আহসান হাবীব
না, আমি ঠিক ৫০০টা ঠাট্টা এক এক করে লিখতে যাচ্ছি না বা চাচ্ছিও না। আসলে ‘ঠাট্টা’ নামে একটি ফান সাপ্লিমেন্ট তার ৫০০তম সংখ্যা বের করতে যাচ্ছে, সেই উপলক্ষে লেখা। একে একে নিভিছে দেউটির মতো সব দৈনিক পত্রিকার সব ফান সাপ্লিমেন্ট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বা গেছে, কেবল ঠাট্টাই ফান পাঠকদের জন্য বিরাট একটা ঠাট্টা হয়ে টিকে আছে।
আমাদের দেশের একটা দৈনিক পত্রিকা বিশ্লেষণ করা যাক (আমার দৃষ্টিতে), একটা পত্রিকায় তার স্বাভাবিকভাবে খবর ছাড়াও সব সময় থাকে এক পাতা খেলার খবর। এক পাতা থাকে সিনেমা-নাটকের খবর, তারপর এক পাতা থাকত বিজ্ঞানের খবর (আমি যে পত্রিকাটা রাখতাম), এক পাতা ফান, মানে কার্টুন রম্য ইত্যাদি। তারপর হঠাত্ করে একদিন আবিষ্কার করলাম, বিজ্ঞানের পাতা অর্ধেক হয়ে গেছে। তবে খেলার পাতা দুই পাতা হয়েছে। কিছু দিন পরে দেখি বিজ্ঞানের পাতা আরো অর্ধেক এবং ফান পাতাও অর্ধেক। তারপর একদিন দেখি বিজ্ঞান পাতা বাদ। ফান পাতা কোনোমতে অর্ধেক হয়ে টিকে আছে... তারপর হঠাত্ একদিন দেখি ফান পাতাও নেই।
ফান পাতা নেই দেখে কি হাসি-ঠাট্টা-তামাশা উঠে গেছে? মোটেই না। এই তো সেদিন এক তরুণ এলো আমার কাছে। সে রম্য লেখে, জোক্্স লেখে। কিন্তু এখন সে লেখার জায়গা পাচ্ছে না।
—উন্মাদে লেখো।
—না বস।
—কেন, উন্মাদে লিখলে সমস্যা কী?
—বাসায় মা যদি টের পায় উন্মাদে লিখি, তাহলে বাসা থেকে একদম বের করে দেবে আমাকে।
‘কেন? উন্মাদের কী অপরাধ?’ আমি কৌতূহলী হয়ে উঠি। তখন সেই তরুণ গলা নামিয়ে ফেলে। প্রায় ফিস ফিস করে বলে, ‘আমার বাবা-মা একদিন ঝগড়া করছিলেন, তখন আমি শুনে ফেলেছি, বাবা নাকি তরুণ বয়সে উন্মাদ ঈদসংখ্যার ভিতরে মাকে প্রেমপত্র দিয়েছিলেন। তারপর সেই প্রেমপত্র নানা-নানির কাছে ধরা খেয়ে যায়, তারপর মায়ের ওপর দিয়ে স্টিম রোলার চলে, সেই থেকে মা উন্মাদ দেখতে পারে না... উন্মাদের নামই শুনতে পারে না।’
শুনে আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলি। বরং উন্মাদের বাইরে একটু ঠাট্টা-তামাশায় যাই। আসলে দৈনন্দিন জীবনে আমরা সবাই কিন্তু কমবেশি ঠাট্টা-তামাশা করতে পছন্দ করি। জাতি হিসেবেই আমরা যেন ঠাট্টার গাট্টা খেতে বেশ পছন্দই করি। তার কিছু উদাহরণ দেওয়া যাক।
এক লোক ফলপট্টিতে গেছে ফল কিনতে, ‘কী ভাই, তোমার তরমুজ মিষ্টি হবে তো?’
—স্যার ডায়বেটিস হইলে এই তরমুজ নিয়েন না।
এক লোক গেছে ভ্যান থেকে পটল কিনতে। ঢাকা শহরে এখন ভ্যানে করে শাক-সবজি বিক্রি হয়। দেখে পটলওয়ালা তার পটলের ওপর পানি ছিটাচ্ছে একটু পর পর। তখন লোকটা বলল, ‘ভাই তোমার পটলের জ্ঞান ফিরলে আমারে এক কেজি পটল দিয়ো।’
এক লোক খুপরি ভাড়া বাড়ি থেকে নিজের কেনা বিশাল ফ্ল্যাটে উঠেছে। বুয়া নতুন ফ্লাটের মেঝে পরিষ্কার করছে ফ্লাটের নতুন মালিক জিজ্ঞেস করল, ‘কী বুয়া, আমার নতুন বাড়ি কেমন?’
—ধুর আগেরটাই ভালো ছিল এক ঘণ্টায় মুইছা সারতে পারতাম। এইডা মুছতে লাগে দুই ঘণ্টা।
এক চোর চুরি করতে একটু বেশি আগে আগে ঢুকে পড়ে এক বাসায়, কার্নিশের ওপর একটু ঘুমিয়ে নিয়ে সময়টা কাটানোর সিদ্ধান্ত নেয় সে। ঘুমিয়েও পড়ে। চোরের নাকডাকার কারণে গৃহকর্তা দেখে ফেলেন। ডেকে তোলেন চোরকে, ‘এই ওঠ, সকাল তো হয়ে যাচ্ছে, চুরি করবে কখন?’
কাজেই প্রিয় পাঠক আপনারা বুঝতেই পারছেন ঠাট্টার গাট্টা খেতে খেতে আমাদের এই ছাপোষা জীবনটা খুব খারাপ যাচ্ছে না। চলুক না এভাবেই... মন্দ কী।
[ লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সম্পাদক, উম্মাদ ]
