সময়ের হিসেবে আটাশি বছরের এক সংগ্রামমুখর জীবনের নাম অজয় রায়। যিনি ছিলেন ‘মিছিলের সমান বয়সী’ ও শোষণ-বঞ্চনা থেকে চিরমুক্তির প্রতিনিধি। তাঁর জন্মের পর আঁতুড়ঘরেও বিপ্লবের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছিল কি-না জানা নেই। কিন্তু পুরো জীবনই তাঁর কেটেছে সংগ্রামে-প্রতিবাদে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকে। যাঁর জীবনের সঙ্গে নেলসন ম্যান্ডেলার জীবনের আছে অনেকটাই মিল! নির্বাসনের দণ্ডই যাঁর জীবন থেকে ছিনিয়ে নেয় ২৭ বছর। আর কমরেড অজয় রায়ের জেলের ভেতর ১৫টি বসন্তই ঝরে গেছে। আর আত্মগোপনে আরো ৫ বছরের বেশি। কিংবদন্তি আছে, জেলে বসেই তিনি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। আবার জেলে বসেই শেষ করেন এক-দুটি উপন্যাস লেখার কাজ। এই জেলজীবনের ভেতরও আটকে থাকেনি তাঁর যাবতীয় কর্মকাণ্ড। জেলজীবনই একটা অনিবার্য অংশ হয়ে উঠেছিল অজয় রায়ের বেলায়। কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে আমাদের কাজী নজরুল ইসলাম ও তুরস্কের কবি নাজিম হিকমতের বেলাতেও যেমনটি অনিবার্য অংশ হয়ে উঠেছিল জেল। বিপ্লব যেন জেলের ভেতরও শুরু হয়ে গিয়েছিল কখন! জেলে অজয় রায়ের অনশনেরও আলাদা দিনলিপি লেখা থাকতে পারত। সেটা ছিল একটানা সাতদিন, কুড়িদিন, আর তৃতীয়বার চল্লিশ দিনের মতো অনশনে থাকার ঘোষণাও দিয়েছিলেন! শুরু থেকে পারিবারিক একটি প্লাটফর্ম তাঁকে চেতনার বীজতলা গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। করেছে মানবিক দৃষ্টিসম্পন্ন। বাবা ড. প্রমথনাথ রায় ছিলেন বানারসী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক। মা কল্যাণী রায়। তিনি ছিলেন স্বদেশী আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী। পিছু না হটা এক লড়াকু নারী। যার চোখে-মুখেও ছিল প্রতিবাদের তেজ! বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও সমাজসেবী গৌরী আইয়ূব মা-র খুড়তুতো বোন।
মা-র কাছ থেকে স্বদেশপ্রেমের শিক্ষা তিনি পেয়েছিলেন শৈশবেই। সেইসঙ্গে পেয়েছেন স্বৈরাচার, শোষকশ্রেণির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রবল ইস্পাত-কঠিন মনোবল। যা তাঁকে মনে-প্রাণে এই রাজপথের দিকে টেনে এনেছে। সাম্যের গান গাইতে করেছে উদ্বুদ্ধ। ঘর বাহির হয়েছে, বাহির ঘর হয়েছে তাঁর বেলায়। রাজপথেই তিনি পেতেছিলেন এক অসাম্প্রদায়িক সংসার। শ্রেণিবৈষম্যের শিকার, বর্ণবাদের শিকার এরকম অসংখ্য সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে নিয়েই তাঁর সংসার। প্রতিদিন অনেক নির্যাতিত মুখের সামিলে এই সংসার আরো বড় হয়ে যেত। এই সংসারে তিনি পালন করেছেন অভিভাবকের দায়িত্ব। ১৯৪৩ সালে মেট্রিকুলেশন। ইন্টারমিডিয়েট শেষ করে ফার্মেসি নিয়ে পড়াকালীন এক বছরের ব্যবধানে মা-বাবা দুজনই মৃত্যুবরণ করেন। তখন শুরু হয় আরেক জীবন। