নীলাক্ষির কুম

আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৭:৩০

স্বকৃত নোমান

দত্তবাড়ির পেছনে, এখন যেখানে নীলাক্ষির কুম, যুদ্ধের সময় সেখানে ছিল ইপিআর ক্যাম্প। এপ্রিলের এক ভোরে কাঠিমারি ও গগনতলা বিডিআর ক্যাম্প থেকে একদল বাঙালি সেপাই এসে পাঞ্জাবিদের আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয়। পাঞ্জাবিরা চালিয়ে দেয় গুলি। বাঙালিরাও চালায় পাল্টা গুলি। দু’ পক্ষের দেড় ঘণ্টার তুমুল গোলাগুলিতে তিন বাঙালি ও এক পাঞ্জাবি সেপাই ছাড়া নিহত হয় সবাই। বাঙালিরা ভেবেছিল ক্যাম্পটা বুঝি দখলে রাখতে পারবে। পারেনি। পরদিন ট্রেন বোঝাই হয়ে আসে ছাব্বিশ জনের একদল সশস্ত্র পাঞ্জাবি সৈন্য। অধরিয়া স্টেশন থেকে ফায়ার করতে করতে ক্যাম্পে ঢোকে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে পালাতে শুরু করে অধরিয়ার মানুষ। কেউ বনকরার দিকে, কেউ জামগড়ার দিকে আর কেউ মাতারাপুরার দিকে। ভাগিনা সুধনকে বাড়ি পাহারায় রেখে স্বজন-পরিজন নিয়ে অনাদি দত্ত সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ঠাঁই নেন বনকরায় পিসাতো ভাইয়ের বাড়িতে।

দেশ ছাড়লেও দেশের সব খবরই রাখতেন অনাদি। ক’দিন পর খবর আসে, ত্রিপুরার বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয় নিচ্ছে বাঙালি সেনা, পুলিশ ও আনসার সদস্যরা। মেজর হায়দার মাহমুদ পাকিস্তান আর্মি থেকে পালিয়ে ত্রিপুরার মেলাঘয়ে গিয়ে সেক্টর কমান্ডারের কাছ থেকে বুঝে নিয়েছেন অধরিয়া বালেজর দায়িত্ব। অনাদি ছুটে আসেন বাড়িতে। গগনতলা হাইস্কুল মাঠে তখন গাদা বন্দুক দিয়ে শুরু হয়েছে যুদ্ধের ট্রেনিং। যোগ দিয়েছে এলাকার বিস্তর মানুষ। যোগ দিলেন চুয়াল্লিশ বছরের অনাদিও। পাঁচ দিনের ট্রেনিংশেষে চাঁদমারির কুতুব বকশির নেতৃত্বে কুড়িজনের একদল যোদ্ধার সঙ্গে চলে গেলেন ত্রিপুরার হরিণা ক্যাম্পে। দু’দিন থেকে উচ্চতর ট্রেনিংয়ের জন্য চলে যান অম্পিনগর। আটাশ দিনের ট্রেনিংশেষে সহযোদ্ধাদের সঙ্গে যেদিন সমরাঙ্গণের উদ্দেশে যাত্রা করবেন তার আগের দিন বনকরা থেকে খবর আসে, চার দিন ধরে রতন দত্ত শয্যাশায়ী, ভাত-জল কিছুই মুখে নিতে পারছেন না। কী করেন অনাদি? কুতুব বকশি বললেন, আপনি যান, বাবা সুস্থ হলে ফিরবেন। অনাদি ছুটে গেলেন বাবার কাছে। পুত্রের মাথায় হাত রেখে রতন দত্ত বললেন, তুই আমার বড় ছেলে। আমার অবর্তমানে তোকেই ধরতে হবে দত্তপরিবারের হাল। যুদ্ধ বড় নিষ্ঠুর বাবা। কাকে মারে কাকে বাঁচায় তার কোনো ঠিক থাকে না। তুই আমার কাছে থাক। তোর কিছু হলে আমি বাঁচব না।

