মুক্তিযুদ্ধের ১০ চলচ্চিত্র

আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৮:৩০

 

মহান মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির কাছে এক মহাকাব্য। আর এই মহাকাব্য রচিত হয়েছে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে। মহান মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা সৃষ্টিশীল মাধ্যমে প্রভাব ফেলবে—এটাই স্বাভাবিক। সেই অমর, অক্ষয় ও চির দুর্জয় ধ্রুবতারাদের কথা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে জানতে নির্মিত হয়েছে বেশকিছু চলচ্চিত্র। যদিওবা নানা কারণে সেই সংখ্যা নেহাতেই কম। তবু্ও দর্শকপ্রিয়তা, বাণিজ্যিক সাফল্য আর প্রচার—এই তিন দৃষ্টিকোণ থেকে বাছাইকৃত মুক্তিযুদ্ধের ১০টি চলচ্চিত্র নিয়ে আমাদের বিশেষ আয়োজন।

জীবন থেকে নেয়া (১৯৭০)

পরিচালক :জহির রায়হান

মুক্তিযুদ্ধের আগে মুক্তি পেয়েও এ ছবিকে মুক্তিযুদ্ধের ছবির তালিকায় রাখতে হয় প্রথমেই। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে নির্মিত হয়েছিল ‘জীবন থেকে নেয়া’। একটি পরিবারের গল্পকে প্রতীকী অর্থে ব্যবহার করে রাষ্ট্রযন্ত্রের হিংস্র চেহারাটা তুলে ধরেছিলেন জহির রায়হান। তত্কালীন সরকারের রোষানলেও পড়তে হয়েছিল ছবি ও ছবির পরিচালককে। অসাধারণ নির্মাণশৈলীর কারণে দর্শক-সমালোচকদের কাছে যেমন ছবিটি প্রশংসা পায়, তেমনি দর্শকদের আবেগকেও এ ছবি আমূল নাড়া দিতে সক্ষম হয়।

ওরা ১১ জন (১৯৭২)

পরিচালক :চাষী নজরুল ইসলাম

মুক্তিযুদ্ধের পর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রথম ছবি। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশের চলচ্চিত্র পাগল একঝাঁক তরুণের মুক্তিযুদ্ধকে দেখার অভিজ্ঞতা ফুটে উঠেছে এ ছবিতে। শিল্পী হিসেবে ছবিতে অভিনয় করেছেন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা। ছবিটি পুঁজির কয়েকগুণ ফেরত দিতে সক্ষম হয় প্রযোজক মাসুদ পারভেজকে। সমালোচকদের কাছে নেতিবাচক দিক হিসেবে ধরা দেয় নির্মাণভঙ্গিতে আবেগের আতিশয্য।

আলোর মিছিল (১৯৭৩)

পরিচালক :নারায়ণ ঘোষ মিতা

মুক্তিযুদ্ধের পরপরই কিছু মানুষ লোভে পড়ে নীতি-নৈতিকতা ভুলে দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হয়। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠনের বদলে স্বার্থসিদ্ধিতে লিপ্ত হয়। নিজেদের স্বজনদের এমন কর্মকাণ্ডে লজ্জিত মুক্তিযুদ্ধ ফেরত তারুণ্য কীভাবে প্রতিরোধ করে, তারই চিত্ররূপ ‘আলোর মিছিল’। রাজ্জাক, সুজাতা, ফারুক, খলিলসহ নামি-দামি তারকারা এ ছবিতে অভিনয় করেন।

আবার তোরা মানুষ হ (১৯৭৩)

পরিচালক :খান আতাউর রহমান

যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশের দুর্বল অর্থনীতি তরুণদের হতাশার অন্ধকারে ঠেলে দেয়। বিপথগামী হতে শুরু করে তরুণরা। তাদের মানবিকতার পথে আনতে খান আতার করুণ আবেদন—‘আবার তোরা মানুষ হ’। তারুণ্যের বেদনাকে এ ছবিতে দারুণভাবে ধরতে পেরেছিলেন পরিচালক। অভিনেতা-অভিনেত্রীদের আবেগঘন অভিনয়, খান আতার নিজস্ব পরিচালনা কৌশল ছবিটিকে দর্শকদের খুব কাছাকাছি নিয়ে যায়।

সংগ্রাম (১৯৭৪)

পরিচালক :চাষী নজরুল ইসলাম

আবারও চাষী নজরুলের ছবির বিষয়বস্তু হয়ে আসে মুক্তিযুদ্ধ। সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশারফের ডায়েরি অবলম্বনে এ ছবিটি নির্মাণ করেন পরিচালক। ছবিটি সমালোচকদের উচ্চ প্রশংসা বলতে যা বোঝায়, তা না পেলেও বাণিজ্যিকভাবে সাফল্য লাভ করে। দীর্ঘ সময় মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি নির্মাণ থেকে দূরে সরে থাকলেও নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি থেকে আবারও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি নির্মাণ করতে থাকেন চাষী নজরুল ইসলাম। এখন পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিক সংখ্যক ছবি নির্মাণ করেছেন তিনি।

