বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে মুক্তিযুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতা

আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ২১:৫৬

ক্যাপ্টেন সাহাবুদ্দিন আহমেদ, বীরউত্তম

মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর উদ্বোধন হয় ২৮শে সেপ্টেম্বর ১৯৭১ নাগাল্যান্ডের দিমাপুরে একটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিত্যক্ত রানওয়েতে। উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল প্রতাপ চন্দ্র লাল ও বাংলাদেশের পক্ষে ছিলেন বাংলাদেশ সরকারের সহকারী প্রতিরক্ষা প্রধান গ্রুপ ক্যাপ্টেন আবদুল করিম খন্দকার বীরউত্তম। আমাদের ছিল তিনটি বিমান। তার মধ্যে একটি ছিল ডাকোটা বিমান, যেটা যোধপুরের মহারাজার ব্যক্তিগত বিমান; উনি এই বিমানটিকে উপহার দিয়েছিলেন বাংলাদেশ বিমানবাহিনীকে ভারতীয় বিমান বাহিনীর মাধ্যমে। ভারতীয় বিমান বাহিনী আমাদেরকে দিয়েছিল একটি ফরাসি হেলিকপ্টার নাম অ্যালুভেট-৩ আর একটি কানাডিয়ান বিমান, যার নাম ডিএইচসি-৩ অর্থাত্ এটি অটার বিমান হিসেবে অভিহিত হতো। এই তিনটি বিমানের কোনোটিই যুদ্ধ বিমান ছিল না। আমরা ছিলাম নয় জন বৈমানিক ও ৬০ জন বিমান রক্ষণাবেক্ষণের প্রকৌশলী। যেহেতু আমি পাকিস্তানের ইন্টারন্যাশনাল পাইলট ছিলাম, সেহেতু আমাকে ডাকোটা বিমানের প্রশিক্ষণের জন্য নিয়োজিত করা হয়।

৩রা ডিসেম্বর ১৯৭১ দিনটি নির্ধারণ করা হলো পাকিস্তানিদের ওপর আক্রমণ করার জন্যই ঢাকা ও চট্টগ্রামে। দমদম বিমানবন্দর থেকে সমস্ত বিমান সরিয়ে ফেলা হলো। পরিকল্পনা অনুযায়ী ঢাকা আক্রমণ করা হলো ১২:০১ মিনিটে এবং চট্টগ্রাম ১২:১০ মিনিটে। এই হলো ৩রা ডিসেম্বর ১৯৭১-এর মধ্যরাতে যুদ্ধের সূচনা এবং বাংলাদেশ বিমান বাহিনী এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ে পদার্পণ করল। এরপর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন ১২:২০ মিনিটে। এর পরপরই বিবিসির সংবাদে আমাদের আক্রমণের সংবাদটি প্রচার করা হয় এবং সমগ্র পৃথিবী এই যুদ্ধের খবর সম্পর্কে অবহিত হয়। গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার বীরউত্তম উনার নামের আদ্যাক্ষরের ‘K’ নামের ভিত্তিতে বিমানবাহিনীর অপারেশনগুলোকে কিলোফ্লাইট নামে অভিহিত করা হয়।

৭ই ডিসেম্বর ১৯৭১ গতরাতের আলোচনার প্রেক্ষিতে কাকডাকা ভোর ৬টায় পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী যাত্রা শুরু করি সিলেট বিমানবন্দরের উদ্দেশে। পৌঁছি প্রায় এক ঘণ্টা উড্ডয়নের পর। সঙ্গে ছিলেন ভারতীয় বিমান বাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের  অপারেশন অধিনায়ক গ্রুপ ক্যাপ্টেন চন্দন সিং ও ফ্লাইট লে. সিংলা। সিলেট কন্ট্রোল টাওয়ারের ঠিক সামনে টারমাকে অবতরণের প্রস্তুতিতে ভূমি স্পর্শের প্রাক্কালে পাকিস্তান আর্মি বাংকার থেকে আমাদের ওপর অবিরাম মেশিনগানের গুলি বর্ষণ শুরু করে। প্রত্যুত্তরে আমরাও রকেট ও মেশিনগানের আক্রমণ শুরু করি এবং নিরাপদে কৈলাশহরে ফিরে আসি। এ সময় আমাদের হেলিকপ্টারে ১৫-২০টি বুলেটের আঘাত লাগে। এরপর আমরা আবার শমশেরনগরের উদ্দেশে রওনা হই, সিলেট সম্বন্ধীয় সংবাদগুলো অবহিত করার  উদ্দেশে।

৮ই ডিসেম্বর ১৯৭১ ফ্লাইট লে. সিংলা ও আমি রওনা হই সিলেট শহরের উদ্দেশে সকাল ১১টায়। আমরা সরাসরি সিলেট সার্কিট হাউজে অবস্থিত পাকিস্তান আর্মি হেডকোয়ার্টারের ওপর আক্রমণ পরিচালনা করি ও প্রভূত ক্ষতিসাধন করে নিরাপদে কৈলাশহর ফিরে আসি দুপুর ১২:১৫ মিনিটে। ৮ই ডিসেম্বর ফ্লাইং অফিসার বদরুল আলম এবং আমি পুনরায় সিলেটের উদ্দেশে রওনা হই  সময় বিকাল ৩:৩০ মিনিট। সিলেট শহরের ঠিক দক্ষিণে অবস্থান করছিল একটি বিরাট পাকিস্তান আর্মি কনভয়। আমরা কনভয়টির ওপর তত্ক্ষণাত্ আক্রমণ করি ও প্রভূত ক্ষতিসাধন করে নির্বিঘ্নে ফিরে আসি কৈলাশহরে। পাকিস্তানি কনভয়ের অবস্থান সম্বন্ধে ক্যাপ্টেন আকরাম আহম্মেদ বীরউত্তম ও ক্যাপ্টেন সরফুদ্দিন আহম্মেদ বীরউত্তমকে অবহিত করি এবং সঙ্গে সঙ্গে তারাও ঐ কনভয়টিকে আক্রমণের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। আমরা হেলিকপ্টারে ছিলাম চার জন বৈমানিক। প্রত্যেকটি অভিযানে থাকত দুই জন বৈমানিক ও এক জন মেশিনগান পরিচালনায় গানার ।

