প্রয়োজন অন্যদিকে তেমনি দেশের বনাঞ্চল, জলাভূমি, হাওর, বিল, পাহাড়ের মতো সংবেদনশীল এলাকা সংরক্ষণও দরকার। ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য টেকসই উন্নয়নের কথা বিবেচনা করিয়া সারাদেশের ভূমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করিতে পরিকল্পিত উন্নয়নের কোনো বিকল্প নাই। পরিকল্পিত নগর ও গ্রাম উন্নয়নকে সঠিক নীতি ও আইনি কাঠামোর আওতায় আনা প্রয়োজন। এই লক্ষ্যে প্রণীত খসড়া ‘নগর উন্নয়ন নীতি’ ও ‘নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা আইন’ চূড়ান্ত অনুমোদন প্রয়োজন। দেশের প্রবহমান উন্নয়ন মহাপরিকল্পনায় ভূমির ব্যবহার পরিকল্পনার মাধ্যমে শৃঙ্খলিত করা দরকার। এইজন্য নগর-শহরে ভৌত পরিকল্পনা অনুযায়ী উন্নয়ন ব্যবস্থা গড়িয়া তুলিতে হইবে। গ্রামাঞ্চলে যেহেতু দ্রুত নগরায়ণের ছোঁয়া লাগিতেছে, সেই হেতু গ্রাম ও উপজেলার সুষ্ঠু ভূমি ব্যবহারের জন্য উপজেলা পর্যায়ে ‘পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগ’ তৈরি করা জরুরি হইয়া পড়িয়াছে।
বাংলাদেশে নগরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অনেক বেশি। বর্তমানে দেশের ৩০ শতাংশ মানুষ নগরে বসবাস করিয়া থাকে। এই হার ক্রমাগত বৃদ্ধি পাইতেছে। এক হিসাবে ২০৪০ সালের মধ্যে দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা নগরে বাস করিবে। ফলে আমরা বুঝিতে পারিতেছি নগরায়ণের এই প্রক্রিয়া কতটা অপ্রতিরোধ্য। ইহার ফলে যে প্রবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি সাধিত হইতেছে সেখানে থাকিয়া যাইতেছে বৈষম্য। বাংলাদেশে আয় বৈষম্য ক্রমেই বৃদ্ধি পাইতেছে। এই আয় বৈষম্য লাঘব ও উন্নয়ন বিকেন্দ্রীকরণে মনোযোগ দিতে হইবে, না হইলে উন্নয়ন টেকসই হইবে না। পাশাপাশি বিপুল জনসংখ্যার এই দেশে কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন খুবই জরুরি। আর এই অর্জন ধরিয়া রাখিতে একদিকে যেমন উন্নত কৃষিপ্রযুক্তির ব্যবহার লাগিবে, তেমনি দেশের কৃষিজমির সংরক্ষণ করিতে হইবে। গ্রামে নাগরিক সুবিধার প্রসার ঘটাইতে হইবে কিন্তু গ্রাম ও কৃষির বিলুপ্তি ঘটাইলে চলিবে না।
