‘টেলিভিশনের সঙ্গে ইউটিউবের তুলনা করাটা অযৌক্তিক’

আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৯:৪৫

ছোটবেলা থেকেই সাংস্কৃতিক আবহে বেড়ে ওঠা তার। এরপর ২০০৬ সালে লাক্স-চ্যানেল আই সুপারস্টার প্রতিযোগিতার বিজয়ীর মুকুট মাথায় নিয়ে শোবিজে পা রাখেন। তিনি মডেল, অভিনেত্রী ও নৃত্যশিল্পী জাকিয়া বারী মম। নিজের প্রথম চলচ্চিত্র ‘দারুচিনি দ্বীপ’-এ অভিনয় করে অর্জন করে নেন শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। মডেলিং, নাটক, বিজ্ঞাপন, চলচ্চিত্র—সব অঙ্গনেই নিজের প্রতিভার দ্যুতি ছড়িয়েছেন। সাম্প্রতিক কাজ, ব্যস্ততা ও সমসাময়িক বিষয়ে কথা বললেন এই লাক্সতারকা। তাকে নিয়ে লিখেছেন ইমরুল নূর

অনেক সংকটের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের নাটক। মূল সংকট কী আর এখন পর্যন্ত এর কতটুকু সমাধান করতে পেরেছি আমরা?

দেখেন, বাংলাদেশের বয়স এখনো পঞ্চাশ হয়নি। তারপরও যে আমাদের এতকিছু আছে, সে জন্য দেশের প্রতি শুকরিয়া জানানো উচিত। পৃথিবীর কোনো দেশই বাংলাদেশের মতো এত অল্প সময়ে এতটা উন্নতি করেনি। তাই আমাদেরও অনেক কিছু বুঝতে হবে। আমরা কতটা যোগ্য হয়ে এসেছি এই যোগ্য ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করার জন্য, বেঁচে থাকার জন্য? প্রতিদিন নিজেকে একবার হলেও এ প্রশ্ন করা উচিত। আর্ট মানে সাধনা। এটার জন্য তো সময় দিতে হবে। গঠনমূলক কিছু করতে হবে। এতে মেধা খাটাতে হয়, শ্রম দিতে হয়। 

অনেক সময় দেখা যায়, আপনার অভিনয় ও ইমেজে ভর করে একটা সাধারণ গল্পের নাটকও উতরে যাচ্ছে। এটাকে কী বলবেন?

উতরে যাওয়া শব্দটার সঙ্গে আমি আসলে কমফোর্টেবল না। আসলে উতরে যাওয়ার কিছু নেই। হয় ভালো, নয় খারাপ। আমি আমার কথা যদি বলি, গুড কিংবা বেস্ট না; আমার চেষ্টা থাকে নিজের কাজকে ‘এক্সিলেন্ট’-এর দিকে নিয়ে যাওয়ার। কোয়ান্টিটিকে কখনো গুরুত্বপূর্ণ কিছু মনে করিনি, কোয়ালিটিটা আমার কাছে খুব এবং খুব গুরুত্বপূর্ণ।

নাটকে গল্পের মান অনেক ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ। এ ব্যাপারে একজন অভিনয়শিল্পী হিসেবে নিজেদের দায়বদ্ধতা কতটুকু আছে বলে মনে করেন?

আসলে নাটকের মান মাপার কি কোনো যন্ত্র আছে, যেটা দিয়ে মাপতে পারব কোন নাটকটি মানসম্পন্ন, কোনটি মানহীন। সবার সবকিছু ভালো লাগবে, এমন কথা নেই। কারও ভালো লাগবে, কারও খারাপ লাগবে। আমি দায়িত্ব নিয়ে আমার কাজটা ঠিকমতো করে যেতে চাই। অভিনেতা শব্দটার অনেক ওজন। এত ওজনের এই শব্দটা যেন নিজে নামের আগে যথাযথভাবে বসাতে পারি, সেই চেষ্টা করে যাচ্ছি।

নাটকের ভ্যারিয়েশন নিয়ে অনেকেই ভিন্নমত পোষণ করেন। নাটকে ভ্যারিয়েশন আনাটা কী খুব কঠিন?

