শিশুর অধিকার হোক সুনিশ্চিত

আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ২১:৫৯

বাংলাদেশে এমন শতাধিক এনজিও প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের সিংহভাগ কার্যক্রমই রাজধানী শহরকে কেন্দ্র করে। এছাড়া মাঠপর্যায়ের সংগঠনগুলোর উপস্থিতি সন্তোষজনক নয়। ফলে প্রত্যেকটি পরিবারের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়া এবং প্রতিটি শিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠাকরত তাদের সঠিক বেড়ে ওঠা অনেক ক্ষেত্রেই সুনিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।

এ কথা স্বীকৃত, গ্রামের তুলনায় শহরে শিশুর সংখ্যা বেশি। তবে আমাদের দেশের গ্রামগুলোতে বেড়ে ওঠা শিশুদের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি শিশু, সে গ্রামে বাস করুক বা শহরে, তার অবশ্যই সঠিকভাবে বেড়ে ওঠার অধিকার রয়েছে। তাছাড়া মিডিয়ার কল্যাণে শহুরে জীবনে শিশু নির্যাতন ও শিশু অধিকার লঙ্ঘনজনিত ঘটনাগুলোর কিছু অংশ প্রায় আমাদের সামনে আসে। কিন্তু গ্রামাঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থার পর্যাপ্ত সম্প্রসারণ না থাকায় সেখানকার শিশু নির্যাতন ও শিশু অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের অজানা থেকে যায়।

বিশেষজ্ঞরা শিশুদের এই পুষ্টিহীনতায় ভুগবার পেছনে বেশ কিছু কারণ দেখছেন। প্রথমত আর্থসামাজিক অসংগতি। বাংলাদেশে গ্রামাঞ্চগুলোতে বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার যেসব জনবসতিগুলোতে এখনো আর্থসামাজিক উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি, যেসব জায়গায় শিশুরা তুলনামূলকভাবে অধিকসংখ্যক হারে পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। এসব এলাকার অধিকাংশ মানুষই গরিব। তারা কৃষিকাজ ও দিনমজুরি করে জীবন নির্বাহ করে থাকে। তাদের সন্তান সংখ্যাও দুয়ের অধিক হয়ে থাকে। ফলে অল্প আয় দিয়ে সকলের জন্য পুষ্টিকর খাদ্যের জোগান দেওয়া সম্ভব হয় না। সমাজব্যবস্থার উন্নয়ন, ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি ও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো উদ্যোগগুলো এ সমস্যা সমাধানে সক্ষম। এছাড়া পরিবারের আর্থিক সংগতির প্রতি লক্ষ্য রেখে কম সংখ্যক সন্তান জন্ম দেওয়া জরুরি।

শিশুদের পুষ্টিহীনতার পেছনে আরেকটি জোরালো কারণ হলো বাবা-মায়ের অসচেতনতা। গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ বাবা-মাই অক্ষরজ্ঞানহীন। তাদের খাদ্যের পুষ্টিমানের ব্যাপারে না আছে কোনো সচেতনতা, না আছে কোনো ধারণা। অধিকাংশ বাবা-মায়েরা এখনো জানেন না সুষম খাদ্য কী এবং এর প্রয়োজনীয়তাইবা কী। তারা মনে করেন, সকল পুষ্টি কেবল দামি দামি খাবারে রয়েছে। আর সুস্বাস্থ্য মানে হচ্ছে শরীরে একগাদা মাংস থাকা। তাদের এসব বদ্ধমূল ধারণার নীরব বলি হচ্ছে শিশুরা। তাদেরকে প্রতিনিয়ত বঞ্চিত করা হচ্ছে সুষম খাদ্যগ্রহণ থেকে। ফলে ব্যাহত হচ্ছে শিশুদের শারীরিক বিকাশ। এমন অবস্থায়, বাবা-মায়েদের মাঝে খাদ্যে পুষ্টিমান এবং শিশুদের জন্য সুষম খাদ্যগ্রহণের গুরুত্বের ওপর সচেতনতা সৃষ্টির বিকল্প নেই। তাদের বুঝাতে হবে যে, শুধু মাছ-মাংস-দুধ-ডিম খেলেই হবে না, পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণ সবুজ শাকসবজি, ফলমূলও খাওয়াতে হবে। এছাড়া পর্যাপ্ত পানি পানের কোনো বিকল্প নেই। মায়েরা সন্তাদের চাল, ডাল ও বিভিন্ন শাকসবজি দিয়ে রান্না করা খিচুড়ি জাতীয় সম্পূরক খাবার খাওয়ানো প্রতি গুরুত্ব দিতে পারেন। এ জাতীয় খাবার একদিকে যেমন সুস্বাদু অন্য দিকে সুষমও।

কেবল শিশুদের জন্য পুষ্টিকর খাদ্যের জোগান দিয়ে আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। তাদের সঠিক লালন পালন করে রাষ্ট্র ও সমাজের কল্যাণ একজন সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি তাদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করা ও সঠিক সময়ে সঠিক চিকিত্সাসেবার আওতায় নিয়ে আসা অত্যাবশ্যক।

পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস ও সুচিকিত্সা প্রাপ্তির পাশাপাশি প্রত্যেকটি শিশুর সুশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার অধিকার রয়েছে। শিক্ষা প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার। বিশ্বায়নের এই যুগে শিক্ষিত ও কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন মানব সম্পদই একটি দেশের উন্নয়নের মূল হাতিয়ার। আর তাই প্রত্যেকটি শিশুকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে রাষ্ট্রের সত্ ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

শিশুদের জন্য পুষ্টিকর খাদ্য, সুচিকিত্সা ও শিক্ষার মতো মৌলিক এবং অত্যাবশ্যকীয় অধিকারসমূহ সুনিশ্চিত করা ব্যতীত তাদের সঠিক বিকাশ সম্ভব নয়। তাই একবিংশ শতাব্দীর এই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে হলে আমাদের শিশুদের সুশিক্ষিত করে রাষ্ট্রের সম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়