রোগশয্যায় থাকা বাবার কথা অগ্রাহ্য করতে না পেরে থেকে গেলেন অনাদি। বাবার উন্নত চিকিত্সার জন্য উদয়পুরের ভালো ডাক্তার ডাকেন, ত্রিপুরেশ্বরী মন্দিরে গিয়ে রোগমুক্তির জন্য প্রার্থনা করেন। কোনো লাভ হয় না, বিছানা থেকে উঠতেই পারেন না রতন। প্রায় তিন মাস যমের সঙ্গে লড়ে চিরতরে চোখ বোজেন।

সুধন খবর আনে, রাতের অন্ধকারে অজ্ঞাত শত্রুরা আগুন দিয়ে ছাই করে দিয়েছে দত্তবাড়ির কাচারিঘরটা। কাচারি পোড়ার দু’দিন আগে গভীর রাতে লুট হয়ে গেছে দেবীর পুকুরের সব মাছ। সুধনের সন্দেহ কালাগাজিকে। তার মতিগতি সুবিধার নয়। পাঞ্জাবিদের সঙ্গে তার গোপন ওলামেলার কথা মানুষের মুখে মুখে। পুকুর লুটের আগের দিন বিকেলে গগনতলা বাজারে দেখা পেয়ে সুধনকে সে বলেছিল, সবাই তো ভাগছে, তুমি আছ কেন? হিন্দু মানুষ, তাড়াতাড়ি ভাগো মিয়া। পাঞ্জাবিরা পেলে নুনু তো কাটবেই, গলাটাও কেটে দিতে পারে।

অনাদির ঠিক বিশ্বাস হয় না। কী করে হবে? কালাগাজির বাপ ইসুফগাজি ছিল তাদের লাঠিয়াল বাহিনীর সর্দার। রতন দত্ত খুশি হয়ে শিঙার মাঠে পাঁচ কানি জমি দিয়েছেন, ঈশ্বরী টিলায় দিয়েছেন দেড় কানির বসতভিটা। বাপের মৃত্যুর পর কালাগাজি পায় সর্দারি। পনেরো বছরে কখনো বিশ্বাস ভাঙেনি। সারাজীবন দত্তবাড়ির নিমক খেয়ে যুদ্ধের ফাঁকতালে কিনা শত্রুতা শুরু করল!

অধরিয়া ডাক দেয় অনাদিকে। বাড়ি ফেরার কথা ভাবেন তিনি। কিন্তু এবার অসুস্থ হয়ে পড়ে তার মা। স্বামীর বিরহ বুঝি সইতে পারছিল না। ঢোলের মতো ফুলে যাওয়া পেট নিয়ে তেরো দিন রোগশয্যায় গড়াগড়ি খেয়ে শেষতক স্বামীর পথ ধরল। মায়ের শ্রাদ্ধে অনাদির কেটে যায় পনেরো দিন। সুধন খবর আনে, বকশিবাহিনীর হামলায় পর্যুদস্ত অধরিয়ায় ঘাঁটি গাড়া পাঞ্জাবি সেনারা নীলাক্ষি পার হয়ে পালিয়ে গেছে মধুগঞ্জের দিকে। অধরিয়া এখন শত্রুমুক্ত।

দেরি না করে স্বজন-পরিজন নিয়ে বাড়ি ফেরেন অনাদি। শীত থাকতে থাকতেই পোড়াভিটায় তোলেন নতুন কাচারি। দাপনা বেড়ার চৌচালা টিনের ঘর। দেশটা থিতু হলে পরে দালান তুলবেন। কিন্তু দেশ থিতু হয় হয় করেও হয় না। কী করে হবে? যুদ্ধের বছর দেড়েক পর তো দেখা দেয় নজিরবিহীন খরা। মানুষ যখন বৃষ্টির কথা ভুলতে বসে, হঠাত্ একদিন আকাশ অন্ধকার করে ঘনায় মেঘ। নামে বৃষ্টি, নামে তুফান। নীলাক্ষিতে ঢুকে পড়ে জোয়ারের জল। জোয়ার আর দফায় দফায় উজানি ঢলে ভেসে যায় শস্যক্ষেত্র। নামে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ।

