সমতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত সমাজে শ্রেণি বিভেদ থাকে না। কোনো বিশেষ শ্রেণিকে এগিয়ে নেয়ার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু যে সমাজে নারী-পুরুষের জীবনমান, ক্ষমতায়নের ক্ষেত্র, সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান এক নয়, সেখানেই বিভেদ তৈরি হয়। প্রসঙ্গতই সেখানে ‘সামঞ্জস্য’ ও ‘সমতা’ বিষয়টি আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়ায়। সমাজে শ্রেণি ব্যবধান যখন বেশি থাকে, তখন অপেক্ষাকৃত অনগ্রসর শ্রেণি কম সুবিধাপ্রাপ্ত হয়। যা শ্রেণি ব্যবধানকে আরও বাড়িয়ে তোলে। যার ফলে অনগ্রসর শ্রেণি নানাভাবে অত্যাচার নির্যাতনের শিকার হন, পিছিয়ে পড়েন সমাজের মূল স্রোত থেকে। আমাদের দেশে নারী ও পুরুষের নেতৃত্ব এবং ক্ষমতায়নের ক্ষেত্র অত্যন্ত বৈষম্যপূর্ণ। নেতৃত্ব ও ক্ষমতায়নে এদেশে পুরুষের ক্ষেত্র যত প্রশস্ত নারী সেখানে বৈষম্যমূলক অবস্থানে রয়েছেন। সামঞ্জস্য ও সমতার ক্ষেত্র পাকাপোক্ত নয় বলে আমাদের নারীরা যোগ্যতম হয়েও প্রতিনিয়ত বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। নেতৃত্বে নারীর উপস্থিতি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের সমান সুযোগ তৈরি করে।
আমাদের দেশে নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে নারীর অবস্থান এখনো উল্লেখযোগ্য নয়। যদিও ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও প্রধান বিরোধীদল বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে রয়েছেন নারী। ২০০৯ সালে সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২’এ ২০২০ সালের মধ্যে রাজনৈতিক দলে এক-তৃতীয়াংশ নারীর প্রতিনিধিত্ব বাধ্যতামূলক করার বিধান যুক্ত করা হয়। সে বাধ্যবাধকতা কতটা পূরণ করেছে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো? কারণ রাজনীতিতে নারীর উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণই নারীমুক্তির প্রধান উপায়। ২০২০ সাল পূর্ণ হতে আর মাত্র একবছর। কতটা এগিয়েছে নারী নেতৃত্বে?
এই অবস্থায় দলে এক-তৃতীয়াংশ নারীর প্রতিনিধিত্ব রাখার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান জানতে চেয়ে গতবছর ইসির পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হয়। ৪০টি দলের মধ্যে ১০টি দল নারী নেতৃত্বের বিষয়ে বর্তমানে দলের কী অবস্থান, তা ইসিকে জানিয়েছে। দলগুলোর প্রদত্ত প্রতিবেদন থেকে দেখা যায় যে ৪০টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে একটিমাত্র দল (গণফ্রন্ট) তাদের নেতৃত্বে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধি আনতে পেরেছে। প্রতিবেদন থেকে আরও দেখা যায়, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের ৮১ জনের মধ্যে ১৫ জন নারী; শতকরা হারে তা ১৮ শতাংশ। বিএনপির সব স্তরের কমিটিতে ১৫ শতাংশ নারী সদস্য রয়েছেন। আর জাতীয় পার্টির সব পর্যায়ের কমিটিতে নারী রয়েছেন ২০ শতাংশ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ১৮ মার্চ ২০১৮)। যদিও স্থানীয় সরকার এবং জাতীয় সংসদে সংরক্ষণ-পদ্ধতি রয়েছে, কিন্তু নারী নেতৃত্বকে ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে যেতে তা কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারছে না।
চারদিকে এখন নির্বাচনের ডামাডোল। আগামী ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে ৪০ হাজার ১৮৩টি ভোটকেন্দ্রের আওতায় নারী ভোটার ৫ কোটি ১৬ লাখ ৬৬ হাজার ৩১১ জন এবং পুরুষ ভোটার ৫ কোটি ২৫ লাখ ৭২ হাজার ৩৬২ জন। ৫ কোটি ১৬ লাখ ৬৬ হাজার ৩১১ জন নারী ভোটারের অনুপাতে নেতৃত্বে আছেন কতজন নারী? নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রাপ্ত নারী প্রার্থীর সংখ্যা ২০ জন, পক্ষান্তরে প্রধান বিরোধীদল বিএনপির মনোনয়নপ্রাপ্ত নারী প্রার্থী মাত্র ১০ জন। এই চিত্র খুবই হতাশাজনক। এবং বর্তমান অবস্থাই বলে দেয়, ২০২০ সালের মধ্যে দলগুলো এক-তৃতীয়াংশ নারীর প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারবে কি না । নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য এবং সহিংসতা দূর করতে দরকার নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে নারী নেতৃত্ব বাড়াতে হবে। নারীর সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং নির্বাচনী এলাকায় জনগ্রহণযোগ্যতা তৈরিতে দলগুলোকে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে হবে। এবং নারীকেও সকল প্রতিবন্ধকতা দূর করে হয়ে উঠতে হবে নেতৃত্বের যোগ্যতম। তবেই নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য দূর হবে।
n লেখক : সাংবাদিক
