রাস্তার পাশ দিয়ে হাঁটলেই যখন কানে আসে, ‘বাইচ্ছা লন ১০০ টাকা, দেইখ্যা লন ১০০ টাকা’ বা রাস্তার পাশে পিঠা দোকানির চারপাশে মানুষের ভিড় দেখা যাচ্ছে কিংবা ধোঁয়া ওঠা পিঠা খাওয়ার জন্য বা কোথাও আগুন জ্বালিয়ে চারপাশে আড্ডা জমাচ্ছে তরুণেরা, তখন বুঝতে হবে সময়টা শীতের। প্রকৃতিতে এখন লেগেছে শীতের ছোঁয়া। এই শীত আমাদের ঢেকে দিচ্ছে কুয়াশার চাদরে। শীত মানেই উঁচু উঁচু গাছের মাথায় কুয়াশার বিস্তার... শহরের ঢ্যাঙা বাড়িতে সকালের আলোর মলিন মুখ... গাছের পাতার গায়ে হলদে রং। শোনা যাচ্ছে পাতা ঝরার গান। ওদিকে সূর্য মামা তড়িঘড়ি টুপ করে ডুব দিচ্ছে সন্ধ্যায়। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাতাসে টের পাওয়া যাচ্ছে শীতের নিঃশ্বাস। গরম চা আর ধোঁয়া ওঠা ভাপা পিঠা এখন পথে পথে।
শীতকাল আমাদের জীবন-জীবিকার ক্ষেত্রে যতটা গুরুত্বপূর্ণ, অনুভব-উপভোগে যতটা স্বতন্ত্র, ততটা আলোচ্য বিষয় হিসেবে মূল্য পায়নি। গ্রামজীবনে শীত আসে নানা মাত্রা নিয়ে। এর সঙ্গে একজন কৃষকের স্বপ্ন ও প্রত্যাশা জড়িত থাকে, কষ্টের ভিতরেও নানা প্রাপ্তি যুক্ত থাকে। ভূমিহীন, প্রান্তিক চাষি বা দারিদ্রক্লিষ্ট মানুষের জন্য সময়টা নিরানন্দময়। শহরে জন্ম নেওয়া মানুষ প্রকৃতির এই রূপ ও রঙের পরিবর্তনকে ততটা আমলে নেন না। কেননা তার জীবিকা কিংবা বিত্ত-বেসাতির সঙ্গে বিশেষ কোনো ঋতু সরাসরি যুক্ত নয়। গাঁয়ে শিকড় রয়ে যাওয়া প্রথম প্রজন্মের শহরবাসী শীতকে বিস্মৃতির আড়ালে চলে যেতে দেন না সত্যি, কিন্তু কর্মব্যস্ত সময়ের ভিতর একে নিয়ে দু দণ্ড ভাবার অবসর তার কম। অবশ্য শীতকালে গ্রামে যাওয়ার সুযোগ পেলে সেটা তারা মাঝেমধ্যে কাজে লাগান। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া আমাদের কবি-সাহিত্যিকদের সৃষ্টিতেও শীত ঋতুটা যেন ‘ব্রাত্যজন’। শীতে উত্তুরে হাওয়া ধেয়ে এসে মানুষের শরীরে যেন হুল ফোটায়। শহরের দালান-কোঠার ভিড়ে এ হাওয়ার সঙ্গে কুয়াশার জঙ্গল একাকার হয়ে যায়। প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিতে গিয়ে বোঝার উপায় থাকে না এতে কতটুকু কুয়াশা আর কতটুকু কার্বনডাই অক্সাইড রয়েছে। কিন্তু শহর ছাড়িয়ে গাঁয়ে পা রাখলেই যে কুয়াশা আলিঙ্গন জানায় এবং তা বিশুদ্ধ। শীতে পানি নেমে যাওয়ার দিগন্ত জোড়া মাঠ গাঁয়ের মানুষের চলাচলের যোগ্য হয়ে ওঠে। খটখটে পায়েচলা কাঁচা সড়ক ধরে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে যেতেও বাধা নেই তখন। মানুষের বেড়াতে যাওয়া বেড়ে যায় এ সময়। আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে যাওয়া-আসা ও দূর থেকে বাপের বাড়িতে বেড়াতে আসে গাঁয়ের বধূ শীতের চাদর গায়ে। গ্রামের বাজারগুলোও জমজমাট হয়ে ওঠে। প্রকৃত পক্ষেই শীতে উত্সবমুখর হয়ে ওঠে গ্রামবাংলা। শীত উত্সবের সঙ্গে খেজুর রসের রয়েছে সম্পর্ক নিবিড়। একেবারে জলাভূমি ও কিছু পাহাড়ি ভূমি বাদে বাংলাদেশে এমন কোনো অঞ্চল নেই, যেখানে খেজুর গাছ জন্মে না। তবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে খেজুর গুড় উত্পাদিত হয় বাণিজ্যিকভাবে। অনেক মানুষ যুক্ত হন খেজুর গাছ কাটা, রস সংগ্রহ, তা জ্বাল দেওয়া ও গুড় তৈরির কাজে। যেকোনো চাষিই খেজুর গাছে কাটতে পারেন রস আহরণের জন্য, কিন্তু এক্ষেত্রেও আছে কিছু কৌশল। