সোনাগাজী উপজেলার বগাদানা ইউনিয়ন পরিষদের আলমপুর গ্রামে অজ্ঞাতপরিচয় দুর্বৃত্তদের পেট্রোলের আগুনে ভস্মীভূত হইয়াছে হিন্দুদের চারটি বসতঘর। একটি সহযোগী দৈনিকে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শনিবার মধ্যরাত্রে ওই গ্রামের রাবিদ্র ডাক্তারবাড়িতে এই অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ঘটনার অন্যতম ভুক্তভোগী গৃহহারা শিশির শীল জানাইয়াছেন, রাত্রি সাড়ে ১১টায় বাড়ির উঠানে অজ্ঞাতপরিচয় ৪-৫ জনের আনাগোনা টের পাইয়া তিনি তাহাদের পরিচয় জানিতে চাহিলে তাহারা ‘চুপ থাক’ বলিয়া ধমক দেন। ইহার পরপরই তাহার গৃহে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। মুহূর্তের মধ্যেই আগুন পার্শ্ববর্তী বাড়িতেও ছড়াইয়া পড়ে। ভুক্তভোগীদের আর্তচিত্কারে এলাকাবাসী আগাইয়া আসিলে দুর্বৃত্তরা পালাইয়া যায়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছার আগেই একে একে চারটি বসতঘর ভস্মীভূত হয় সম্পূর্ণভাবে। অগ্নিকাণ্ডে সৌভাগ্যক্রমে কোনো প্রাণহানির ঘটনা না ঘটিলেও নিঃস্ব হইয়া পড়িয়াছে চারটি পরিবার। শিশির শীল জানাইয়াছেন যে গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও তাহার বাড়ির খড়ের গাদায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটিয়াছিল। স্থানীয়রা মনে করেন, ভয়ভীতি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যেই হিন্দু-অধ্যুষিত এই এলাকাটিতে পরিকল্পিতভাবে নাশকতা চালানো হইয়াছে। প্রকৃত উদ্দেশ্য যাহাই হউক না কেন, অভিযোগ সত্য হইলে বিষয়টিকে হালকা করিয়া দেখিবার কোনো অবকাশ নাই।
ইহা অনস্বীকার্য যে, সংখ্যালঘুদের উপর এই ধরনের চোরাগুপ্তা হামলা নূতন নহে। বিশেষ করিয়া নির্বাচনের আগে-পরে সংখ্যালঘুদের উপর পরিকল্পিত হামলার যে-অভিযোগ রহিয়াছে—তাহাও একেবারে ভিত্তিহীন বলা যাইবে না। এই বাস্তবতা সত্ত্বেও গর্ব করিবার মতো বিষয় হইল, ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। শত শত বত্সর ধরিয়া নানা ধর্ম ও মতের মানুষ এখানে শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করিয়া আসিতেছেন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মহামূল্যবান এই বাতাবরণটিকে ক্ষতিগ্রস্ত করিবার বহু অপচেষ্টা হইয়াছে বিভিন্ন সময়ে। ঝরানো হইয়াছে বহু রক্তও। কিন্তু অশুভ শক্তির উদ্দেশ্য কখনো সফল হয় নাই। জনগণই তাহাদের রুখিয়া দিয়াছে। ইহার চাইতেও স্বস্তির বিষয় হইল, এই ব্যাপারে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের অবস্থান খুবই স্পষ্ট ও শক্ত। তাই গত একদশকে দেশের নানা স্থানে সংখ্যালঘুদের মন্দিরে বা গৃহে বিচ্ছিন্ন কিছু হামলার ঘটনা ঘটিলেও দুর্বৃত্তরা হালে পানি পায় নাই। পরিকল্পিতভাবে গুজব রটাইয়া বড় ধরনের নাশকতার অপচেষ্টাও যে হয় নাই তাহা নহে, কিন্তু সরকারের সময়োচিত পদক্ষেপ ও কঠোর মনোভাবের কারণে অঙ্কুরেই তাহার বিনাশসাধন সম্ভব হইয়াছে। সেই কারণেই দুর্বৃত্তরা এখন তাহাদের অপকর্মের জন্য রাত্রির অন্ধকারকেই বাছিয়া লইয়াছে।
সামনে জাতীয় নির্বাচন। অশুভ চক্রটি যেন কোনোভাবেই ধর্মীয় সংখ্যালঘু কিংবা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগণের মধ্যে ভীতি বা আতঙ্কের সৃষ্টি করিতে না পারে— সেই ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে সার্বক্ষণিকভাবে সজাগ থাকিতে হইবে। দল-মত ও সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে হামলাকারী বা ভীতিপ্রদর্শনকারী দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে। সর্বোপরি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও জনগণকেই আগাইয়া আসিতে হইবে সর্বাগ্রে। গড়িয়া তুলিতে হইবে সামাজিক প্রতিরোধ।
