মিয়াজান কবীর
১৯৭১ সাল। পঁচিশে মার্চ পাকিস্তানি বাহিনী ঘুমন্ত বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সারাদেশে নির্বিচারে চালায় গণহত্যা। পঁচিশে মার্চ রাতে হানাদার বাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে বীর বাঙালি প্রতিরোধ গড়ে তোলে। বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্সের কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দও সংগ্রামী ছাত্র-জনতার সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে এবং সারাদেশে ব্যারিকেড দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ভারী অস্ত্রের মুখে প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে। তখন ফায়ার কর্মীরা অনেকেই আত্মগোপন করেন।
পাকিস্তানি সামরিক সরকার বাংলাদেশের গণহত্যাকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতে থাকে। বিদেশি সাংবাদিকরা যাতে গণহত্যার সংবাদ বাংলাদেশের বাইরে পাঠাতে না পারে সেদিকে কড়া নজর রাখে। বিশ্ববাসীর কাছে দেশের অভ্যন্তরের অবস্থা স্বাভাবিক রয়েছে—এ চিত্র তুলে ধরতেই ফুটবল খেলার নামে কূটকৌশল অবলম্বন করে।
বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। এ কথা চিন্তা-ভাবনা করে বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ফুটবল টিমকে খেলার জন্য প্রস্তাব দেয়। ফায়ার সার্ভিসের খেলোয়াড়রা পাকিস্তানের সামরিক সরকারের এই কূটকৌশল বুঝতে পেরে খেলা থেকে বিরত থাকেন। তবে জীবনের নিরাপত্তার কথা ভেবে অনেকে আত্মগোপন করেন এবং ভারতের সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় চলে যান। সেখানে গিয়ে রাজা বীরেন্দ্র ফুটবল ক্লাবে আশ্রয় গ্রহণ করেন।
সিতাংশু বিকাশ পাল ছিলেন ফায়ার সার্ভিস একাদশ ফুটবল দলের একজন তুখোড় গোল কিপার। তিনিও দেশের পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে ভারতের ত্রিপুরার আগরতলায় চলে যান। সেখানে গিয়ে স্থানীয় পত্রিকায় বাংলাদেশ (পূর্ব পাকিস্তান) থেকে যেসব ফুটবল খেলোয়াড় আগরতলায় অবস্থান করছেন, তাদেরকে ‘রাজা বীরেন্দ্র ফুটবল ক্লাব’-এর ঠিকানায় যোগাযোগ করতে অনুরোধ জানান। পত্রিকায় এ সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর বাংলাদেশ থেকে শরণার্থী ফুটবল খেলোয়াড়রা সিতাংশু বিকাশ পাল, আইনুল হক ও সুভাষ চন্দ্র সাহার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আর এদিকে সিতাংশু বিকাশ পাল, সুভাষ চন্দ্র সাহা ও আইনুল হক বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ মিজানুর রহমান চৌধুরী ও আব্দুল কুদ্দুস মাখনের সঙ্গে দেখা করেন। এবং একটি ফুটবল দল গঠন করার প্রস্তাব রাখেন। এই বিশিষ্ট দুই রাজনীতিবিদ এদের প্রস্তাবকে সাদরে গ্রহণ করেন। এরপর ফায়ার ব্রিগেডের অপ্রতিদ্বন্দ্বী গোল কিপার সিতাংশু বিকাশ পালের নেতৃত্বে ত্রিপুরার আগরতলায় বাংলাদেশের প্রায় তেত্রিশ জন খেলোয়াড় একত্রিত হন। এবং ‘জয় বাংলা একাদশ ফুটবল দল’ নামে একটি ফুটবল দল গঠন করেন। ত্রিপুরা স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশনের জেনারেল সেক্রেটারি তাপস চক্রবর্তী ও রাজা বীরেন্দ্র ফুটবল ক্লাবের জেনারেল সেক্রেটারি বীরেন্দ্র কুমার বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের বীরেন্দ্র ফুটবল ক্লাবে নিরাপদ আশ্রয় ও থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। এই তেত্রিশ জন ফুটবল খেলোয়াড়ের নামে বিনামূল্যে রেশনের ব্যবস্থা করেন। ত্রিপুরা ক্রীড়া সংস্থার কর্তৃপক্ষ তাদের দলের সঙ্গে একটি প্রদর্শনী ম্যাচ খেলার জন্য প্রস্তাব করেন। সেই প্রস্তাব অনুযায়ী দুই দলের মধ্যে খেলার আয়োজন করা হয়।
