লাখো যাত্রীর জন্য নাই শৌচাগারের ব্যবস্থা—এই হইল কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের সেবা-পরিস্থিতি। স্টেশনটির ভিতরে প্রথম শ্রেণির ও এসি টিকিটধারী যাত্রীদের জন্য নির্মিত নূতন শৌচাগারটিতে পুরুষ ও মহিলাদের জন্য আলাদা শৌচাগার রহিয়াছে। এইসকল টয়লেটে সাধারণ যাত্রীদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষেধ। সাধারণ যাত্রীদের জন্য দুই নম্বর গেটের বাহিরে বাম পাশে একটি কক্ষের ভিতর ছোট্ট একটি শৌচাগার রহিয়াছে। ওই শৌচাগারটিই তাহাদের একমাত্র ভরসা। কিন্তু উহার অবস্থা খুবই সঙ্গিন। দুর্গন্ধে ভরপুর ওই শৌচাগারটি ব্যবহারের অনুপযোগী বলিলেই চলে। তবে ‘সরকারি’ শৌচাগারের অবস্থা যাহাই হউক, একমাত্র ‘পাবলিক’ শৌচাগারটি চালু রহিয়াছে। সেইখানে ৫ টাকা ও ১০ টাকার বিনিময়ে প্রস্রাব-পায়খানা করিবার সুবিধা পাইতেছেন যাত্রীরা। দেশের সর্ববৃহত্ এই রেলস্টেশনে প্রতিদিন প্রায় লক্ষ যাত্রী চলাচল করিয়া থাকেন। মোট যাত্রীর মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ প্রথম শ্রেণির ও এসি টিকিটধারী, বাকি ৯০ শতাংশ সাধারণ যাত্রী। ভাবিতে অবাক লাগে যে এই ৯০ শতাংশ যাত্রীর জন্য কমলাপুর রেলস্টেশনে মাত্র একটি শৌচাগার। তাও আবার স্টেশনের বাহিরে, ভিতরে কোনো শৌচাগার নাই। তাই যাত্রীরা অপেক্ষা করেন, কখন ট্রেন প্লাটফর্মে ভিড়িবে এবং তাহার শৌচাগার ব্যবহার করিবেন। ওইদিকে বিজ্ঞপ্তি জারি রহিয়াছে, প্লাটফর্মে দাঁড়ানো অবস্থায় ট্রেনের শৌচাগার ব্যবহার না করিবার জন্য। তাহা হইলে যাত্রীরা যাইবে কোথায়?
মার্কিন স্থপতি রবার্ট বওয়ির ডিজাইনে ১৯৬৯ সালে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন চালু হয়। বহু দশক ধরিয়া কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন কেবল প্রধান রেলওয়ে কেন্দ্র হিসাবে নয়, অন্যতম দর্শনীয় স্থান হিসাবেও বিবেচিত হইয়া আসিয়াছে। কিন্তু ঢাকা শহর যেইভাবে ক্রমশ বৃহদাকার হইয়া উঠিয়াছে, সেই তুলনায় কমলাপুর স্টেশনকে আজকাল অপ্রতুল বলিয়া মনে হয়, ইহার স্থাপত্যজনিত নান্দনিকতাকেও তেমন কিছু মনে হয় না। রেলওয়ে সেবার ব্যাপক চাহিদা জনগণের নিকট রহিয়াছে, সময় আসিয়াছে এই সেবাকে ঢালিয়া সাজাইবার। পাশাপাশি কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনকে সংস্কার করিয়া ইহাকে যাত্রীদের জন্য স্বস্তিদায়ক ও মনোরম স্থানে পরিণত করিবার। উন্নত শৌচাগার ইহার পূর্বশর্ত। ইউরোপ কিংবা এশিয়ার উন্নত দেশগুলির বড় শহরে ‘সেন্ট্রাল’ বা কেন্দ্রীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা রেলভিত্তিক হইয়া থাকে এবং বাস সার্ভিস তাহাকে ঘিরিয়া গড়িয়া উঠিয়াছে। এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশের সুবিশাল হাওড়া স্টেশন কিংবা মুম্বাইয়ের ভিক্টোরিয়া টার্মিনালের যেই ঐতিহ্য ও সেবার মান, তাহার তুলনায় কমলাপুর অনেক পিছাইয়া রহিয়াছে। ইহা বড়ই আশ্চর্যের বিষয় যে দেশের সর্ববৃহত্ রেলস্টেশনে অনেক সুযোগ-সুবিধা নাও থাকিতে পারে, কিন্তু শৌচাগার সেবার এই বেহাল দশা মানিয়া লওয়া যায় না। স্টেশনের ভিতরে ও বাহিরে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সাধারণ যাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত শৌচাগারের ব্যবস্থা করিতে হইবে, তাহা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখিতে হইবে এবং যাত্রীদের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত রাখিতে হইবে। নারী ও পুরুষ উভয়েই যেন নির্বিঘ্নে এই শৌচাগার ব্যবহার করিতে পারেন, তাহার সুব্যবস্থা করিতে হইবে। ইহা যেকোনো টার্মিনাল গড়িয়া উঠিবার একটি ন্যূনতম শর্ত। এই শর্ত পূরণ না করিয়া দশকের পর দশক কাটিয়াছে, এইভাবে আর চলিতে দেওয়া যায় না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত এই ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করিবেন, ইহাই প্রত্যাশিত।
