সমৃদ্ধ দেশ গড়ার অঙ্গীকার আওয়ামী লীগের ইশতেহারে

আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০১৮, ২২:২৯

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’ শিরোনামে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে আওয়ামী লীগ। দলটির সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক হোটেল সোনারগাঁওয়ে এ ইশতেহার ঘোষণা করেন। ইশতেহারে দুই ধরনের কৌশলগত পরিকল্পনার আওতায় বাংলাদেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত করে বঙ্গবন্ধু এবং লাখো শহীদের স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য ৩৩টি ক্ষেত্রের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এবারের ইশতেহারে আওয়ামী লীগের ২১ দফা বিশেষ অঙ্গীকার এসেছে, তার শুরুতেই রয়েছে প্রতিটি গ্রামে আধুনিক নাগরিক সুবিধা পৌঁছে দেওয়া এবং যুবসমাজকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি।

সকাল ১০টায় জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় আওয়ামী লীগের ইশতেহার প্রকাশের অনুষ্ঠান। শুরুতেই আওয়ামী লীগের শাসনামলের উন্নয়ন নিয়ে একটি তথ্যচিত্র দেখানো হয়। ইশতেহার ঘোষণা করতে অনুষ্ঠানের মঞ্চে এসে শেখ হাসিনা প্রথমেই স্মরণ করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চার নেতা, আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশকে। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের ত্রিশ লাখ শহীদ, দুই লাখ নির্যাতিত নারী, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট নিহত বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদেরও স্মরণ করেন তিনি।

ক্ষমতাসীন দলটির এবারের ইশতেহারে গুরুত্ব পেয়েছে তরুণ প্রজন্ম এবং গ্রামের উন্নয়ন। প্রতিটি গ্রামে আধুনিক নগর সুবিধা নিশ্চিতকরণ, তরুণ-যুবসমাজকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা। এছাড়া দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করার অঙ্গীকার করেছে আওয়ামী লীগ। ইশতেহারে নারীর ক্ষমতা, লিঙ্গসমতা ও শিশুকল্যাণ নিশ্চিতের কথা বলা হয়েছে। আগামী পাঁচবছরে দলটি পদ্মা সেতু, ঢাকায় মেট্রোরেলসহ বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্প দ্রুত ও মানসম্মত বাস্তবায়ন করতে চায়। ঢাকা ও বিভাগীয় শহরের মধ্যে বুলেট ট্রেন চালু করাসহ দেশে আর একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। গণতন্ত্র ও আইনের শাসন সুদৃঢ় করা, দারিদ্র্য নির্মূল, সব স্তরে শিক্ষার মান বৃদ্ধি, সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তা, সার্বিক উন্নয়নে ডিজিটাল প্রযুক্তির অধিকতর ব্যবহার এবং ‘ফাইভ-জি’ চালু, বিদ্যুত্ ও জ্বালানি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা সম্প্রসারণের অঙ্গীকার করেছে আওয়ামী লীগ। এছাড়া রয়েছে দক্ষ ও সেবামুখী জনপ্রশাসন, জনবান্ধব আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, নিরাপদ সড়কের নিশ্চয়তা, ব্লু-ইকোনমি তথা সমুদ্র উন্নয়ন করার অঙ্গীকার।

টানা দশ বছর ক্ষমতায় থেকে বাংলাদেশকে উন্নয়নের মহাসড়কে তোলার পর এখন তরুণ প্রজন্মকে নেতৃত্বে সম্পৃক্ত করে সেই পথে অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি এসেছে আওয়ামী লীগের ইশতেহারে। দলটির সভানেত্রী বলেন, টানা তৃতীয়বারের মতো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার সুযোগ পেলে তার দল ‘টেকসই বিনিয়োগ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন’ নিশ্চিত করবে। এটাই তাদের এবারের অঙ্গীকার।

বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা পাবেন যারা: ইশতেহার ঘোষণাকালে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচিত হয়ে আওয়ামী লীগ আবারও সরকার গঠন করলে ১ বছরের নিচে ও ৬৫ বছরের উপরে সকল নাগরিককে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হবে। সকল বিভাগীয় শহরে মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন এবং কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে ভবন নির্মাণসহ সকল সুবিধা পর্যায়ক্রমে আধুনিকীকরণ করা হবে।

