সেলিব্রেশন

আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ২১:০৫

 

জামসেদুর রহমান সজীব

 

ঘুমে প্রায় তলিয়েই গিয়েছিলাম, কিসের শব্দে জানি ঘুম ভেঙে গেল। পরে দেখি মোবাইল বাজছে। কলদাতা ঠাট্টার সম্পাদক সাইফুল ইসলাম জুয়েল ভাই। অলরেডি স্ক্রিনে ১৩টি মিসড কল উঠে আছে। আমি তড়িঘড়ি করে রিসিভ করতেই অপর প্রান্ত থেকে জুয়েল ভাই বললেন, ‘ঘুমাও নাকি?’

‘জি ভাই, একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।’

‘আচ্ছা ঘুমাও। গুড নাইট।’ এই বলে কল কেটে দিলেন। আমি পুরাই খিচ খেয়ে পড়ে রইলাম। কী হলো বিষয়টা? পরে মনে পড়ল তিনি এই কাজ গত সপ্তাহখানেক ধরেই করে আসছেন। মানলাম লোকটা ঠাট্টার সম্পাদক, তাই বলে রিয়েল লাইফ ঠাট্টাও করা লাগবে! ঘুমের বারোটা বাজায় মনটা খারাপ হয়ে গেল। একটু ফেসবুক গুঁতানোর খায়েশ জাগল। ফেসবুকের মেসেঞ্জারে ঢুকে দেখি জুয়েল ভাই গ্রুপ চ্যাট খুলেছেন। নাম দিয়েছেন ‘ঠাট্টা : কিন্তু ঠাট্টা করা নিষেধ’। মাথার উপর দিয়েই গেল। গ্রুপে আরো দুজন সদস্যকে পেলাম। রম্যলেখক সত্যজিত্ বিশ্বাস আর কার্টুনিস্ট রবিউল ইসলাম সুমন। চ্যাটবক্সের মেসেজগুলো পড়ে যা বুঝতে পারলাম, ঠাট্টার ৫০০তম সংখ্যা উদযাপনের জন্য ইত্তেফাক কার্যালয় থেকে বিশাল অঙ্কের নগদ অর্থ পাওয়া গেছে। সম্পাদক সাহেব তাই কন্ট্রিবিউটরদের শাহি ট্রিট দিতে চান। তাও আবার র্যাডিসন ব্লুর মতো হোটেলে। সত্যজিত্ ভাই জানালেন তিনি বিবাহিত মানুষ, হোটেলে যাওয়ায় বউয়ের নিষেধ আছে। অপরদিকে সুমন ভাই বললেন ব্লু জিনিসের উপর তার আগ্রহ নেই। আমি লিখলাম, ‘গরিব মানুষ ভাই। যা দেবেন হাতে তা-ই যাবে সাথে।’ কিন্তু জুয়েল ভাই অনড় রইলেন সিদ্ধান্তে। ট্রিট তো তিনি র্যাডিসনেই দেবেন। পরদিন বিকেল ৪টার মধ্যে র্যাডিসনের গেটে থাকতে বললেন। আমার ওপর দায়িত্ব চাপালেন বাকি দুজনকে সঙ্গে আনার।

ঢাকা শহরে যে পরিমাণ জ্যাম, এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে দিন পার হয়ে যায়। তাই খুব ভোরে সত্যজিত্ ভাই আর সুমন ভাইকে শাহবাগে ডেকে আনলাম। সকাল সকাল রওনা হলে পৌঁছাতে ওই বিকেলই হয়ে যাবে। ভোর ৫টার দিকে জাতীয় জাদুঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছি তিনজন। বাস, সিএনজি, ট্রাক, ঠেলাগাড়ি, গরুর গাড়ি কিছুই পাই না। সত্যজিত্ ভাই গল্প শুরু করলেন তিনি জীবনে প্রথমবার জাদু দেখেছিলেন এই জাতীয় জাদুঘরেই। জুয়েল আইচ জাদু দেখিয়েছিলেন। কদবেলকে কবুতরে রূপান্তর করেছিলেন জাদু দিয়ে। সুমন ভাই রীতিমতো জাপটে ধরে সত্যজিত্ ভাইকে চিমটি কাটলেন। সেও নাকি জীবনের প্রথম জাদু এই জাদুঘরেই দেখেছিলেন। মাঝখানে আমি চুপচাপ সব গিলে চললাম। উল্টাপাল্টা কিছু বলে এই দুজনের কালা জাদুর শিকার হবার ইচ্ছে নেই।

