অয়েজুল হক
আব্দুর রশিদ প্রবীণ মানুষ। মুহসিনের পিতা জাফর, জাফরের পিতা আব্দুর রশিদ। মুহসিন বিয়ে করে তিন ছেলেমেয়ের বাবা হয়েছে। মুহসিনের বাবা বিছানায় শুয়ে শুয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনলেও ১১৭ বছর বয়স নিয়ে আব্দুর রশিদ দিব্যি রাস্তাঘাটে দাপিয়ে বেড়ান।
রশিদ সাহেব অতি প্রবীণ মানুষ হলেও ঠাট্টা প্রিয় মানুষ। মুহসিন তার অন্যতম ঠাট্টা বন্ধু। ঠাট্টা ৫০০ আসছে ভেবে দাদুর কাছে প্রশ্ন করে, ‘তুমি কী জানো, তোমার পছন্দের ‘ঠাট্টা’ নামে একটা ট্যাবলয়েড আছে?’
রশিদ সাহেব হাসেন। কিছু কিছু বুড়ো মানুষের হাসি স্নিগ্ধতা ছড়ায়। বলেন, ‘ট্যাবলেট তো থাকতেই পারে। যে হারে রোগবালাই বাড়ছে তাতে ঠাট্টা নামে ট্যাবলেট থাকারই দরকার। রোগ তো না, পুরাই ঠাট্টা। জীবন নিয়ে ঠাট্টা করছে।’
—দাদু তোমার মুখে রোগবালাই কথাটা মানায় না।
—কেন আমি কী এভারেস্ট। পাহাড়। রোগবালাই ঘিরে ধরে ফিরে যায়?
—হুম। তুমি হলে মানব-এভারেস্ট।
—তাহলে লোকজন খবর দে। সবাই এসে আমার মাথায়, ঘাড়ে, পিঠে পতাকা গেড়ে দিয়ে যাক।
মুহসিন হাসে। তারও ঠাট্টা পছন্দ। বলে, ‘ঠাট্টার ৫০০তম সংখ্যা দিয়ে তোমাকে মুড়িয়ে দেব।’
—যাক, তাহলে তো সোয়েটার গায়ে দেওয়ার ঝামেলা থেকে বেঁচে যাব। কী বলিস?
—আরো বাঁচতে চাও?
—মরতে কে চায়? এ জন্যই তো কবি বলেছেন, মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে।
—তুমি তো কবি না।
—বলিস কী! ব্রিটিশ আমলে আমার ট্রাঙ্ক ভরা কবিতা ছিল। তোরা যে রবীন্দ্রনাথ-নজরুল করিস, এরা তো আমার ছোট ভাইয়ের বয়সী। সেদিনের পোলাপান।
—কই, তোমার কবিতা তো কোনোদিন দেখলাম না।
—দেখবি কীভাবে! ৭১ সালে পাক হানাদার বাহিনী আমার কবিতার ট্রাঙ্ক নিয়ে গেল। ভাগ্যিস বাড়িটা নেয়নি। ৭১ সালের ডিসেম্বরে দেশ স্বাধীন হলো, কিন্তু আর নতুন করে কবিতা লেখা হয়নি। আচ্ছা আমি কী ঠাট্টায় লেখা শুরু করব?