দুর্ভিক্ষের ধকল কাটিয়ে কোমর সোজা করে দাঁড়ায় মানুষজন। মাঠে মাঠে ফলায় সোনার ফসল। শীত চলে যায়, বসন্ত আসে, নববধূর সাজ নেয় কৃষ্ণচূড়া-রাধাচূড়া, গাছে গাছে ওঠে কোকিলের গান। শুরু হয় চাষাবাদের তোড়জোর। নীলাক্ষি থেকে সেলু মেশিনে পানি তুলে দেওয়া হতে থাকে মাঠে মাঠে। শিঙার মাঠে অনাদির প্রায় তেরো দোন জমি বর্গা দেওয়া। বর্গাচাষিরা যখন পানির নালা কাটা শুরু করে তখন বাধা দেয় কালাগাজি। হুঁশিয়ার করে দেয়, এখন থেকে এসব জমির মালিক আমি। বর্গা নিতে হলে আমার কাছ থেকেই নিতে হবে।

সম্পদ কীভাবে রক্ষা করতে হয় তা তো অনাদির জানা। ডাক দিলেন লাঠিয়াল বাহিনী। বিভক্ত হয়ে পড়ে অধরিয়ার লেঠেলরা। এক ভাগ যোগ দেয় কালাগাজির দলে। এতদিনে অনাদি বুঝতে পারেন কালাগাজির বাহুবলের উত্স কোথায়। যুদ্ধের সময় কালাই যে কাচারিঘরে আগুন দিয়েছিল আর দেবীর পুকুরের মাছ লুট করেছিল, অনাদির আর সংশয় থাকে না। শক্তি বাড়াতে তিনি বাঁশবাড়ির লেঠেলদের ভাড়া করেন। কালাগাজিও বসে থাকে না, সে ভাড়া করে মেলাতলির হাঁডুদের। হৈ হৈ রৈ রৈ পড়ে যায় দিকে দিকে। ঠিক দুপুরে লাঠি আর ট্যাঁটা নিয়ে শিঙার মাঠে নামে দু-পক্ষের রক্তপিপাসু লেঠেলরা। প্রথম ধাক্কাতেই নিহত হয় অনাদির দুই লেঠেল। দ্রুত পিছু হটে কালাগাজির দল। কালাকে প্রধান আসামি করে পঁচিশ জনের বিরুদ্ধে থানায় দায়ের হয় হত্যামামলা। গ্রেপ্তার এড়াতে গা ঢাকা দেয় কালা। সহযোগীরাও। শিঙার মাঠে বর্গাচাষিরা পানি দেয়, হাল দিয়ে রোয়া লাগায়, যতনে ফলায় সোনার ধান। কালাকে পুলিশ খোঁজে হন্যে হয়ে, কিন্তু তার ছায়াটিরও দেখা পায় না। তিন মাস পর দুই সহযোগীসহ গোকুলনগরের নীলাক্ষিতীরের এক বেদিনীর ঝুপড়ি থেকে গ্রেপ্তার হয় কালা।