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় হওয়াতে দায়িত্বও তাঁর কাঁধে এসে চাপে। সবাইকে নিয়ে কিশোরগঞ্জের বনগ্রামে চলে আসেন। এখানেই কমরেড অজয় রায়ের জন্ম ৩০ ডিসেম্বর, ১৯২৮ সালে। রায় পরিবারের স্থায়ী নিবাস এই বনগ্রাম। প্রকৃতির কোলঘেঁষে থাকা এক শান্ত গ্রাম। পাখি শিস বাজিয়ে যায়! ঝিরিঝিরি হাওয়া বয়। বনগ্রামে তখন থাকেন ঠাকুরদা যদুনাথ রায়। কিন্তু জন্ম কিশোরগঞ্জে হলেও কমরেড অজয় রায়ের শৈশব কেটেছে ভারতের বারানসীতে। বাবা প্রমথনাথের ‘বিদেশি ভাষা’-র অধ্যাপনাসূত্রে। তাঁর বিপ্লবী-রাজনীতির সঙ্গে হাতেখড়িও এই বারানসীতেই। স্কুলে থাকতেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। যে স্কুলে তিনি পড়তেন, সেটা ছিল কমিউনিস্টদের দ্বারা প্রভাবিত। ক্লাস সেভেনে পড়াকালীনই তিনি ছাত্র ফেডারেশন বারানসীর কমিউনিস্ট নেতাদের সংস্পর্শে আসেন। স্বদেশমন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে দীক্ষাগ্রহণ করেন তখনই। ১৯৪১ সালে জার্মানি সোভেয়েতের ওপর হামলে পড়ে। ভেঙে যায় সোভিয়েত ইউনিয়ন। দ্রুত বিশ্ব-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রেশ ছড়িয়ে পড়ে সারাবিশ্বে। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক দুই দিক থেকেই এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ফলও বহুদূর পর্যন্ত গড়াল। পৃথিবীব্যাপী গড়ে ওঠা মার্কসবাদী ও লেলিনবাদী পার্টিগুলোতে সৃষ্টি হলো অভূতপূর্ব আলোড়ন। কমিউনিস্ট পার্টিগুলোও ভেঙে ভেঙে যার যার মতো করে নতুন দল গঠনে মনোযোগী হলো। তৈরি হলো নতুন নতুন কর্মসূচি। সোভিয়েত ইউনিয়নের এই পরাজয়ে কমরেড অজয় রায়ের স্বপ্নভঙ্গ হলো। তিনি কিছুতেই এই পরাজয় মেনে নিতে পারলেন না। কিন্তু তাঁর সারাজীবনের শ্রমে-ঘামে-রক্তে গড়া দলটিও তখন ভাঙনের মুখে। ভাবাদর্শকে ঠিক রেখে তিনি আরেকটি সংগঠন গঠন করলেন। নাম দিলেন ‘কমিউনিস্ট কেন্দ্র’। এই সংগঠনটি তাঁর অনুসারীদের নিয়েই গড়ে তুললেন। শুধু অনুসারী বললে ভুল হবে, যাঁরা তাঁর এই রাজনৈতিক আদর্শকে সমাজ গঠনের আদর্শ বলে ভেবেছেন তাঁদেরকেই তিনি নতুন সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর—একটার পর একটা পৃথিবীর দৃশ্যপট বদলাতে লাগল। তার রেশ ধরেই ১৯৪২ সালে কংগ্রেসের ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের সূচনা। সারা ভারতজুড়ে এর ফলে সৃষ্টি হয় বিশাল গণ-অভ্যুত্থান। অজয় রায়ের অবস্থান তখন ভ্রাম্যমাণ। এই যখন ঘটনা—তখনো তাঁর আদর্শিক অবস্থানে তিনি ছিলেন অটল। নিজের স্কুলের বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে পুরোপুরি যুক্ত রেখেছিলেন নিজেকে। ১৯৪৩ সালে সারা বাংলায় দেখা দিলো মন্বন্তর। চারদিকে হাহাকার। মানুষের দু’মুঠো অন্নের জন্য হাপিত্যেশ। মা ক্ষুধার্ত শিশুকে স্তন্যপান করাতে পারছেন না। সেই অবস্থায় কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ফেডারেশনের সাথে সক্রিয় থেকে অনাহারীদের ত্রাণ বিতরণের মধ্যে দিয়ে তিনি এক উদার মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। ‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান’ কবিতার এই পঙিতর শব্দগুচ্ছ বইয়ের ভেতর না থেকে, তা জীবন্ত হয়েই ধরা দিলো। তার যথার্থ মানেও দাঁড়াল তখন। তখন সেটা দেশভাগেরও আগের ঘটনা। