মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং আমাদের দেশপ্রেম

আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৭:৩০

আরাফাত শাহীন

বাঙালির জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং তাত্পর্যময় ঘটনা হলো একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ। এই একটি সময়ে বাংলার আপামর জনসাধারণ সকল বিভেদ ও অনৈক্যকে পাশ কাটিয়ে একতাবদ্ধ হয়ে দখলদার হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। সে সময় মানুষের সর্বোচ্চ ত্যাগের বিনিময়েই আমরা দীর্ঘ সময়ের যুদ্ধের সমাপ্তি টেনে বিজয় লাভ করতে সক্ষম হই। তাই আমাদের সামগ্রিক জীবনে মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি।

প্রতি বছর ডিসেম্বর মাসে আমরা মহা আড়ম্বরে বিজয় দিবস উদ্যাপন করি। আমরা শ্রদ্ধা নিবেদন করি সকল শহিদের প্রতি। আমরা তাঁদের পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। কারণ, তাঁরা আমাদের একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ উপহার দিয়ে গেছেন। ফলে সে সকল জাতীয় বীরদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা আমাদের অবশ্যকর্তব্যই বটে।

কিন্তু আমাদের কখনো ভুলে গেলে চলবে না—একটি মহান উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে পরিচালিত হয়েছিল আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম। আমাদের যে সকল নেতা একসময় পাকিস্তান গঠন করার জন্য আন্দোলন পরিচালনা করেছিলেন, কিছুদিনের ব্যবধানে তাঁরাই আবার পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ গঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করলেন! আপাতদৃষ্টিতে এই কাজকে কি পরস্পরবিরোধী বলে মনে হয় না! কিন্তু বাস্তবতা ছিল একেবারেই ভিন্ন। যে মহান উদ্দেশ্য নিয়ে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল, পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচার, অনাচার এবং স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাবের কারণে অচিরেই সে আশা-আকাঙ্ক্ষার পরিসমাপ্তি ঘটে। ফলে পাকিস্তান থেকে আমাদের আলাদা হয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে বাঙালির আবেগের ভাষা বাংলার ওপর যে আঘাত হানে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে প্রতিহত করে বাংলার জনসাধারণ। ভাষার ওপর এই আঘাতকে মেনে নিতে পারেনি এদেশের কোনো মানুষই। ফলে বাংলার মানুষ পাশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর মনোভাব সহজেই বুঝে নিতে সক্ষম হয়। ইংরেজ শাসকেরা যেভাবে দখলদার মনোভাব নিয়ে এদেশে শাসনকার্য পরিচালনা করেছিল এতদিন, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীও তেমনই শাসন প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করেছিল। ফলে এদেশের মানুষ অতি দ্রুতই তাদের প্রতি বিরূপ শোষণ করতে শুরু করে এবং পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া অনিবার্য হয়ে পড়ে।

আজকে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশে গর্বভরে চলতে পারছি এবং বিশ্বের বুকে নিজেদের আলাদা জাতি হিসেবে পরিচয় দিতে সক্ষম হচ্ছি। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে যে ভঙ্গুর বাংলাদেশ ছিল আমরা তা অতিক্রম করে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক দিক দিয়ে বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছি। সে সময় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার আমাদের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে অভিহিত করেছিলেন। কিন্তু এখন আর আমরা সেই তলাবিহীন ঝুড়ি হয়ে নেই। আমরা সকল ক্ষেত্রেই  অনেকেই সক্ষমতা অর্জন করেছি এবং প্রযুক্তিগত দিক দিয়েও সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

এতকিছুর পরও একটা ‘কিন্তু’ অবশ্য থেকেই যাচ্ছে। যে দেশপ্রেম নিয়ে আমাদের মহান পূর্বপুরুষেরা একাত্তরে সে সময়ের বিশ্বের অন্যতম বৃহত্ এবং শক্তিশালী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন, আজকে স্বাধীন বাংলাদেশে সেই দেশপ্রেম নামক বিষয়টি আমাদের ভেতর অনুপস্থিত। একজন বিখ্যাত মনীষীকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, দেশপ্রেম কী? জবাবে তিনি বলেছিলেন, নিজের কাজটা সবচেয়ে ভালোভাবে করাই হলো দেশপ্রেম। আমরা কি বুকে হাত দিয়ে এই স্বীকারোক্তি দিতে পারব যে, আমরা নিজের কাজটুকু ঠিকমতো করতে পারছি! সম্ভবত আমরা কেউই এই স্বীকারোক্তি দিতে পারব না।

অনেক স্বপ্ন এবং আশা নিয়ে এই দেশটাকে স্বাধীন করেছিলেন আমাদের পূর্বপুরুষেরা। এই দেশের প্রতিটি কোনায় শহিদের রক্তের দাগ লেগে রয়েছে। আমরা বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান পালন করে বাহ্যিকভাবে তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করি ঠিকই; কিন্তু যে চেতনা নিয়ে তাঁরা বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন, সেই চেতনা থেকে আমরা দূরে সরে এসেছি। স্বাধীন এবং সার্বভৌম বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধের সেই চেতনাকে বুকে লালন করার কোনো বিকল্প নেই। এজন্য আমাদের দেশপ্রেমের শিক্ষা নিতে হবে। আর এক্ষেত্রে মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের হতাশার অন্ধকারে আলোর পথ দেখাতে পারে বলেই মনে করি।

 

 লেখক :শিক্ষার্থী ও কলাম লেখক