হঠাত্ একদিন রাজাকাটার প্রান্তরে পাওয়া যায় সুধনের বাবা হারাধন ভুঁইয়ার গলাকাটা লাশ। অনাদির বুঝতে দেরি হয় না কার হুকুমে খুন হয়েছে তার ভগ্নিপতি। কিন্তু কালা তো জেলে, কী করে তাকে আসামি করবেন? বোনকে বাদী করিয়ে দায়ের করেন হত্যামামলা। আসামি অজ্ঞাতনামা। সন্দেহের তালিকায় শীর্ষে থাকা কালাগাজির ডানহাত ইনসাফ আলীকে গ্রেপ্তার করে জেলে চালান করে পুলিশ। তিন মাস পর সে বেরিয়ে আসে জামিনে। ক’দিন পর কালাগাজিও। অনাদি ভেবেছিলেন কালার বুঝি শিক্ষা হয়েছে, আর কখনো বুঝি তার বিরুদ্ধে কান নাড়ানোর সাহস করবে না। কিন্তু না, এক বছর দম নেয় কালা। বছর ঘুরে আবার বসন্ত এলে, বর্গাচাষিরা হাল নিয়ে মাঠে নামলে দম ছেড়ে সে আবার মাথাচাড়া দেয়। তার লোকেরা হুমকি-ধমকি দিয়ে জমি থেকে তুলে দেয় চাষিদের। আবার লেঠেল ডাক দিলেন অনাদি। বাঁশবাড়ি থেকে আবার ভাড়া করেন দুর্ধর্ষ সব লেঠেল। কালাগাজি এবার দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে কোমর বাঁধে। মেলাতলির হাঁডুরা তো বটেই, বেতুয়ানির লেঠেলদের একটা অংশও যোগ দেয় তার দলে। আবার শুরু হয় ধুন্ধুমার লড়াই। অনাদির দলের লেঠেল হযরতালির মাথায় প্রচণ্ড কোপ মারে ইনসাফ। দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায় হযরতালির মাথা। একটা খণ্ড ঝুলতে থাকে ঘাড়ের কাছে। ঝুলন্ত খণ্ডটা দু’ হাতে ধরে লুটিয়ে পড়ে হযরতালি। রক্তনেশায় উন্মাদ ইনসাফ এবার চড়াও হয় ছায়দুল মাঝির ওপর। চেনির এক কোপে নামিয়ে দেয় তার ভুঁড়ি।

অনাদি উড়ে গেলেন থানায়। নিহত দুই লেঠেলের ভাই ও বউকে বাদী করিয়ে দায়ের করলেন হত্যামামলা। নিজে বাদী হয়ে সম্পত্তি জবরদখলের চেষ্টার অভিযোগে দায়ের করেন আরেকটি মামলা। তিন মামলারই প্রধান আসামি কালাগাজি। ইনসাফসহ আসামি শতাধিক। গ্রেপ্তার হয় কালা। বহু চেষ্টা করেও এবার আর জামিন পায় না। সে একজন উকিল দাঁড় করালে অনাদি করান তিন জন। সে দুজন দাঁড় করালে অনাদি করান পাঁচ জন। প্রায় চার মাস পর থানা থেকে চার্জশিট গেলে পরে জামিন পায়। মামলা দুই বছর চলার পর কালা ও তার সতেরো সহযোগীর সাত বছর সশ্রম কারাদণ্ডের রায় দেন আদালত। বেকসুর খালাস পায় ইনসাফসহ একুশ আসামি। সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে হারাধন হত্যামামলাটি হয়ে যায় খারিজ।

এবার খুন হয় অনাদির কাকাতো ভাই তারাভূষণ দত্ত। খুন করা হয় সেই একই কায়দায়, গলা কেটে। গোদাবনে পাওয়া যায় তার লাশ। খুনটা কার হুকুমে হয়েছে অনাদির বুঝতে দেরি হয় না। কিন্তু কালা তো এবারও জেলে। কী করে তাকে আসামি করবেন? অজ্ঞাত খুনিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতে তিনি যখন থানায় রওনা দিলেন, তখন বাধা দেয় তারাভূষণের ছোট ভাই অখিল দত্ত। কী লাভ মামলা করে? সাক্ষীর অভাবে ক’দিন পরেই তো খারিজ হয়ে যাবে। তারচেয়ে মারের বদলে মার দিই। তারা আমাদের দুজন মেরেছে, আমরা তাদের দুজনকে মেরে দিলেই খেলা শেষ। জীবনে আর সাহস করবে না।

