সেদিন বিকেলবেলা বাড়ির পাশের মুদি দোকানে বসে গল্প করছিলাম। মুদি দোকানি আজিজ মামা আর আমরা চার বন্ধু—মতিউর, ডালিম রায়, মুয়াজ।
আমাদের আড্ডা চলছে—এমন সময় এসে হাজির হলেন এনাম চাচা। পুরো নাম শফিকুল হক এনাম হলেও এনাম নামেই পরিচিত সবার কাছে। এলাকাজুড়ে এনাম চাচার অন্য একটা পরিচয় আছে, তিনি একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন।
চাচা আমাদের পাশে বসলেন। আমরা তখন চাচার সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলাম। চাচার কাছে জানতে চাইলাম—
—আচ্ছা চাচা, আপনি তো সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। তখনকার কোনো ঘটনা যদি বলতেন।
—নিশ্চয়ই বলব ভাতিজা।
চাচা তখন বলতে শুরু করলেন—
পাকিস্তানি বাহিনী যখন আমাদের নিরীহ বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছিল ’৭১ সালের পঁচিশে মার্চের কালরাত্রিতে, তখনই স্বাধীনতার ডাক পড়ে গেল। সবাই যে যার মতো করে মুক্তিযুদ্ধে শরিক হলো। আমি তখন ক্লাস এইটে পড়ি, দেখতে খুব একটা বড়ো না হলেও তখনকার পরিস্থিতি পুরোপুরিভাবে বুঝতে পারতাম। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর স্কুল-কলেজসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। আমার সাথে যারা পড়ত তাদের অনেকেই মুক্তিযোদ্ধার খাতায় নাম লেখায়। কিন্তু আমাকে পরিবার থেকে যেতে দেওয়া হচ্ছে না ছোট বলে। আমার আর ঘরে বসে থাকতে ভালো লাগছিল না। লোকমুখে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নানা কথাবার্তা শুনে আমি সুযোগ খুঁজছিলাম কীভাবে যাব।
কিছুদিন পর আমার এক বন্ধুর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে আসি। ক্যাম্পের প্রধান আমাদের দুজনকে নিয়ে বসলেন এবং কিছু কাজ বলে দিলেন। এর মধ্যে ছিল—নিয়মিত রেডিওতে খবর শোনা, তবে এ কাজ করতে হবে একদম আড়ালে। তারপর নিজেদের ক্যাম্পে সতর্ক অবস্থায় থাকা, ছদ্মবেশে পাকিস্তানি হানাদারদের ক্যাম্পে চোখ রাখা এবং তাদের চলাফেরার দিকে খেয়াল রাখা। আমরা আমাদের ওপর দেওয়া দায়িত্ব পালন করে যেতে লাগলাম। পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে ঘুরে দেখে আসতাম মাঝে মধ্যে। আমি দেখতে ছোট বলে ওদের চোখে পড়তাম না।
কিছুদিন পর আবার পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে যাই, দূর থেকে ওদের আলাপ পুরোপুরিভাবে শোনা যাচ্ছিল না। আমি আরেকটু কাছে গিয়ে আড়ি পাতলাম। আলাপের একপর্যায়ে শুনতে পেলাম, ওদের একজন বলছে আগামীকাল তো সুনাপুর ক্যাম্পে আমাদের অপারেশন। সুনাপুর বলতে যে ক্যাম্পটায় আমি এবং আমাদের মুক্তিসেনারা অস্থায়ীভাবে বাস করছি। সুনাপুর অপারেশন করতে আসছে শুনে আমার হাত-পা কাঁপতে শুরু করল। নিজেকে সামলে নিয়ে তাড়াতাড়ি সেখান থেকে চলে আসি। আমাদের ক্যাম্পপ্রধানের কাছে খবরটা পৌঁছে দেই। উনি সবার সাথে আলাপ করে সিদ্ধান্ত নেন—কীভাবে ওদের অপারেশন প্রতিহত করা যায়। সবার সিদ্ধান্তক্রমে আমরা নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান নিই।
রাত তিনটা। চারদিক নিস্তব্ধ। দূর থেকে ভেসে আসছে ঝিঁঝিপোকার ডাক। হঠাত্ করেই গুলির শব্দ! বুঝতে আর বাকি থাকল না যে ওরা এসে গেছে। আমরা আমাদের অবস্থান থেকে কৌশলে ওদের দেখার চেষ্টা করছি। তখনো আমাদের থেকে কোনো পাল্টা আক্রমণ না পেয়ে বেশ খুশি হয় পাকিস্তানি সেনারা। ক্যাম্পের একদম কাছে এসে আক্রমণ চালাতে থাকে, তবুও কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। আস্তে আস্তে ওদের গুলির আওয়াজ কমতে থাকে। আমরা তাদের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করে এগিয়ে আসি। যখন আর কোনো আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল না—ঠিক তখনই শুরু হয় আমাদের পক্ষ থেকে পাকিস্তানি সেনাদের লক্ষ করে আক্রমণ শুরু করি। আকস্মিক আক্রমণে ওরা দিগিবদিক ছোটাছুটি করতে থাকে। পেছন দিক থেকে আমাদের আক্রমণে ওরা একেবারে নাজেহাল হয়ে পড়ে। কিছু সময়ের মধ্যে পাকিস্তানি সেনাদের সবগুলোকে শেষ করে দিতে সক্ষম হই আমরা। সেদিন প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন পাকিস্তানি সেনা আমাদের হাতে নিহত হয়। সেদিনের কৌশলী যুদ্ধ আজও আমার মনে পড়ে, তখন গর্বে বুকটা ভরে ওঠে।
