‘৩২ বছর ধরে আমার এলাকার মানুষ আমাকে দেখে আসছে (জনপ্রতিনিধি হিসেবে)। আমাকে ভোট না দেওয়ার একটাই কারণ হতে পারে যে, ৩২ বছর ধরে এই মুখটা তারা দেখতে দেখতে এখন বিরক্ত। এছাড়া আর কোনো কারণ নেই।’ একটা বেসরকারি টিভিকে এমনটাই বলছিলেন একজন জনপ্রতিনিধি। দক্ষিণাঞ্চলে, বিশেষ করে তাঁর নির্বাচনী এলাকায়, তাঁর কর্মকাণ্ড তাঁকে এমন আত্মবিশ্বাসী হতে সাহায্য করে। এই জনপ্রিয়তা একদিনে তৈরি হয়নি। যদিও তাঁর বাবা ছিলেন দেশের স্বনামধন্য এক লোক, কিন্তু তিনি নিজেকে মানুষের কাছে নিয়ে গেছেন পিতৃপরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে আপন পরিচয়ে। তিনি এলাকায় যান। বারবার যান। মানুষের কাছে যান, মানুষ তাঁর কাছে যায়। তিনি তাঁর অঞ্চলের মানুষকে ভালোবাসেন, মানুষও তাঁকে ভালোবাসে। আর এ কারণেই তিনি আত্মবিশ্বাসী, তাঁর এলাকার মানুষ তাঁকে চাইবেই। এই ভদ্রলোককে দিয়েই আলোচনা শুরু করা যাক। শুরুতেই তাঁকে উপস্থাপন করার কারণ হলো—ইতিবাচকতা।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দরজায় কড়া নাড়ছে। এই মুহূর্তে ঘরমুখো যাবতীয় নাগরিক পাখি। আমরা তাঁদের ভালোবেসে ডাকি—জনপ্রতিনিধি। গুলশান-বনানী-ধানমণ্ডির বাসা ছেড়ে এখন তাঁরা ঘুরছেন আপন এলাকায়। সেখানেও অবশ্য তাঁদের বাড়ি গুলশানের বাড়ির থেকে কম নয়। নষ্ট যা ঐ বাড়ির সামনের রাস্তাটা। তাও সবার খারাপ না। অধিকাংশই নিজের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তাটুকু ঝকঝকে করে রাখেন। তবে সবাই যে নিজের বাড়ির রাস্তাটুকুই সুন্দর করে রাখেন, এমন না। অনেকেই আছেন শুরুতে আলোচ্য ভদ্রলোকের মতো, যাঁরা গ্রামের মানুষের জন্যও রাস্তা করে দেন। গ্রামের মানুষের পাশে যান। তাদের সুবিধা-অসুবিধা দেখেন। অসুবিধা দূর করার চেষ্টা করেন। সেসব জনপ্রতিনিধির জন্য শ্রদ্ধা।
সেদিন এক বন্ধুর সঙ্গে তাদের নির্বাচনী এলাকার জনপ্রতিনিধি নিয়ে আলাপ হচ্ছিল। তাদের এলাকার সাংসদের নাম বলাতেই চিনে যাই। বলি,‘তিনি তো খুব পরিচিত লোক। টিভিতে তো প্রায়ই দেখা যায়।’ বন্ধু আক্ষেপ করে বলে, ‘তাঁকে যা ঐ টিভিতেই দেখা যায়। এলাকায় না।’ বন্ধুর এলাকাও দক্ষিণাঞ্চলেই। শুরুতে আলোচ্য ব্যক্তির পাশের এলাকা। কী দারুণ অমিল দুই জনপ্রতিনিধির! একজনকে নিয়ে আক্ষেপ করে তাঁর এলাকার মানুষ, আরেকজনকে নিয়ে করে গর্ব। নির্বাচন এলে এই হিসেবটা খুব করে সামনে এসে দাঁড়ায়। গ্রামে প্রতীক একটা প্রভাব রাখলেও, গ্রামের মানুষের উলেখযোগ্য একটা অংশই প্রভাবিত হয় জনপ্রতিনিধি দ্বারা। কে কতটা এলাকামুখো, কে কতটা মাটির কাছাকাছি তার হিসেব দল না রাখলেও মানুষ ঠিকই রাখে। তাই অনেক সময় দেখা যায়, কোনো দলের পরিচিত মুখেরও ভরাডুবি ঘটে যায় কোনো অপরিচিত জনমুখী জনপ্রতিনিধির কাছে।
জনপ্রতিনিধিদের শুধু নির্বাচন এলেই এলাকামুখী হলে চলবে না। তাদের কাছে তৃণমূল মানুষ কিছু চায়, সেটা তাদের বুঝতে হবে। মানুষের কাছাকাছি যেতে হবে। মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ শুধু নির্বাচন এলে, নির্বাচনের পরে এলাকায় তারা অতিথি পাখি, এমন হলে চলবে না। এটা খুবই দুঃখের যে, অনেক জনপ্রতিনিধিই জনবিচ্ছিন্ন থাকেন। জনগণ তাঁদের নাগাল পায় না। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে জনপ্রতিনিধিদের। জনগণের জন্যই তাঁরা, এটা তাঁদের বুঝতে হবে। জনগণ ভোট দিয়েছে বলেই জনপ্রতিনিধি, এই কথাটা যেন জনপ্রতিনিধিরা ভুলে না যান। আর জনগণকে বুঝতে হবে তাদের ভালোমন্দ। যিনি ভোট দেবেন, নিশ্চয়ই তার ভালোমন্দ বিবেচনাবোধ রয়েছে। নইলে তো আর ভোটার হতেন না। জনবিচ্ছিন্ন কেউ জনপ্রতিনিধি হলে জনগণও দায় এড়াতে পারে না। তাদেরই অদূরদর্শিতার ফল হয় তা। জনগণের বিবেচনাবোধ, দূরদর্শিতার ওপরেই নির্ভর করে দেশ এবং তাদের ভাগ্য।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
