রেজাউল করিম খোকন
ব্যাংকিং সেক্টরের একটি বড়ো শক্তি মধ্যবিত্ত শ্রেণি ও তরুণ প্রজন্ম। গ্রামকে বাদ রেখে এই শ্রেণিকে সাময়িকভাবে উন্নয়নের আওতায় আনা যাবে না। এ জন্য তাদের ফিন্যানশিয়াল সিস্টেমে আনতে হবে। এর জন্য সহজ ও আধুনিক পদ্ধতি হচ্ছে এজেন্ট ব্যাংকিং। গ্রামে এখনো এমন অনেক মানুষ আছে, যারা বাড়িতে টাকা রাখে। প্রয়োজনের সময় তারা বাড়িতে রাখা সেই টাকা থেকে খরচ করে। তারা ব্যাংকে টাকা রাখার কথা চিন্তাও করতে পারেন না। এই শ্রেণির মানুষকে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনার প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। অধিকাংশ ব্যাংক যারা এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করেছে তাদের কর্মকাণ্ড বেশির ভাগই গ্রামীণ এলাকায়।
ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলে টাকা রাখলে যে মুনাফা পাওয়া যায় সেটিই তারা জানত না। বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশি যারা পরিবার-পরিজন ও নিকটাত্মীয়ের কাছে রেমিট্যান্সের অর্থ পাঠায়। সেই অর্থ তাদের পরিবারের লোকজন আগে ঘরে রেখে দিত। কিন্তু এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের কারণে তারা এখন ফিক্সড ডিপোজিট মানে স্থায়ী আমানত রাখতে পারছে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য, আবার ক্ষুদ্র সঞ্চয় প্রকল্পে টাকা জমাতে পারছে। এতে মুনাফা থেকে তাদের বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। আবার এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আউটলেট থেকে ব্যবসায়ীদের ঋণ বিতরণ করা হচ্ছে। ফলে এটা বিনিয়োগ হয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছে।
এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটে শুধু ডিপোজিট গ্রহণ করাই নয়, ঋণ বিতরণ, মোবাইল টপ-আপ, বিভিন্ন ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, রেমিট্যান্সের অর্থ বিতরণ এবং যানবাহনের লাইসেন্স ও ফিটনেস ফি গ্রহণ ইত্যাদি সেবা দেওয়া হয়। এছাড়া এখানে এটিএম থেকে টাকা উত্তোলনে ডেবিট কার্ডের সুবিধাও নিতে পারেন গ্রাহক। রয়েছে ইন্টারনেট ব্যাংকিং সুবিধাও। এসব সুবিধা দিতে প্রতিটি গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সিস্টেমে সংযুক্ত করা হয়। অর্থাত্ এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের গ্রাহকরা এজেন্ট পয়েন্টের সেবার পাশাপাশি ব্যাংক শাখা ও এটিএমের সুবিধাও নিতে পারছেন।
বর্তমান আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাংকের শাখা স্থাপন এবং পরিচালনা ব্যয়বহুল হওয়ায় এজেন্ট ব্যাংকিং একটি সময়োপযোগী বাস্তবসম্মত মাধ্যমে। একজন এজেন্ট যোগ্যতা থাকা সাপেক্ষে সেন্টার স্থাপনের মাধ্যমে সহজেই ব্যাংকিং সেবা প্রদান করতে পারছে বিধায় দিনদিন এজেন্ট ব্যাংকিং ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করছে এবং কর্মসংস্থানের একটি দারুণ সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
আমরা যত বেশি সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে পারব, তত বেশি আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন সংঘটিত হবে। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে ব্যাংককে তৃণমূল পর্যায়ে গ্রাহকের কাছে সেবা প্রদানের জন্য যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। এজেন্ট ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি বা আর্থিক সাক্ষরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি অল্প বয়সি ছোটো ছোটো শিক্ষার্থীদের স্কুল ব্যাংকিং হিসাব খোলার মাধ্যমে সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।