আগুনের পরশমণি (১৯৯৪)

পরিচালক :হুমায়ূন আহমেদ

কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের প্রথম পরিচালনা। প্রথম ছবিতেই তিনি বেছে নিলেন নিজের জনপ্রিয় একটি উপন্যাস। এ ছবিতে উঠে এসেছে একাত্তরে অবরুদ্ধ একটি পরিবারের গল্প। গল্প সাধারণ হলেও পরিবারটির মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে অনুভব করা যায়। স্পষ্ট হয়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মধ্যবিত্তদের মানসিকতা। জনপ্রিয় নাট্যকার হুমায়ূন আহমেদ তার ছবিতে অভিনয়শিল্পী হিসেবে বেছে নেন এ মাধ্যমেরই জনপ্রিয় শিল্পীদের।

কমান্ডার (১৯৯৪)

পরিচালক :শহীদুল ইসলাম খোকন

শুরু থেকেই মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবির নির্মাতারা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যান। এক পক্ষ মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মুনাফা লাভের আশায় ছবি নির্মাণ করেন। আরেক পক্ষের উদ্দেশ্য সেলুলয়েডের মাধ্যমে দেশের প্রতি নিজের দায় মেটানো। বাণিজ্যিক ছবির নির্মাতারা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ছবি নির্মাণ করলেও সবাই সাফল্যের মুখ দেখতে পারেননি। ‘কমান্ডার’-এ ধারা থেকে ব্যতিক্রম। মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত বাণিজ্যিক ছবিগুলোর মধ্যে এ ছবির বক্স অফিস সাফল্য সর্বাধিক।

সিপাহী (১৯৯৪)

পরিচালক :কাজী হায়াত্

ঘুরে ফিরেই কাজী হায়াত্-এর ছবিতে এসেছে মুক্তিযুদ্ধ। তবে সরাসরি নয়, পরোক্ষভাবে। বক্তব্যধর্মী ছবির নির্মাতা হিসেবে পরিচিত কাজী হায়াত্ রাজনৈতিক অনাচারের চিত্র তুলে ধরেছেন বেশিরভাগ ছবিতে। ‘সিপাহী’ও এ ধারারই ছবি। মুক্তিযুদ্ধ এ ছবির পটভূমি। অভিনয়শিল্পীরা প্রত্যেকেই চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় তারকা—ইলিয়াস কাঞ্চন, মান্না, চম্পা প্রমুখ। যুদ্ধ পরবর্তী দেশের তরুণদের দুরবস্থা এ ছবির বিষয়বস্তু।

মাটির ময়না (২০০২)

পরিচালক :তারেক মাসুদ

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বহুল প্রশংসিত একটি ছবি। কান-এর মতো চলচ্চিত্র উত্সবে মর্যাদাজনক পুরস্কার জিতেছেন তারেক মাসুদ। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত হলেও মাদ্রাসা শিক্ষা, ধর্মানুভূতি-ধর্মান্ধতা ইত্যাদি বিষয় উঠে আসায় একুশ শতকেও ছবিটি অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। চলচ্চিত্রের নান্দনিক মান বিচারে এ ছবি দেশীয় চলচ্চিত্রের প্রকৃত অবস্থার প্রতিনিধি নয়, বরং অনেক অগ্রসর। দেশ-বিদেশে পুরস্কার-সম্মাননা অর্জন ছবিটিকে দর্শকদের কাছে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে।

গেরিলা (২০১১)

পরিচালক :নাসির উদ্দীন ইউসুফ

বীর মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দীন ইউসুফ পরিচালিত ‘গেরিলা’ চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায় ২০১১ সালে। এ ছবিতে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরা হয়। সৈয়দ শামসুল হকের ‘নিষিদ্ধ লোবান’ উপন্যাস এবং মুক্তিযুদ্ধে পরিচালকের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নিয়ে ছবিটি নির্মিত। ছবিতে দর্শকেরা মুক্তিযুদ্ধ ও চলচ্চিত্র নিয়ে পরিচালকের ভাবনার জায়গাটা পরিষ্কার বুঝতে পেরেছেন। ছবিতে অভিনয় করেছেন জয়া আহসান, শতাব্দী ওয়াদুদ, এটিএম শামসুজ্জামান, ফেরদৌস, পীযূষ বন্দোপাধ্যায় প্রমুখ।