আব্দুর রউফ রিপন
অবশেষে স্বাধীনতার ৪৮ বছর পর নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার মিরাট ইউনিয়নের আতাইকুলা পালপাড়া গ্রামের ১০ বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা সমমান মর্যাদা পেলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সমান সকল সুযোগ-সুবিধা পেতে যাচ্ছেন স্বামী, সন্তান ও সম্ভ্রম হারানো এই বীরাঙ্গনারা। তবে এই ১০ বীরাঙ্গনার মধ্যে চার জন পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। আর বয়সের ভারে নুয়ে পড়ে বেঁচে আছেন আর ছয় বীরাঙ্গনা। সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় একটি গেজেটের মাধ্যমে তাদের নাম প্রকাশ করেন। এতে করে বর্তমান সরকার ৪৮ বছরের লালন করা দীর্ঘদিনের একটি স্বপ্ন বাস্তবায়ন করল বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
বানী রানী পাল, ক্ষান্ত রানী পাল, রেনু বালা ও সুষমা সূত্রধর রোগে আক্রান্ত হয়ে অভাব-অনটনের সংসারে উন্নত চিকিত্সার অভাবে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। আর বয়সের ভারে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে কোনোমতে বেঁচে আছেন মায়া রানী সূত্রধর, রাশমনি সূত্রধর, সন্ধ্যা রানী পাল, কালীদাসী পাল, সন্ধ্যা রানী ও গীতা রানী পাল। একাত্তরের সেই দুর্বিষহ যন্ত্রণা ও সামাজিক বঞ্চনার পাশাপাশি অনেকটা দুঃখ-দুর্দশা, অভাব-অনটন আর অসুস্থতার মধ্যেই চলছে তাদের জীবন-সংগ্রাম।
রাণীনগর উপজেলা সদর থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে নওগাঁর ছোটো যমুনা নদীর তীরে ছায়ায় ঘেরা শান্ত আতাইকুলা পালপাড়া গ্রাম। ১৯৭১ সালের ২৫ এপ্রিল পাক হানাদার বাহিনীর স্থানীয় দোসর রাজাকার ও আলবদরদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ছটা পর্যন্ত নির্যাতন চালায় এই পালপাড়া গ্রামের সনাতন ধর্মের মানুষদের ওপর। এই সময় গণহত্যা, নারী নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ, লুটপাটসহ জঘন্য ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে সংখ্যালঘু পরিবারের কিশোর, যুবক, মাঝবয়সি ও বিভিন্ন বয়সি নারীদেরকে ধরে ঐ গ্রামের সুরেশ্বর পালের বাড়ির বারান্দায় একত্রিত করে ‘জয়বাংলা বলতে হ্যায় নৌকামে ভোট দিতে হ্যায়’ এভাবে পাকসেনারা ব্যঙ্গোক্তি করতে করতে ব্রাশফায়ার করে গোবিন্দ চরণ পাল, সুরেশ্বর পাল, বিক্ষয় সূত্রধর, নিবারণ পালসহ ৫২ জন মুক্তিকামী জনতাকে নির্বিচারে হত্যা করে। এ সময় পাক হানদার বাহিনী গণহত্যা, লুটপাট ও নারী নির্যাতনের মতো ধ্বংসলীলা থেকে বিশেষ করে নারীরা স্বামী-সন্তানদেরকে প্রাণে বাঁচানোর শেষ আকুতিটুকু করলেও পাক-জান্তাদের মন তা গলাতে পারেনি। উলটো পাক-জান্তারা সুযোগ বুঝে নারীদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালিয়ে নওগাঁ জেলা শহরের উদ্দেশ্যে চলে যায়। ৫২ শহিদের তাজা রক্তে সেদিন নওগাঁর ছোটো যমুনা নদীর পানি লাল হয়ে ভেসে যায়। নির্যাতিত নারী ও স্বজনদের হূদয়বিদারক আর্তনাদ ও কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল।