—দাদু, তোমার বয়সী কোনো লেখক পৃথিবীতে আছে বলে মনে হয় না। চেষ্টা করে দেখতে পার। গিনেস বুকে নাম উঠে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।
আব্দুর রশিদ টাক মাথায় হাত বুলিয়ে কবি কবি ভাব নিয়ে বলেন, ‘এই দেখ এখনই একটা শুরু করি—
ঠাট্টা করে ঠাট্টা যে ভাই, যাচ্ছে মানুষ হাসিয়ে
মজার লেখায় সব মানুষের দুঃখ যে দেয় ভাসিয়ে
ঠাট্টা তো এক মাইল ফলক, সামনে রেখে দাঁড়িয়ে
ক’দিন বাদেই স্বমহিমায়, সব যাবে সে ছাড়িয়ে।
মুহসিন কিছুটা অবাক চোখে বৃদ্ধ দাদুর দিকে তাকিয়ে থাকে। ঠাট্টা নিয়ে আলোচনার সময় মনে
পড়ে, পেপারে মাঝেমধ্যেই ঠাট্টা পাওয়া যাচ্ছে না। ইদানীং সেটা ধারাবাহিক হয়েছে। পরপর তিন সপ্তাহ হকার ঠাট্টা গায়েব করেছে। সব আছে ঠাট্টা নেই। ‘নেই কেন’ বললে সহজভাবে জবাব দেয়, ভেতরেই তো ছিল। ৫০০তম সংখ্যা মিস করা যাবে না। ভেতর-বাহির সব একসঙ্গে দেখতে হবে। সঙ্গে হকারের বাটপারিটা। ভোর হতেই নিচে নেমে হকারের অপেক্ষা। হালকা কুয়াশা, হালকা শীত। কুয়াশা মাড়িয়ে পেপার নিয়ে হকার আসে। তাকে জোকারের মতো মনে হয়। যত না শীত, তার চেয়ে ঢের বেশি গায়ের পোশাক। ওজন দিলে দু-তিন কেজি হতে পারে। ভাবে মনে হয় যেন অ্যান্টার্কটিকা থেকে বরফের পাহাড় ডিঙিয়ে এসেছে। পেপার বের করতেই মুহসিন এগিয়ে গিয়ে বলে, ‘আজ হাতে হাতে দাও।’
‘কেন! প্রতিদিন তো গেটের ভেতরে রেখে যাই।’ হকারের কাঁপা গলা। শীতে কাঁপে না ভয়ে কাঁপে বোঝা যায় না।
—বিমানবন্দরে বোর্ডিং গেটে চেক-ইন দেখেছ?
—হু।
—আজ পেপার চেক হবে।
—মানে!
—মানে পেপারের আদ্যোপান্ত চেক হবে।
ঠাট্টা ৫০০ নেই। মুহসিন দরাজ কণ্ঠে বলে, ‘ঠাট্টার ৫০০তম সংখ্যা নেই। অপরাধের শাস্তি হিসেবে ৫০০বার কান ধরে ওঠবস করবে। তারপর ঠাট্টা এনে দেবে। না পারলে ৫০০তলার উপর থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেব।’
—স্যার ৫০০তলা কী দুনিয়ায় আছে?
—না থাকলে না থাক। হেলিকপ্টার তো আছে। ১০০তলার মাপ নিয়ে এর পাঁচ গুণ উপরে গিয়ে হেলিকপ্টার থেকে তোমাকে লাত্থি মেরে ফেলে দেব।
লোকটার চোখমুখ শুকিয়ে আসে। হঠাত্ করে ভোঁ-দৌড়।
মুহসিন সেও ছাড়ার পাত্র নয়। পেছন পেছন দৌড় শুরু করে। শহরের রাস্তা, অলিগলি পেরিয়ে যাচ্ছে হকার আর মুহসিন। কেউ কেউ ভ্রু কুঁচকে তাকায়। কেউ কেউ আজানা কারণে মুহসিনের সাথি হয়। তাদের চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ। কেন দৌড়ায়! চোর হলে চিত্কার করত। দৌড়াতে দৌড়াতে দু-একজন কাঁপা কাঁপা গলায় বলে, ‘ভাই কী হয়েছে?’
মুহসিন শুধু বলে, ‘৫০০ অঙ্কে ঠাট্টা।’
কথার অর্থ কী! অর্থ যাই হোক, সেটা নিশ্চয়ই গুরুতর কিছু। না হলে মানুষ দৌড়াবে কেন! মুহসিন চুপ থাকলেও সঙ্গের মানুষগুলো ছোটদের একসঙ্গে নামতা পড়ার মতো সুর করে চিত্কার দিতে থাকে, ‘৫০০ অঙ্কে ঠাট্টা।’ সময়ের সঙ্গে মানুষ বাড়ে। সবাই সমস্বরে চিত্কার করছে, ‘৫০০ অঙ্কে ঠাট্টা!’ মুহসিনের মন্দ লাগে না। নিজেকে হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালা মনে হয়।
