‘আমাদের যুগে আমরা যখন খেলেছি পুতুল খেলা/তোমরা এ যুগে সেই বয়সেই লেখাপড়া করো মেলা’— সুফিয়া কামালের এই কালজয়ী কবিতার সত্যতা আমাদের সমাজের সকল অভিভাবক বুঝবেন। যেখানে ছয় বছরের একটি বাচ্চাকে পড়তে হয় ছয়টির অধিক বই। শুধু কি তাই কখনো বইয়ের সংখ্যা দাঁড়ায় দশের কাছাকাছি।
শিক্ষার ব্যাপারে বাংলাদেশে ব্যাপক সচেতনতা বেড়েছে যা প্রশংসনীয়। তবে আমাদের অভিভাবকদের এই সচেতনতা কখনো অতি-উত্সাহী মনোভাব তৈরি করে। অভিভাবকের ব্যক্তিগত জীবনের ব্যর্থতার সফলতা খুঁজতে থাকে সন্তানের কাছে, যা কখনো রূপ নেয় নীরব নিষ্ঠুরতায়। ফলে শিশুকালেই তাদের নামতে হয় এক অসুস্থ প্রতিযোগিতায়। আবার এ প্রতিযোগিতায় একবার কেউ ব্যর্থ হলে তার ওপরে চলে মানসিক নির্যাতন। সন্তানের প্রতি বেশি কেয়ার নেওয়ার নামে বাড়ানো হয় টিউটরের সংখ্যা বা পড়াশোনা করার সময় বাড়িয়ে অবসর কমিয়ে নিয়ে আসা হয়।
আমরা শিশুদের সকালে ঘুম থেকে ৬টায় জাগিয়ে ৭টার ক্লাস ধরতে পাঠিয়ে দেই ৫ কেজি ওজনের একটি ব্যাগ দিয়ে, যেখানে ডেনমার্কের স্কুলের বাচ্চাদের কোনো স্কুলব্যাগ নেই। স্কুল থেকে ফিরতে ফিরতে বেজে যায় প্রায় একটা। গোসল-খাওয়া সেরেই ছুটতে হয় তাকে কোচিংয়ে। বাসায় ফেরা হয় সন্ধ্যার আগে আগেই। দিনে কেটে যায় এভাবেই। সন্ধ্যা নামার পরপরই আসেন গৃহশিক্ষক। পড়া শেষ হতে হতে সাড়ে আটটা-নয়টা। রাতের খাওয়া, স্কুলের পড়া। একটু টিভি দেখে ঘুমাতে যেতে যেতে ১২টা। যেখানে নেই তার খেলার জন্যে পর্যাপ্ত সময়, সহপাঠীদের সঙ্গে মেশবার সুযোগ, সেখানে সময় নেই মূল্যবোধ পরিচর্যার সুযোগ। তাহলে এই শিশু থেকে আমরা কিভাবে বুদ্ধিবৃত্তিক বা মূল্যবোধের উন্নয়ন আশা করতে পারি?
বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতের সুসপষ্ট নির্দেশনা রয়েছে কোনো শিশু তার ওজনের ১০ ভাগের বেশি ওজনের ব্যাগ বহন করবে না। কিন্তু আমরা বাস্তবে কতটুকু তার প্রয়োগ দেখতে পাই, প্রায় প্রতিটি বেসরকারি স্কুলের বাচ্চাকে বহন করতে হয় সরকারি কারিকুলামের বাইরে ৫/৭টা বই। শুধু কি বই? বইয়ের বাইরে হোমওয়ার্ক, ক্লাসওয়ার্ক ও হাতের লেখার খাতা থাকে প্রতিটির জন্য কমপক্ষে দুটি করে। সেইসঙ্গে খাবার পানি আর কখনো বা টিফিনের জন্যে আলাদা পাত্র। ব্যাগের ওজনও হয়ে যায় ১ কেজির বেশি। শেষমেষ হিসেব করলে দাঁড়ায় ব্যাগের ওজন ৪-৫ কেজি। ১৮-২০ কেজি ওজনের একটি স্কুলপড়ুয়া শিশু ৪-৫ কেজি ওজনের ব্যাগ বহন করে শৈশবকালে মেরুদণ্ডের কোনো সমস্যায় আক্রান্ত হলে পরবর্তীকালে তা মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।
মনোবিজ্ঞানী এরিকসন তার মনো-সামাজিক বিকাশ তত্ত্বে বলেছেন—একটি মানুষ কি অধ্যবসায়ী হবে না হীনম্মন্যতায় ভুগবে তা নির্ভর করে ৬-১২ বছর বয়সকালে তার পরিবারের বাইরের বাহ্যিক পরিবেশের ওপর অর্থাত্ তার স্কুল বা শিক্ষার উপকরণ ও পরিবেশ, তার বন্ধুবান্ধব, সহপাঠী, খেলার সাথি বা গুরুজনের সঙ্গে তার আন্তঃসমপর্কের ওপর। সুতরাং এটা অস্বীকার করার অবকাশ নেই যে আমাদের এই ভবিষ্যত্ প্রজন্মের বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়নের বা মূল্যবোধ বিকাশের জন্যে শিশুদের চাপমুক্ত রাখার বিকল্প নেই। তাদের ওপর অপ্রয়োজনীয় বইয়ের ভারী বোঝা চাপিয়ে না দিয়ে সহজবোধ্য ও ব্যক্তিত্ব বিকাশের জন্যে যে বই দরকার তাই পাঠদান করাই কাম্য। তবে পরিবারের অতি-উত্সাহী মনোভাব আমাদের এই শিশুদের সম্ভাবনা অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দেয়—এ ব্যাপারে পারিবারিক সচেতনতা একান্ত কাম্য।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