ভ্যারিয়েশন কথাটা যে আসে, আমাদের দেশের মতো এত বড়ো নাটকের ইন্ডাস্ট্রি আর কোথায় আছে? নেই তো। আমাদের নাটকের ইন্ডাস্ট্রিতে এত পরিমাণ টাকা লগ্নি হয়, এই লেবেলের প্রতিযোগিতা হয়, দর্শকের এত আগ্রহ থাকে, এত জীবনধর্মী কাজ হয়, এত এক্সপেরিমেন্টাল কাজ হয়—এ রকম আর কোথায় আছে? আমার মনে হয়, আর কোথাও এমনটা হয় না। পাশের দেশে দেখুন, সেখানে কিন্তু সিরিয়াল মানে শুধুই সিরিয়াল। সেখানে কিন্তু একক নাটক, টেলিছবি বা কমপ্লিট গল্প হচ্ছে না। আমাদের দেশে প্রচুর কাজ হয়। প্রচুর কাজ যখন হয়, তখন কিছু ভালো হবে, কিছু খারাপ হবে—এটাই স্বাভাবিক। আমাদের বেশিরভাগ শিল্পীরই কিন্তু অভিনয় নিয়ে কোনো স্কুলিং নেই। আমরা গুরুমুখী বিদ্যাটা শিখেছি। সিনিয়রদের থেকে, বই পড়ে, ইউটিউব দেখে, ইন্টারভিউ দেখে শিখছি, কাজ করছি। আমরা যে মিনিমাম লজিস্টিকের মধ্যে অভিনয় করি এবং সে অভিনয়কে দর্শকরা এত অ্যাপ্রিশিয়েট করে, বলিউড অভিনেত্রী দীপিকা পাড়ুকোনও হয়তো এটা কল্পনাও করতে পারবে না। 

এখন ইউটিউব চ্যানেলের জন্যও আলাদাভাবে নাটক নির্মাণ করা হচ্ছে। টেলিভিশন চ্যানেলের নাটকগুলোও ইউটিউবে দেওয়ার পর প্রচুর দর্শক পাচ্ছে। আপনার কী মনে হয় এমন দিন আসবে যখন দর্শক আর টেলিভিশনে নাটকই দেখবে না?

যখন অনলাইন পোর্টাল এলো, তখন অনেকেই বলেছিল যে প্রিন্ট পত্রিকা আর চলবে না। আবার যখন হোম ডেলিভারি সিস্টেম চালু হলো, তখন সবাই খুব ক্রেজি হয়ে গেছি। যখন তখন এটা-সেটা অর্ডার করছি। একটু অন্যধরনের এক্সাইটমেন্ট তৈরি হয়েছে, কিন্তু এর জন্য কি কখনো বাসায় ভাত রান্না বন্ধ হয়েছে? হয়নি তো। টেলিভিশনের যে টিআরপি বক্স, সেগুলো যথেষ্ট পরিমাণে বসানো আছে কি না আমার জানা নেই। ইউটিউবে কোন কন্টেন্ট কত ভিউ হলো, সেটা সবাই দেখতে পারে কিন্তু টেলিভিশনে কোন নাটক কত মিলিয়ন ভিউ হলো, সেটা তো কেউ দেখতে পারছে না। কারো কাছে এটার কোনো জরিপ নেই। আর সেটা না থাকায় ইউটিউবের এই ভিউটা সবার কাছে খুবই মুখ্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু টেলিভিশনের ভিউ দেখার তো কোনো প্রপার সিস্টেম নেই। সেটা যেহেতু নেই, তাহলে কোন মাপকাঠিতে আমরা বিচার করি যে টেলিভিশন থেকে ইউটিউব এগিয়ে? এটা তো অন্যায়। একটি ভালো বাজেটের কাজের সঙ্গে অপেক্ষাকৃত কম বাজেটের কাজ তুলনা করা ঘোরতর অন্যায়। যেই নাটকটা টেলিভিশনে প্রচারের পর সেটা আবার ইউটিউবে দেওয়া হচ্ছে, সেখানে প্রচুর ভিউ হচ্ছে। তার মানে কি টেলিভিশনে ভিউ হচ্ছে না? সে জন্য মাপকাঠিটাকে এক করতে হবে, তারপর মাপতে হবে? এই প্রসেসটাকে আমার অন্যায় মনে হয়। আসলে টেলিভিশন ও ইউটিউবের ভিউ তুলনা করাটা অযৌক্তিক। সবাই টেলিভিশন চ্যানেলকে এখন অবজ্ঞা করে যাচ্ছে আর টেলিভিশন চ্যানেলও এখন অনেকটা দায়হীন হয়ে পড়েছে। দায়িত্বহীনতা অনেক বড়ো অন্যায়।