৯ই ডিসেম্বর ১৯৭১ সকাল ৮টায় রওনা হলাম শমশেরনগরের উদ্দেশে। সেখানে পৌঁছে ইস্টার্ন কমান্ডের লে. জেনারেল কে ভি কৃষ্ণা রাওকে নিয়ে আমাদেরকে যেতে হবে দরবাস্ত নামের একটি জায়গায়, সেটি ছিল সিলেট শহরের উত্তর-পূর্বে। এখানে অবস্থান করছিল মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী। ব্রাহ্মণবাড়িয়া মুক্ত হয়েছিল ৯ই ডিসেম্বর ১৯৭১। শুধু সামরিক অস্ত্রবলে কোনো দেশকেই স্বাধীন করা যায় না। আমরা যখন পাকিস্তানিদের গতিবিধি লক্ষ্য করছিলাম, ঠিক তখনই নজরে এলো, একটি পাকিস্তানি কনভয় নরসিংদী শহর থেকে যেই স্থানে হেলিকপ্টারে সেনা নামানো হচ্ছিল, সেখানে আক্রমণের জন্যে অগ্রসর হচ্ছে। আমরা সঙ্গে সঙ্গে ওদের ক্ষিপ্রহস্তে আক্রমণ করে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে ফেললাম  আর আমাদের মিত্রবাহিনী নিরাপদে সেনা নামানোর কার্যক্রম নির্বিঘ্নে শেষ করতে পেরেছিল। আমাদের ১৪টি রকেটই ব্যবহার করতে হয়েছিল। একটি পাকিস্তানি বার্তার মাধ্যমে সংবাদ পাওয়া গেল যে তাদের ২১ জন সেনা এই অভিযানে নিহত হয়েছে। অবশেষে পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় এবং নরসিংদী ১২ই ডিসেম্বর ১৯৭১-এ সম্পূর্ণ মুক্ত হয়। ১২ই ডিসেম্বর ১৯৭১ আমাদের বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর আর কোনো যুদ্ধকালীন প্রয়োজনীয়তা ছিল না। এরপর মিত্রবাহিনী এবং মুক্তিবাহিনী চারদিক থেকে ঢাকা শহরকে ঘিরে ফেলে এবং অপেক্ষায় রইল পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের লক্ষ্যে। ১২ই ডিসেম্বর ১৯৭১ এই দিন আমরা অটার বিমানে করে নারায়ণগঞ্জ শহরের ওপর দিয়ে কলকাতার পথে যাত্রা শুরু করি। কলকাতায় অবতরণের পর বিমানবন্দরে মুক্তিবাহিনীর বিমানটিকে দেখার জন্য লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। কেউ বিশ্বাসই করতে পারেনি মুক্তিবাহিনীর কাছে এমন একটি বিমান থাকতে পারে এবং যেটা দিয়ে যুদ্ধ পরিচালনা করা হয়েছে। বাংলাদেশের পতাকাটি এই বিমানে তারকার মতো জ্বলজ্বল করছিল। বাংলাদেশ সরকারের কলকাতার ৮ নম্বর থিয়েটার রোডে অবস্থিত সদর দপ্তরে কর্মকর্তা ও সবার সঙ্গে সাক্ষাত্ হয় এবং আমাদের সাফল্যে তারা আমাদেরকে অভিনন্দন জানান। এই দিনই আমরা একই পথে সন্ধ্যাবেলায় আগরতলায় ফিরে যাই। ১৫ই ডিসেম্বর ১৯৭১ আমাদের কমান্ডার ইন চিফ জেনারেল এম এ জি ওসমানী রাতে আগরতলায় আসেন।

১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ সকাল ৯টায় স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদ ও আমি জেনারেল এম এ জি ওসমানীকে নিয়ে কুমিল্লায় গমন করি। সেখানে অপেক্ষা করতে থাকি পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের জন্য এবং দুপুর বেলায় আমরা আবার আগরতলায় ফিরে যাই। একাত্তরে আমরা অসাম্প্রদায়িক, সুখী, সমৃদ্ধশালী যে বাংলাদেশ আশা করেছিলাম সেই প্রত্যাশায় রইলাম। জাতির এত বড়ো উত্সর্গ কোন দিনই বৃথা যেতে পারে না। মুক্তিযোদ্ধা হতে পেরে এবং মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করতে পেরে নিজেকে গৌরবান্বিত এবং ভাগ্যবান মনে করি। আমরা এরপর রইলাম জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তনের  প্রত্যাশায় পথের দিকে তাকিয়ে। পুনরায় শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি মুক্তিযুদ্ধে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী ও সোভিয়েত রাশিয়ার অবদান যে ঋণ আমরা কোনো দিন শোধ করতে পারব না।

n লেখক :সাবেক বিমান বাহিনীর ক্যাপ্টেন