যানবাহনের দেখা না পেয়ে জুয়েল ভাইকে বল দিলাম। অপরপ্রান্ত থেকে ঘুমজড়িত কণ্ঠে তিনি বললেন, ‘কে তুই? তোর বাড়ি কই? তোগো ঘুম নাই? এত সকালে কেউ কল দেয়?’ আমি পরিচয় দিয়ে বললাম, ‘ভাই গাড়ি-ঘোড়া তো পাই না। কিসে আসবো?’ ‘প্লেনে চড়ে আয়। গাধার পিঠে চড়ে আয়। হামাগুড়ি দিয়ে আয়। না এসে কল দিবি না ভুলেও। ঘুমাইতে দে আমারে!’ এই বলে কল কেটে দিলেন ভাই। আমি পড়লাম টেনশনে। কী করা যায়? পরে সুমন ভাই পরামর্শ দিলেন পাঠাও সার্ভিস ডাকার জন্য। আমি জানালাম বাইকে একজনের বেশি ওঠা নিষেধ। মানুষ আমরা তিনজন। একসঙ্গে যাওয়া পসিবল না। সত্যজিত্ ভাই ক্ষেপে উঠলেন। জানালেন এক বাইকে পাঁচজন নিয়ে চালানোর অভিজ্ঞতা আছে তার। অসম্ভবের কিছুই নেই। আমি তাকে কোনোভাবেই আইন বুঝাতে পারলাম না। ড্রাইভারসহ মোট চারজন মানুষ একটা বাইকে চড়লে এই ঢাকা শহরে ফাইন তো দিতে হবেই, পুরো শহর কানে ধরে ঘোরাবে ট্রাফিক পুলিশ।

ঘণ্টাখানেক ঝিম মেরে থাকার পর অবশেষে একটা সিএনজি পেলাম। কিন্তু আমাদের দেখেই সিএনজির ড্রাইভার বলে দিলেন, ‘যামু না।’ আমরা তখনো টু শব্দ পর্যন্ত করিনি। কোথায় যাব, ভাড়া কত—কিছুই বলা হয়নি। পরে ড্রাইভার নিজে এসেই বললেন, ‘স্যরি মামা। বহুদিনের অভ্যাস। মুখ ফসকে বেরিয়ে যায়। কই যাবেন চলেন যাইগা।’ হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম আমরা। শাহবাগ ত্যাগ করে ফার্মগেট আসতে আসতে আবিষ্কার করলাম রাস্তা বোঝাই গাড়ি। রীতিমতো জ্যামে পড়ে গেলাম আমরা। সিএনজি আর নড়েচড়ে না। সময় কাটাতে সত্যজিত্ ভাই প্রস্তাব দিলেন গান গাওয়ার। আমারও মনে হলো এই বিশেষ দিনে একটু গান-বাজনা তো লাগেই। সুমন ভাই খুব এক্সাইটেড। গলা খাকারি দিয়ে তিনিই

 

প্রথম শুরু করলেন গান, ‘যেতে যেতে পথে পূর্ণিমা রাতে চাঁদ উঠেছিল গগনে, হেই হেই। দেখা হয়েছিল তোমাতে আমাতে কী জানি কোন মহা লগনে, শালা চাঁদ উঠেছিল গগনে...।’ গান শুনে ড্রাইভার রেগে-মেগে ফায়ার। পারে তো তার সিএনজি থেকেই আমাদের বের করে দেয়। বহু অনুনয়-বিনয় করে, ড্রাইভার সাহেবের পিঠ হাতিয়ে, ঠান্ডা লেবুর শরবত খাইয়ে শান্ত করতে হয়েছে। বাকি জার্নিতে কারো মুখে কোনো কথা নেই। মাঝে দু-একবার সুমন ভাই গুনগুন শুরু করলেও সত্যজিত্ ভাইয়ের কনুইয়ের গুঁতাতে তা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।