অখিলের কথা গ্রাহ্য করলেন না অনাদি। পেছন থেকে কাউকে মারার মানুষ নন তিনি। যুদ্ধে লড়ে পুরুষ, গুপ্তহত্যা করে কাপুরুষ। তিনি কাপুরুষ নন। তিনি আইনের আশ্রয় নেবেন। মামলা প্রয়োজনে হাইকোর্ট-সুপ্রিম কোর্টে তুলবেন। ভাতৃবধূকে বাদী করিয়ে দায়ের করেন হত্যামামলা। পুলিশ মামলা নিলেও তদন্তের কোনো উদ্যোগ নেয় না। তদন্তের কথা বললে দারোগা কেবল হাসে। বপু নাচাতে নাচাতে বলে, যে মামলার সাক্ষী-প্রমাণ নাই সে মামলা কদ্দূর যাবে? ক’দিন পরেই তো খারিজ।

অনাদির মনটা এবার বিষিয়ে ওঠে। এত হাঙ্গামা এত রক্তপাত আর ভালো লাগে না। ছোট ভাই অরূপ বলে, আমি বলি কি দাদা, জমিজমা বেচে দিয়ে চলো ওপারে চলে যাই। দেশ স্বাধীন হলে কী হবে, যার নেতৃত্বে দেশটা স্বাধীন হয়েছিল তাকেও তো মেরে ফেলা হলো। আমরা কোন ছার! এদেশে কোনো আশা নাই। হারাধান গেল, তারাভূষণও গেল। ক’দিন পর অখিল যাবে, তারপর নিখিল যাবে, তারপর সুধনও যাবে। একদিন দেখা গেল আমিও বেঘোরে চলে গেলাম। তারপর তুমি। এখনো সময় আছে দাদা, চলো।

ছোট ভাইয়ের প্রতি রাগ ওঠে অনাদির। মানুষ হলো না ভাইটি। ডান পা-টা খাটো বলে খুঁড়িয়ে হাঁটে। তাই বলে বুকটাও খাটো হবে? এতটুকু সাহস থাকবে না? মুরুশির ভিটা ছেড়ে দেশান্তরি হওয়ার কথা সে মুখে আনল কী করে! দেশ তো এখন স্বাধীন। স্বাধীন দেশ থেকে পরাজিতের মতো কেন পালাবেন তিনি? প্রশ্নই আসে না।

বছরখানেক পর হাইকোর্ট থেকে জামিন পায় কালা। একে একে সহযোগীরাও। জেল থেকে বেরিয়ে পাক্কা মুসল্লি হয়ে ওঠে কালা। মানুষজন ভাবে, জেল খেটে কালার মনটা বুঝি ধলা হয়ে গেছে। দত্তদের সঙ্গে আর বুঝি হাঙ্গামায় জড়াবে না। কিন্তু হঠাত্ একদিন অখিল দত্ত নিখোঁজ। রাত ন’টার দিকে দুজন লোক তাকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল। গোটা রাত কেটে যায়, অখিল ফেরে না। পরদিন তার বউকে নিয়ে দুপুরের ট্রেন ধরে অনাদি ছুটে গেলেন থানায়। তার ধারণা, হারাধান ও তারাভূষণের মতো অখিলও খুন হয়েছে। বিকেলের ট্রেনে পুলিশ আসে। গ্রামের মানুষজন দলে দলে ভাগ হয়ে অখিলকে খোঁজে। কোথাও নেই অখিল। পুলিশ কালাগাজিকে খোঁজে। কালা নাকি দু’দিন ধরে শ্বশুরবাড়ি বসন্তপুরে। পুলিশ ইনসাফ আলীকেও খোঁজে। সেও বাড়ি নেই। আগের দিন বিকেলের ট্রেনে ডাক্তার দেখাতে চাঁদমারি গিয়ে নাকি আর ফেরেনি। যেভাবেই হোক অখিলকে খুঁজে বের করার আশ্বাস দিয়ে রাতের ট্রেনে ফিরে যায় পুলিশ। দারোগা হন্যে হয়ে খোঁজে অখিলের লাশ। কালাকে গ্রেপ্তার করলে কোনো না কোনো সূত্র পাওয়া যেত। কিন্তু তাকে গ্রেপ্তার করা যাবে না। ওপরের নিষেধ। কে জানে কাকে ধরেছে কালা। ক্ষমতায় তো এখন এনএন পার্টি। পার্টির নেতা খোদাবক্স নাকি এসপি অফিসে ফোন করে বলেছে অখিল দত্ত নিখোঁজ মামলায় কালাগাজিকে যেন হয়রানি করা না হয়। দারোগার বুঝতে অসুবিধা হয় না, কালাগাজি মানে ইনসাফ আলীও। তাকেও হয়রানি করা যাবে না।