ত্রিপুরার কেবিনেট সচিব প্রশান্ত মুখার্জির সঙ্গে সিতাংশু বিকাশ পাল সাক্ষাত করেন। প্রশান্ত মুখার্জি ছিলেন বীরেন্দ্র ক্লাবের সভাপতি। তিনি আগরতলা রেডিওতে সিতাংশু বিকাশ পালের একটি সাক্ষাত্কারের ব্যবস্থা করেন। সাক্ষাত্কারটি আগরতলার বেতার কেন্দ্রে প্রচারিত হয় এবং এই খেলার খবর জাতীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত হয়। এই সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সহ-অধিনায়ক প্রতাপ শংকর হাজরা, বাংলাদেশ ক্রীড়া সংস্থার জেনারেল সেক্রেটারি লুত্ফর রহমান, কোষাধ্যক্ষ মোহসিন আলী ত্রিপুরায় চলে যান। সেখানে গিয়ে ত্রিপুরা একাদশ ফুটবল দলের সঙ্গে দেখা করেন। এবং ‘জয় বাংলা একাদশ ফুটবল দল’-এর খেলোয়াড়দের কলকাতায় ফিরে যাওয়ার কথা বলেন। তখন ত্রিপুরা ক্রীড়া সংস্থার কর্তৃপক্ষ প্রদর্শনী ম্যাচ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ত্রিপুরায় থাকার জন্য অনুরোধ জানান। তখন ‘জয় বাংলা একাদশ ফুটবল দল’ ত্রিপুরা একাদশ ফুটবল দলের সঙ্গে আসাম রাইফেলস গ্রাউন্ডে (পুলিশ বাহিনীর মাঠ) ১৯৭১ সালের ৫ জুলাই একটি প্রদর্শনী ম্যাচ খেলায় অংশগ্রহণ করে। পরে উমাকান্ত স্টেডিয়ামে খেলা হয়। এই খেলার ধারা বিবরণী স্থানীয় পত্র-পত্রিকায় ও রেডিওতে প্রচারিত হয়। দেশ-বিদেশে এই খেলার খবর ছড়িয়ে পড়লে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। এই খেলায় অংশগ্রহণ করেন জয় বাংলা একাদশ ফুটবল দলের খেলোয়াড় : সিতাংশু বিকাশ পাল (ফায়ার সার্ভিস একাদশ) আইনুল হক (মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব), সুভাষ চন্দ্র সাহা (বিজিপ্রেস স্পোর্টিং ক্লাব), প্রতাপ শংকর হাজরা (মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব) কায়কোবাদ (মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব), বিমল কান্তি (পিডব্লিউডি), নীহাররঞ্জন দাশ (আজাদ স্পোর্টিং ক্লাব), অমল সাহা (বিজিপ্রেস), মন্টু দাশ (আজাদ স্পোর্টিং ক্লাব), নওশের আলী (ভিক্টোরিয়া ক্লাব), এনায়েত হোসেন (ভিক্টোরিয়া ক্লাব)। জয় বাংলা একাদশ ফুটবল দলের খেলোয়াড়দের জার্সি, ব্যুট ও অন্যান্য খেলার সামগ্রী সরবরাহ করেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ মিজানুর রহমান চৌধুরী।
জয় বাংলা একাদশ অপ্রতিরোধ্য গতিতে ত্রিপুরা একাদশকে কোণঠাসা করে ফেলে। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের খেলোয়াড়গণ বিদেশ-বিভূঁইয়ে মানসিক অস্থিরতায় ভুগছিলেন এবং খেলোয়াড়দের মধ্যে অনেকে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণে নিয়োজিত ছিলেন। ফলে এই অস্থির সময়ে ভালো খেলেও ত্রিপুরা একাদশ দলের কাছে ২-১ গোলে হেরে যায়। এই প্রদর্শনী ম্যাচ ক্রীড়ামোদী মানুষের কাছে আজও স্মরণীয় হয়ে রয়েছে। খেলা শেষে বাংলাদেশের খেলোয়াড়গণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশমতো কলকাতায় চলে যান। তারপর ‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল’ সাংগঠনিকভাবে প্রতিষ্ঠা ও দৃঢ়তা লাভ করে। জয় বাংলা একাদশ ফুটবল দল ত্রিপুরায় একটি প্রদর্শনী ম্যাচে খেলেই ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে। এই জয় বাংলা একাদশ ফুটবল দল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের পাতায় এক অম্লান অধ্যায়।