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বহুকাল ধরে পেশাদার গাছ কাটিয়ে আছে, যারা জানে এ বিদ্যা। স্থানীয় ভাষায় এদের বলা হয় ‘গাছি’। কার্তিক মাসের শুরু থেকে চৈত্রের শেষ পর্যন্ত তারা খেজুর গাছ কাটায় নিয়োজিত থাকেন। যেসব চাষির স্বল্প সংখ্যক খেজুর গাছ আছে; তারা নিজেরাই তা কাটেন, রস পাড়েন ও বাড়িতে এসে জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরির কাজও সেরে নেন।
শীতের প্রকোপ যত বেশি পড়ে, রসও হয় তত বেশি। সকালে গাছ থেকে রস পাড়ার পর তা জ্বাল দেওয়া হয়। এ হলো ‘জিরান কাট’ রস, স্বাদ ও গন্ধে সবচেয়ে উত্তম। ‘জিরান কাট’ রস নামানোর পর আবারও রসের ভাঁড় বা কলস গাছে টাঙানো হয়, এ থেকে যে রস পাওয়া যায় তা ‘উলাকাটা’। শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন গভীর রাতে রস জ্বালানো উনুনের আগুন খেজুর বনের ফাঁক দিয়ে উঁকি দেয়, বহুদূর থেকে বোঝা যায়, ওই নিবিড় স্তব্ধতার মধ্যেও জীবনের স্পন্দন আছে। উনুনের পাশে থাকে গাছি আর মজুরদের থাকার জন্য বানানো কুঁড়ে ঘর, খেজুরের পাতা কিংবা বিচালি দিয়ে ছাওয়া। কান পাতলে শোনা যায়, গাছিয়া নিঃসঙ্গতা কাটাতে গ্রাম এলাকায় চালু নানা ধরনের গান গেয়ে চলেছেন। লালন, পাগলা কানাই কিংবা নাম-না-জানা গ্রামীণ পদকর্তার এসব পদ বিস্তৃত হয়েছে স্থানীয় উচ্চারণে কিংবা যুগ থেকে যুগে মুখে মুখে গীত হওয়ার কারণে। যার সুরে আছে অদ্ভুত প্রাণময়তা ও আবেগ, সহজেই হূদয়ে ছুঁয়ে যাওয়ার মতো। যে গাছি কয়েক মাসের জন্য দূর গাঁ থেকে এসেছেন, ঘরে যার আছে ‘বালিকা বধূ’; তিনি যে সে গান না গেয়ে পুরোনো যাত্রাপালা কিংবা লোকগীতির সেই গানগুলো বেছে নেন, যাতে আছে বিরহের রস। নৈঃশব্দ, নিঃসঙ্গতা ও বিরহ—পরস্পরের সম্পর্কযুক্ত হওয়ায়, প্রাণের গভীর থেকে উঠে আসা ওই গানে শীতের পাতাঝরা গাছগুলো যেন কেঁদে ওঠে। তবে এখন গাছিদের আরও একটি বিনোদনমাধ্যম রয়েছে—রেডিও। তারা রেডিওতে অন্যের গান শোনেন, কিন্তু নিঃসঙ্গতা ভুলতে স্বকণ্ঠের গানের কোনো বিকল্প আছে কি না তা জানা নেই। গাছিদের জীবনের সুখ-দুঃখের বিরহ গাঁথাও হারিয়ে যাচ্ছে যান্ত্রিক জীবন ও তার হিসাব-নিকাশের আড়ালে। শীত তার বিচিত্র রূপ ও রস নিয়ে হাজির হয় গ্রামবাংলায়। নবান্ন উত্সব কিংবা শীতের পিঠা পায়েশ তৈরির উত্সব এখন তেমন ঘটা করে হয় না। তারপরেও শীতের যা কিছু চিরায়ত, তা উপলব্ধি করতে হলে গ্রামে যেতে হবে। শীতের নিরবতার মধ্যে অস্তিত্বের সরব প্রকাশও সৌন্দর্যমণ্ডিত। সেই সুন্দরকে ঘিরে শীতটা এবার সবার ভালোই কাটুক—এ প্রত্যাশা রইল।