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হলো সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে। পূর্ববাংলার উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত নির্বেশেষে অসংখ্য হিন্দু নিজের দেশ ত্যাগ করে ভারতে চলে গেলেন। কিন্তু নিজের ভেতরে দেশের জন্য এক গভীর মমতার কারণে তিনি কোথাও গেলেন না। ঠিকই তো, সবাই চলে গেলে এই বিধ্বস্ত দেশকে দেখে রাখবে কে? এই হতদ্যোম দেশে, ভেঙে পড়া দেশে সাহস জোগাবে কে? স্বদেশের সোঁদা-মাটির গন্ধই তাঁকে টেনে রেখেছে। আর তাঁর বৈপ্লবিক চিন্তার কাছেও তিনি দায়বদ্ধ। ১৯৪৮ সালে কমিউনিস্ট পার্টি সশস্ত্র সংগ্রামের সিদ্ধান্ত নিল। স্লোগান কণ্ঠে তুলে নিলেন কমরেড অজয়। সেই স্লোগানের ভিত্তিতে ছাত্র সম্মেলন করার মুহূর্তে তিনি প্রথমবারের মতো গ্রেফতার হলেন। কিন্তু যাঁর জীবন জনগণের জন্য উত্সর্গীত—তাঁকে কোনো জেলই অগ্নিময় পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারে না। টলাতে পারে না এতটুকু। এক বছরের জেলবাস শেষে স্বাস্থ্যগত কারণে তিনি ছাড়া পান। সেটা ১৯৪৯ সাল। তখন মুন্সিগঞ্জের চাপাতলী স্কুলে তিনি প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছেন।
কিন্তু এক বছরের মাথায়ই ১৯৫০ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিভীষিকায় লক্ষ লক্ষ হিন্দু দেশত্যাগ করা শুরু করল। যেন মৌচাকে কেউ আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। দিগ্ভ্রান্ত মৌমাছির মতো মানুষ ছুটতে লাগল এতটুকু আশ্রয়ের সন্ধানে। নিরাপত্তা-ছাউনির খোঁজে! মুন্সিগঞ্জের স্কুলটিতে ছাত্রসংখ্যা কমতে কমতে একপর্যায়ে তা বন্ধই হয়ে গেল। এ অবস্থায় রামপাল হাইস্কুলে শিক্ষকতার কাজ নিলেন তিনি। কিন্তু শিক্ষকতা চলাকালেও চালিয়ে যেতে লাগলেন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের আগে আগে ময়মনসিংহ কমিউনিস্ট পার্টির সেক্রেটারি হিসেবে গুরুদায়িত্ব পান তিনি। এই দায়িত্ব থাকাকালীন তিনি ময়মনসিংহকে নতুন করে ঢেলে সাজাতে সমাজসেবকের মতো কাজ করেছেন। মানুষের চেতনার উন্মেষের পক্ষে জোর দিয়েছেন। নিজের অধিকার কীভাবে আদায় করে নিতে হয়—জোর দিয়েছেন সে জায়গাটিতেও। ওখানে থাকতে আত্মগোপনেও তাঁকে থাকতে হয়েছে বহুবার! আর সেই সময় কিশোরগঞ্জ ও টাঙ্গাইল কমিউনিস্ট পার্টিকে পুনর্গঠিত করারও উদ্যোগ নেন। একদিকে পুলিশের হস্তক্ষেপ অন্যদিকে দেশ-মাতৃকার সেবক হিসেবে কাজ চালিয়ে যাওয়া—এই সবকিছু ঠিক রেখে তিনি পরম ধৈর্যের সঙ্গে তাঁর ওপর অর্পিত কাজগুলো করে যেতেন। ১৯৫৭ সালে ন্যাপে যোগ দিলেন কমরেড অজয় রায়, অবশ্য তা পার্টির সিদ্ধান্তেই। ময়মনসিংহ জেলা ন্যাপের সহ-সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিতও হলেন। ন্যাপ তখন সদ্যপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তার বিস্তার-প্রচারণার কাজে কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, জামালপুরের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন জারি হলো। আবার আত্মগোপন। সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে জনগণকে সংগঠিত করতে গিয়ে আবার গ্রেফতার হলেন এই বীর লড়াকু যোদ্ধা। এরপর মুক্তি মেলে ১৯৬৫-এর জুুলাইয়ে। ১৯৬৫ সালে আবার শুরু হওয়া পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের দামামা বেজে উঠল। জেল থেকে ছাড়া পেয়েই এক অস্থির-পরিস্থিতির সম্মুখীন হলেন। মানুষের মধ্যে আবার শুরু হলো অস্তিত্ব-সংকট। আকাশে-বাতাসে বারুদের পোড়া গন্ধ। রক্তের গন্ধ। মানুষের অশ্রু নদীতে মিশে গেল। বাঁচার দাবিতে মানুষ হন্যে হয়ে ঘুরে মরছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ভুক্ত রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্বদের ধরে ধরে গ্রেফতার করা হচ্ছে। আইয়ুব খানের পর ইয়াহিয়া খানের শামরিক শাসন জারি হলো। তিনি আত্মগোপনে চলে যান আবার। তখন ময়মনসিংহের পার্টি সংগঠনের কাজে নিবেদিত সমাজসেবক তিনি। সংগঠন গুছিয়ে তোলার কাজে ব্যস্ত। ১৯৬৯ সালে তাঁর কপালে আবার গ্রেফতারি পরোয়ানা। তিনি কারা-অন্তরীণ হলেন। কিন্তু ধৃত বাঘের মতো ছটফট করতে লাগলেন। এ যেন সুকান্তের কবিতার ট্রাজিক উচ্চারণ! ‘এদেশে জন্মে পদাঘাতই শুধু পেলাম, অবাক পৃথিবী! সেলাম, তোমাকে সেলাম!’ অনেক ‘পদাঘাত’ সহ্য করে, অমানবিক অত্যাচারের মুখেও তিনি দমে যাননি। এই তাঁর চরিত্রের আরেক গুণ! দেহ যেন এক অদ্ভুত ধাতুতে গড়া। ভাঙবেন কিন্তু মচকাবেন না। তাঁর অসমাপ্ত কাজের জন্য তিনি মরিয়া হয়ে উঠতেন। জেলের সীমানা প্রাচীরের বাইরে এক স্লোগানমুখর, কুসংস্কারের আবিল জড়ানো নিপীড়িত সমাজের পর্দা যেন তাঁকে উন্মোচন করতেই হবে। এই দায় তাঁর। যাপিত জীবনের ভেতর তিনি নিজের স্বার্থ অথবা অর্থনৈতিক চিন্তাকে মনে প্রশ্রয় দেননি। করেননি নিজের সুখ-ভোগ নিয়ে চিন্তা। তাঁর চিন্তার পরিমণ্ডল একটি পিছিয়ে পড়া জাতিকে নিয়ে। প্রীতিলতা, ক্ষুদিরামের মতোই একজন কমরেড যেন গতিশীল রাখতে চেয়েছেন প্রগতির ধারাবাহিক স্রোতটি। নিজে অত্যাচার সইতে পারেন কিন্তু স্রোতের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে তিনি যেন শেষ রক্তবিন্দুটিও বিসর্জন দেবেন! জেলেই ১৯৭১-এর ২৫ মার্চের কালো রাত কেটে গেল। তারপর এল ২৮ মার্চ। সর্বস্তরের জনগণ জেলের তালা ভেঙে এই মুক্তচিন্তককে মুক্ত করে আনলেন। ১৯৭১ সালেই তাঁর বিয়ে হয়ে গেল খুব সাদাসিধেভাবে নারী আন্দোলনের নেত্রী অজন্তী রায়ের সাথে। শুধু ফুলের মালা বদলই ছিল এই বিয়ের আয়োজন! তখন সদ্যসমাপ্ত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ। চারদিকে দেশ গড়ার কাজ শুরু হয়েছে। ভাঙা দেশকে জোড়া লাগাবার চেষ্টা চলছে। মানুষ অনেক হারিয়ে আবার বেঁচে থাকার অবলম্বন খুঁজছে। কমরেড অজয় রায় তাঁর এক লেখাতে বীর শহিদদের শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, যে জাতি নিজের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের সম্মান করতে পারে না, সে জাতি কোনোদিনই সামনের দিকে এগোতে পারে না। সংগ্রামে-আন্দোলনে নিজেকে অব্যাহত রাখার কারণে তাঁর লেখকসত্তা যেন একটু আড়ালেই থেকে গেছে! তিনি অনেকগুলো মননশীল বইও লিখেছেন। যেগুলো জাতির মনোজগত্ গঠনে রাখতে পারে ব্যাপক ভূমিকা। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য—‘বাঙলা ও বাঙালি’, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি’, ‘বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থা’, ‘রাজনীতি কী ও কেন’, ‘বীর কন্যা প্রীতিলতা’, ‘আমাদের জাতীয়তার বিকাশের ধারা’ এবং ‘তীরের অন্বেষায়।’
বাঙলা ও বাঙালি বইটির ভূমিকা লিখেছিলেন শিক্ষাবিদ ও পণ্ডিত ড. আহমদ শরীফ। আহমদ শরীফের ভাষায়, ‘লেখক বাঙালির সুচির কালের সামগ্রিক পরিচয় তুলে ধরতে চেয়েছেন এবং তার প্রয়াস অনেকাংশে সফল ও সার্থক হয়েছে বলেই মনে করি। আমাদের দেশের প্রাচীন ইতিবৃত্ত আজো প্রায় অনুদ্ঘাটিত রয়ে গেছে। এ গ্রন্থেও লেখক অদ্যাবধি আবিষ্কৃতি ও অনুমতি তথ্য-তত্ত্বের স্বাধীন প্রয়োগ রচনা করেছেন। এ গ্রন্থের মাধ্যমে উত্সুক ও জিজ্ঞাসু বাঙালির আত্মদর্শন হবে।’
স্বাধীনতার ২ বছর পর কমরেড অজয় রায় ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ঢাকায় তাঁর আরেক অধ্যায়ের শুরু হলো। নব্বইয়ের স্বৈরাচারপতন আন্দোলন, জঙ্গিবাদ উন্মূলকরণ এবং অসাম্প্রদায়িক এক জাতি-রাষ্ট্র গঠনে তাঁর ভূমিকা সবসময় ছিল অগ্রগণ্য। সমমনা অনেককে নিয়ে বয়সের প্রায় গোধূলিবেলায় নিজের হাতে প্রতিষ্ঠা করলেন ‘সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন’ নামের সংগঠন। সিপিবির ‘একতা’ পত্রিকার সঙ্গেও তাঁর ছিল সম্পৃক্ততা। সমাজসেবায় ব্রতী অজয় রায় রাষ্ট্রের দুঃসময়ে বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগের কাজটিও করে গেছেন নিরলসভাবে। স্বেচ্ছায়। উদ্বিগ্ন থেকেছেন রামু, নাসিরনগরে ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনাগুলো নিয়ে। তিনি ছিলেন লেখক-রাজনীতিক সত্যেন সেন, রণেশ দাশগুপ্ত প্রমুখের সহযাত্রী। এছাড়াও রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উদ্যাপন, পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন, মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রচলন, উদীচী ও ছায়ানটের প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি কাজের সঙ্গে তাঁর জোরালো অংশগ্রহণ তাঁকে অনবদ্য এক মর্যাদার আসনে বসিয়েছে। এই আপাদমস্তক সংগ্রামী ও সারাজীবন মানুষের জন্য কাজ করে যাওয়া মানুষটি মৃত্যুবরণ করেন ২০১৬ সালের ১৭ অক্টোবর।
তাঁর অন্তিম ইচ্ছে অনুযায়ী তাঁকে কিশোরগঞ্জের গ্রামের মাটিতে পোড়ানোর বদলে সমাহিত করা হয়েছে।
অজয় রায়, ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত থাকায় পাকিস্তান সরকারের রোষানলে পড়ে তাঁকে জেলে যেতে হয়। পরে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের নেতৃত্বে ছাত্ররা তাঁকে ময়মনসিংহ কারাগার থেকে বের করে নিয়ে আসে। ছবিটি সে-সময়ে তোলা