অনাদির হাত দুটো ধরে অরূপ বলে, আর নয় দাদা, অনেক হয়েছে, এবার চলেন।

অনাদি চুপ করে থাকেন। হাত ছাড়িয়ে দিঘির ঘাটের দিকে হাঁটা ধরেন। সারা বিকেল ঘাটে বসে থেকে ঘরে ফেরেন সন্ধ্যায়। একটা কথাও বলেন না কারো সঙ্গে। ভাবেন ওপারের আত্মীয়-স্বজনদের কথা। যুদ্ধের সময় যারা শরণার্থী হিসেবে গিয়েছিল তাদের অনেকে ফেরেনি। কেউ সুন্দরটিলায়, কেউ জামগড়ায়, আর কেউ নিখিলগড়ে বসতি গেড়েছে। তিনি তো প্রায়ই ওপারে যান। আগে তাদের সঙ্গে দেখা হলেই বলতেন, দেশ তো এখন স্বাধীন, চলে আয় তোরা। ইন্ডিয়া কি আমাদের দেশ? বিদেশ-বিভুঁইয়ে পড়ে থেকে কী লাভ? অখিল দত্ত খুন হওয়ার পর তারাই তার কাছে খবর পাঠায়, এখনো সময় আছে বাবু, এপারে চলে আসেন। নইলে একদিন সব হারিয়ে ভিখেরির মতো ঘুরতে হবে পথে পথে। অনাদি এখন বুঝতে পারছেন, তাদের কথা ধরা উচিত ছিল। অরূপ যখন প্রথমবার বলেছিল তখনও যদি চলে যেতেন, তবে অখিলকে হারাতে হতো না। অরূপের কথাই ঠিক, যার নেতৃত্বে দেশটা স্বাধীন হয়েছিল তাকেও তো মেরে ফেলা হলো। আমরা কোন ছার!

বছর ঘুরে আবার বর্ষা আসে। টানা বৃষ্টিপাতে রাক্ষুসীর রূপ নেয় নীলাক্ষি। কাটাখালের চরটা বেচে দিতে জাকের মোড়লের সঙ্গে দেখা করতে সেদিন নীলাক্ষির ওপারে মেলাতলি গিয়েছিলেন অনাদি। ফেরার সময় যখন খেয়াঘাটে পৌঁছলেন রাত তখন প্রায় সাড়ে আটটা। মেঘলা আকাশ। ঘাট পার হয়ে তিনি বেড়িবাঁধের পথ ধরে বাড়ির দিকে হাঁটা ধরেন। যেই না নীলাক্ষির কুমটার কাছাকাছি আসেন, অমনি কুমবাসী অসংখ্য জিনের কোনো এক জিন পেছন থেকে তাকে জোরসে মারে ধাক্কা। জলঘূর্ণির সুড়ঙ্গপথ ধরে উঠে আসা আরেকটা জিন রোমশ হাত বাড়িয়ে তার দুই পা ধরে টেনে নেয় গভীর পাতালে।

 

 লেখক :গল্পকার