চোখের জল ফেলতে ফেলতে বীরাঙ্গনা কালী দাসী পাল (৭৫) বলেন, ঐদিন সকালে যখন আমাদের গ্রামে পাঞ্জাবি আসে তখন আমার স্বামীসহ বাড়ির দরজা লাগিয়ে আত্মগোপনের চেষ্টা করি। কিন্তু স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় গেটের দরজা ভেঙে আমার স্বামীকে টেনে-হিঁচড়ে পাঞ্জাবিরা রাইফেল দিয়ে মারতে মারতে যোগেন্দ্রনাথের বারান্দায় ফেলে রাখে। স্বামীর প্রাণভিক্ষা চাইতে গিয়ে আমার কথা না শুনে চোখের সামনে আমার স্বামীসহ ৫২ জনকে হত্যা করে উলটো আমার ওপরও তারা নানা কায়দায় নির্যাতন চালায়। আমার এক ছেলে আছে। অভাবের সংসারে সে দিন-মজুরের কাজ করে। আমিও পেটের তাগিদে কখনো ধান কুড়িয়ে, বয়লারের চাতালে কাজ করে, কিংবা অন্যের জমিতে শ্রমিকের কাজ করে দুমুঠো ডাল-ভাত খেয়ে কোনোমতে বেঁচে আছি। ভেবেছিলাম বেঁচে থাকতে আর মনে হয় স্বীকৃতি পাব না। তবে অবশেষে এই স্বীকৃতি পেয়ে আমি অনেক খুশি। এই সরকারকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।
বীরাঙ্গনা সন্ধ্যা রানী পাল (৭০) বলেন, ঐদিন সকাল নয়টার দিকে পাঞ্জাবিরা আমার স্বামী বাড়িতে কাজ করা অবস্থায় সুরেশ্বর পালের বাড়িতে ধরে নিয়ে লাইন করে রাখে। এদিকে পাঞ্জাবিরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে লুটপাট ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগসহ নানা ধরনের নির্যাতন চালায়। আমি ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে পাশের বাড়ির এক বড়ো মাটির ডাবরের ভেতর আশ্রয় নেই। বাচ্চার কান্না পাঞ্জাবিরা শুনতে পেয়ে আমাকে সেখান থেকে বের হওয়ার কথা বলে। তখন আমি পালিয়ে মাঠের মধ্যে দৌড়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকবাহিনীরা এই গ্রামের মেয়েদের সঙ্গে অনেক খারাপ আচরণ করেছে। আমাদেরকে অবশেষে বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অনেক ধন্যবাদ। স্বামী হারানোর পর থেকে ৪৮টি বছর অভাব-অনটনের মধ্যে জীবন কাটালাম। তাই স্বীকৃতির পাশাপাশি সকল সুযোগ-সুবিধা যদি দ্রুত আমাদেরকে দেওয়া হতো তাহলে যে কদিন বাঁচি তা ভোগ করে যেতে পারতাম।
রাণীনগর উপজেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার অ্যাডভোকেট ইসমাইল হোসেন বলেন, অনেক চেষ্টার পর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার অবশেষে আতাইকুলা গ্রামের ১০ বীরাঙ্গনাকে স্বীকৃতি প্রদানের লক্ষ্যে নাম গেজেটভুক্ত করেছেন। এই স্বীকৃতিপ্রাপ্তির সকল প্রক্রিয়া এরই মধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে। বরাদ্দ এলেই আগামী বিজয় দিবসে অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হবে বলে আমি আশা করছি।
নওগাঁ-৬ (আত্রাই-রাণীনগর) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. ইসরাফিল আলম বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযোদ্ধা, শহিদ পরিবার ও বীরাঙ্গনাদের ব্যাপারে অত্যন্ত আন্তরিক। এর আগে আমি চেষ্টা নামক একটি এনজিওর পক্ষ থেকে এই বীরাঙ্গনাদের গরু ও ছাগল দিয়েছি। এছাড়াও বিভিন্ন সংগঠন তাদেরকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে এসেছে। অবশেষে আমাদের সবার অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে আতাইকুলা পালপাড়া গ্রামের এই বীরাঙ্গনারা মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদা পেয়েছে। এটি আমাদের অনেক বড়ো একটি সফলতা। আমার খুবই ভালো লাগছে। অবশেষে যে কজন বীরাঙ্গনা এখনো বেঁচে আছেন তারা অন্তত তাদের ন্যায্য প্রাপ্যটুকু একটু হলেও ভোগ করে ও স্বীকৃতির মুকুট মাথায় নিয়ে সমাজে বেঁচে থাকতে পারবেন।