দুপুর ৩টার সময় র্যাডিসন ব্লু হোটেলের সামনে গিয়ে ভিড়লাম আমরা। হাত-পা ছুড়ে আড়মোড়া ভেঙে ভাড়া জিজ্ঞেস করতেই ড্রাইভার মুচকি হেসে মিটার দেখালেন, সাড়ে ৩ হাজার টাকা! ভাড়া দেখে হূদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা আমাদের। ভাড়া দেওয়ার সময় আরেকবার হূদযন্ত্র বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো আমার। কেননা সত্যজিত্ ভাই নাকি মানিব্যাগ ভুলে বাসায় রেখে এসেছেন। আর এই বিষয়ে সুমন ভাই তাকে চিমটিও কাটলেন। চোখে পানি চলে এলো আমার। এরে-ওরে কল দিয়ে ধারদেনা করে সিএনজির ভাড়া মেটালাম। তারপর কল দিলাম জুয়েল ভাইকে। জানালাম, ‘আমরা হোটেলের সামনে, আপনে কই?’ তিনি বললেন গেটে গিয়ে তার নাম বলতে। আমরা সারাদিনের কষ্ট ভুলে নাচতে নাচতে এগিয়ে গেলাম র্যাডিসন ব্লু হোটেলের দিকে। গেটে গিয়ে জুয়েল ভাইয়ের নাম বলতেই গেটম্যান একটা খাম হাতে ধরিয়ে দিল। আমরা তিনজন তো মহা খুশি। হোটেলে ঢোকার টিকিট পেয়ে গেছি। ভেতরে ঢুকতেই যাব, গেটম্যান বাধা দিল। বলল, ‘ভেতরে ঢোকা নিষেধ।’ শুনে প্রথমে আকাশ থেকে পড়লাম আমরা, তারপর সাইডে চেপে গেলাম। হুড়মুড় করে খাম খুললাম, ভেতরে একটি চিরকুট। তাতে লেখা, ‘ঠাট্টার এই বিশেষ দিনে আপনাদের সাথে একটু ঠাট্টা করলাম আরকি। যত দ্রুত পারেন শাহবাগের হাকিম চত্বরে চলে আসেন। নাহলে খানাপিনা মিস করবেন।’ চিরকুট পড়ে কিছুক্ষণ লিবার্টি অব স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম আমরা। পেটের ভেতর ডাকাডাকি শুরু হলো। মনে পড়ল, সারাদিনে কিছুই খাইনি কেউ। পকেটে বিশেষ টাকাও নেই। সম্পাদক খাওয়াবেন এই আশা-ভরসায় দু-চার পয়সা যা আছে, তা নিয়ে বিআরটিসির দোতলা বাসে চেপে বসলাম।

শাহবাগের হাকিম চত্বরে কখন গিয়ে পৌঁছালাম তার হিসেব নেই আমাদের। গিয়ে দেখি ঠাট্টার বাকি কন্ট্রিবিউটরদের নিয়ে খাওয়া-দাওয়ার পর্ব শেষ করেছেন জুয়েল ভাই। আমাদের দেখে তিনি বলে উঠলেন, ‘এত লেট কেন আপনারা? খাওয়া-দাওয়া তো মাত্রই শেষ করলাম। আচ্ছা এক কাজ করেন, একটা গান ধরেন। গান যদি ভালো লাগে, তবে আপনাদের ভরপেট কাচ্চি খাওয়াব।’ কাচ্চির কথা শুনে সুমন ভাইয়ের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল। আমাদের দুজনকে পাত্তা না দিয়ে তিনি শুরু করলেন, ‘যেতে যেতে পথে পূর্ণিমা রাতে চাঁদ উঠেছিল গগনে...’। গান শুরু হতেই আমি আর সত্যজিত্ ভাই হাত ধরাধরি করে বাসার পথে রওনা দিলাম। কাচ্চির ‘ক’ও যে কপালে জুটবে না সে আমাদের ঢের জানা! জীবনটা একেবারে ঠাট্টা হয়ে গেল আমাদের!