সংখ্যালঘু কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি: আওয়ামী লীগের ইশতেহারে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার নিশ্চিত করতে জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া দেশের ক্ষুদ্র নৃ-জনগোষ্ঠী এবং দলিত ও চা-বাগান শ্রমিকের সন্তানদের জন্য ‘বিশেষ ব্যবস্থা’র কথা বলা হয়েছে। সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র নৃ-জাতিগোষ্ঠীর প্রতি বিদ্যমান বৈষম্যমূলক সকল আইন ও অন্যান্য অন্যায় ব্যবস্থাপনার বন্ধে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। এছাড়া ইশতেহারে সংখ্যালঘু হিন্দুদের সম্পত্তি নিয়ে চলা সকল বিবাদ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করতে অর্পিত সম্পত্তি সংশোধনী আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে।

গ্রামকে শহরে রূপান্তর করার অঙ্গীকার:একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে দেশের প্রতিটি গ্রামকে আধুনিক নগর সুবিধা দিয়ে ‘আমার গ্রাম-আমার শহর’ হিসেবে গড়ে তুলবে আওয়ামী লীগ। ইশতেহারে বিশেষ অঙ্গীকারে বলা হয়েছে, প্রতিটি গ্রামে আধুনিক নগর সুবিধা সম্প্রসারণ করা হবে। বর্তমান সরকার প্রতিটি গ্রামকে শহরে উন্নীত করার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে। ইশতেহারে আরও বলা হয়, গ্রাম পর্যায়ে কৃষিযন্ত্র, সেবাকেন্দ্র, ওয়ার্কশপ স্থাপন করে যন্ত্রপাতি মেরামতসহ গ্রামীণ যান্ত্রিকায়ন সেবা সম্প্রসারণ করা হবে এবং এসবের মাধ্যমে গ্রামীণ যুবক ও কৃষি উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে উত্পাদনশীল কর্মসংস্থান করা হবে। অকৃষি খাতের এসব সেবার পাশাপাশি হাল্কা যন্ত্রপাতি তৈরি ও বাজারজাত করতে বেসরকারি খাতের প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ সুবিধাসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া হবে।

সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানো হবে: ইশতেহারে বলা হয়েছে, তরুণ-যুবসমাজকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা প্রদান করা হবে। সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর বিষয়ে মেধা ও দক্ষতা বিবেচনায় রেখে বাস্তবতার নিরিখে যুক্তিসঙ্গত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ইশতেহারে প্রায় ৫ কোটি ৩০ লাখ তরুণের উদ্দেশে বলা হয়েছে, ২০২৩ সাল নাগাদ অতিরিক্ত ১ কোটি ২৮ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছে। এছাড়া ওই সময়ে নতুনভাবে ১ কোটি ১০ লাখ ৯০ হাজার মানুষ শ্রমশক্তিতে যুক্ত হবে। তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির জন্য প্রণয়ন করা হবে একটি যুগোপযোগী ‘তরুণ উদ্যোক্তা নীতি’। এছাড়া তরুণদের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবণতা ও আত্মকর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে বিনা জামানতে ও সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা আরও বিস্তৃত করা হবে।

লিখিত ইশতেহারে বলা হয়, ‘আমরা বিভেদ, হানাহানি, জ্বালাও-পোড়াও, অগ্নিসন্ত্রাস, অবরোধ, বিশৃঙ্খলার রাজনীতি চাই না। চাই গণতান্ত্রিক পরিবেশে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। এ নির্বাচনে আমরা জাতীয় ঐক্যমতের ভিত্তিতে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছি।’

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের নির্বাচনী  ইশতেহার প্রণয়ন উপ-কমিটির আহ্বায়ক ড. আব্দুর রাজ্জাক। এ সময় সিনিয়র আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ, ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক মিশনের প্রধান, কূটনীতিকবৃন্দ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, শিক্ষক, প্রকৌশলী, বুদ্ধিজীবী, তরুণ সমাজের প্রতিনিধি, দেশি-বিদেশি সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি- পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।