‘লটারি’ ও ‘আর্ট’ দুই উত্সবের সেতু

আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৮:২৯

মা হ বু ব  আ ল ম

 

ঢাকার বিভিন্ন মঞ্চে একের পর এক উত্সব লেগেই আছে। উত্সব শেষে উত্সবের শুরু—ব্যাপারটা বেশ আনন্দদায়ক নাট্যকর্মী, শিল্পী ও দর্শকদের জন্য। বছরের শেষ দুই মাসে চলছে লাগাতার উত্সব। গত ৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার মূল মঞ্চে সম্পন্ন হলো নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় আয়োজিত ‘নবীনের নাট্যোত্সব’। এই উত্সবের বিশেষত্ব ছিল—নতুনত্ব ছিল। এতে পাঁচজন নতুন নাট্য নির্দেশককে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছিল নাট্য নির্মাণের জন্য। আর নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের পক্ষে নির্মিত হয়েছে দুটি প্রদর্শনী। উত্সবের শেষ দিনে ছিল তাদের বিশেষ চমক। চমক বলছি এই কারণে যে, সেই প্রদর্শনীটি ছিল বিশেষ মানুষদের নিয়ে। নাট্য নির্দেশক মোস্তাফিজ শাহিন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ছেলেমেয়েদের নিয়ে নাটকটির কাজ করেছেন।

তার প্রযোজনাটির নাম ছিল ‘লটারি’। লটারি কারো কারো ভাগ্য বদলে দেয়। আবার কারো কারো জন্য বয়ে আনে বেদনা। মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ মাহবুব সাহেব। তিনি নিজের ভাগ্যবদলের জন্য ১০ টাকা দিয়ে একটি লটারির টিকিট কেনেন। আর ভাগ্যক্রমে লটারির প্রথম পুরস্কার ১ কোটি টাকা পেয়েও যান। এই আনন্দে আটখানা মাহবুব সাহবে ও তার স্ত্রী। এরই মধ্যে ঘটে ভিন্ন ঘটনা। কিডন্যাপাররা তাদের একমাত্র অন্ধ ছেলেকে তুলে নিয়ে যায়। মুক্তিপণ দাবি করে। যদিও তারা ভুল করে মাহবুব সাহেবের ছেলেকে কিডন্যাপ করেছে। পরে অবশ্য ছেড়েও দিতে চায়। কিন্তু এরই মধ্যে লটারি পাওয়া এবং ছেলেটির নিখোঁজ হওয়ার খবর মিডিয়া বেশ রসিয়ে রসিয়ে প্রচার করলে টনক নড়ে কিডন্যাপারদের। কান্নায় ভেঙে পড়ে মাহবুব সাহেবের স্ত্রী। যেকোনো মূল্যে তার ছেলেকে তিনি ফেরত চান। কিডন্যাপাররা এক সপ্তাহ সময় বেঁধে দেয়। এই এক সপ্তাহের মধ্যে মাহবুব সাহেব লটারির টাকার জন্য গিয়ে ফেরত আসে। যে ঠিকানা সেখানে দেওয়া ছিল, সেটি ভুয়া। একসময় অন্ধ ছেলেটি নিজের বুদ্ধিমত্তার জোরেই বেঁচে ফিরে আসে। এভাবেই বর্তমান মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষগুলো যেভাবে সমাজের নানা স্তরে ঠকছে তার চিত্র, সংবাদ মাধ্যমের হালহকিকত; সর্বোপরি সমাজের নানা অসংগতি উঠে আসে এই নাটকে। তবে এ নাটকের বিশেষত্ব অন্যখানে। আগেই বলেছি, এই নাটকের অভিনেতা সকলেই অন্ধ। এই ঘোষণা নাট্য নির্দেশকের। তবে নাটকে তাদের অভিনয় দেখে মনে হয়েছে আগে থেকে এমন ঘোষণা না থাকাই ভালো। কেননা অনেকেরই ধারণা, এই ধরনের বিশেষ মানুষদের নিয়ে কেউ শিল্প করে না, শুধু ব্যবসা করে। সেই চিন্তা থেকে হয়তো অনেক দর্শক নাটকই দেখতে আসেনি। তবে নাটকে তাদের অভিনয় নাট্যদর্শককে বেশ মুগ্ধ করেছে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। আর দর্শকরা ‘লটারি’ নাটকটি কোনো রকম ‘পূর্বধারণা’ না নিয়েই এর পরবর্তী যেকোনো প্রদর্শনী দেখে নিতে পারেন। তবে এমন নাটকের প্রদর্শনী নিয়মিত চালিয়ে যাওয়া বেশ কষ্টকর, বিশেষত অর্থের দিক থেকে। এ ক্ষেত্রে সরকারি সহায়তা নাটকটির প্রদর্শনী নিয়মিত করতে সহায়ক হবে বলেই মনে হয়।

এবার প্রাঙ্গণেমোর নাট্যদলের আয়োজনের কথা বলি। ৫ ডিসেম্বর রাতে নাগরিকের নাট্যোত্সব শেষ হতে না হতেই পাল্টে যায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির বহিরাঙ্গন এবং মূল গেটের চিত্র। রাতারাতি পাল্টে যেতে থাকে উত্সবের রং-রূপ। ৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় প্রাঙ্গণেমোরের আয়োজনের শুরু। আর শুরুর দিনেই তাদের উত্সবে প্রদর্শিত হয় কলকাতা প্রাক্সিস প্রযোজিত নাটক ‘আর্ট’। তিন বন্ধুর মনস্তাত্ত্বিক ভাবনার নাটক এটি। বিদেশি নাটকের রূপান্তর করেছেন নির্দেশক গৌতম সরকার ও ঈপ্সিতা দেবনাথ। সেই সঙ্গে নির্দেশক নাটকে অভিনয়ও করেছেন বটে। চমত্কার অভিনয় সমৃদ্ধ নাটক ‘আর্ট’। ধনী হয়ে যাওয়া যে কাছের বন্ধুদের সহ্য হয় না অথবা সদ্য ধনীর কাতারে উঠে আসা লোকেদের চাল-চরিত কেমন হয়, তা-ই মূলত এই গল্পের মূল ভাবনা। তবে প্রতিটি মানুষই যে একটি নির্দিষ্ট বিষয়কে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে। এটা যে মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি সেই গল্পটাও পরিষ্কার। এই নাটকটি যে কারণে বিশেষ মনে হয়েছে, তা হলো এর উপস্থাপনা ও অভিনয়। একেবারেই অভিনয়নির্ভর নাটক বলতে যা বোঝায় তা হলো কলকাতা মাক্সিস-এর ‘আর্ট’। মাত্র তিনজন অভিনেতার মনোমুগ্ধকর অভিনয় নজর আটকে রাখে দর্শকের। কোথায় কোনো মিউজিক নেই। নেই আলো ব্যবহারের বাহার, এমনকি সেটের ক্ষেত্রেও তেমন কোনো বাহুল্য দেখাননি নির্দেশক। শুধু অভিনেতাদের অভিনয় দক্ষতার উপরে নির্ভর করেছেন এবং বলা যায় সফলও হয়েছেন। ‘আর্ট’ নাটকটি দর্শক নিশ্চয়ই দীর্ঘদিন মনে রাখবে শুধু অভিনয় সাবলীলতার কারণে।

ছবি হামজা আনোয়ার