কৃষি খাতের বিশাল জনগোষ্ঠী এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আওতায় মৌলিক ব্যাংকিং সেবা গ্রহণের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে উপকৃত হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একজন নিরক্ষর কৃষক সহজেই আঙ্গুলের ছাপের মাধ্যমে ব্যাংকিং কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারছেন এবং সামগ্রিকভাবে পেমেন্ট সিস্টেমের আওতায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারছেন। এর ফলে দেশের যে কোনো স্থানে অর্থ লেনদেন, স্থানান্তর ও বৈদেশিক রেমিট্যান্সের টাকা উত্তোলন করতে পারছেন। এছাড়া ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এজেন্ট ব্যাংকিং সেন্টারের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত এই জনগোষ্ঠীর কাছে সহজ শর্তে ক্ষুদ্র ও কৃষি ঋণ প্রদান করতে পারছেন এবং সহজে ঋণের কিস্তির টাকা আদায় করতে পারছেন।
এজেন্ট ব্যাংকিং ব্যবস্থা সাধারণভাবে ব্যাংকিং সুবিধাবঞ্চিত জনগণ, দরিদ্র জনগণ, গ্রামীণ মহিলা, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী এবং সামাজিকভাবে অবহেলিত জনগোষ্ঠীর জন্য সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ৮৫ শতাংশেরও বেশি আউটলেট গ্রামাঞ্চলে অবস্থিত। ফলে এসব জনগোষ্ঠী তাদের দোরগোড়ায় ব্যাংকিং সেবা পাওয়ার কারণে তাদের মধ্যে সঞ্চয়ের প্রবণতা যেমন বেড়েছে, তেমনি এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ঋণ-সুবিধা পাওয়ার কারণে আর্থসামাজিক অবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হচ্ছে। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের কারণে প্রত্যন্ত এলাকায় নতুন গ্রাহক তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে, যার ফলে একদিকে যেমন ব্যাংকের আয় বাড়ছে, তেমনি কমছে পরিচালন ব্যয়।
বিশাল জনগোষ্ঠী এখনো প্রচলিত ব্যাংকিং সেবার বাইরে রয়েছে। তাদের প্রচলিত শাখাভিত্তিক ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনা বেশ দুরূহ কাজ। কাজেই আমাদের দেশের অনেকগুলো ব্যাংক, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দ্রুত ও স্বল্প বিনিয়োগ করে ব্যাংকিং সুবিধাবঞ্চিতদের কাছে ব্যাংকিং সেবা প্রদান করার কার্যক্রম শুরু করেছে। যার মাধ্যমে বিশাল জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং চ্যানেলে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে তাদের সঞ্চয়কে অর্থনীতির মূলস্রোতে নিয়ে আসা সম্ভব হচ্ছে এবং যা জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে সারাদেশে বিভিন্ন ব্যাংকের ১০ হাজারের মতো শাখা রয়েছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই এখনো দেশের একটি বৃহত্ জনগোষ্ঠী ব্যাংকিং সেবার আওতার বাইরে রয়ে গেছে। বাংলাদেশের ৬৮ হাজার গ্রাম। কিন্তু আমাদের সরকারি ব্যাংকের বেশ কিছু শাখা প্রত্যন্ত গ্রামে থাকলেও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর অধিকাংশ শাখা শহরকেন্দ্রিক। এর কারণ ফিন্যানশিয়াল লিটারেসির অভাব। তবে বিষয়গুলো নিয়ে সরকার ভাবছে, পদক্ষেপ ও উদ্যোগ নিচ্ছে। পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে দিনে দিনে। যার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ, এজেন্ট ব্যাংকিং। একজন মানুষ রাজধানী ঢাকায় বসে ব্যাংকের যে সেবাটি পেতে পারে, প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন কৃষকও সে সেবা নিতে পারছেন গ্রামে থেকেও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে।
এজেন্ট ব্যাংকিং বিকাশের ফলেই গ্রামের মানুষের মধ্যে আর্থিক সমৃদ্ধি ও স্বয়ংম্ভরতা ত্বরান্বিত হচ্ছে। আরেকটি বড়ো বিষয় হলো— এখন বাংলাদেশের বেশির ভাগ এলাকা বিদ্যুতায়নের আওতায় চলে এসেছে। ৫০ শতাংশের মতো মানুষ গ্যাস সংযোগের আওতায় রয়েছে গ্রামের একজন কৃষককে বিদ্যুত্ বিল জমা দেওয়ার জন্য দূরের ব্যাংক শাখায় যেতে হতো অনেক পথ পাড়ি দিয়ে। এতে তার ভাড়া লাগতো, সময় নষ্ট হতো, পরিশ্রমও হতো। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ফলে তার আগের অনেক কষ্ট লাঘব হয়েছে। আবার বিদেশে চাকরিরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা বাড়িতে মাসে মাসে যে টাকা পাঠাচ্ছেন তা গ্রামে বসেই তার আপনজনরা পেয়ে যাচ্ছে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সুবাদে।
ছবি: ইন্টারনেট
