/ শামসুল হক শামস্
রিয়াজ ভাই আমার পাড়াতো বড়ো ভাই। বেশ নাদুসনুদুস ভদ্র চেহারা। সব সময় মানুষের উপকার করতে চায়, মানুষের সঙ্গে মিশতে চায়। কিন্তু কথায় আছে না, মানুষ চায় এক আর পায় আরেক। রিয়াজ ভাইয়ের বেলায় এ কথাটা নিরানব্বইভাগ সত্য। তিনি চাইলেও কারো সঙ্গে মিশতে পারেন না। জোর-জবরদস্তি করে মিশলেও সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে পারেন না। সে জন্য তার জীবনের কোনো প্রেমই নিজের করতে পারেনি, অন্যের হয়ে গেছে। কিন্তু কী সেই কারণ, তা তিনি নিজেই আবিষ্কার করে ফেলেছেন। কারণটা হলো তিনি স্পষ্টভাষী মানুষ, সব সময় উচিত কথা মুখের উপর বলে ফেলেন। কখনো ইনিয়ে-বিনিয়ে মিষ্টি ভাষায় কথা বলতে পারেন না। তার কথায় রস নেই কষ নেই। এই জন্য তার বউ খোটা দিয়ে বলে তার কথায় নাকি ‘টেস’ (টেস্ট) নেই। এ নিয়ে ভাবির সঙ্গে তুলকালাম কাণ্ড লেগেই থাকে। গত সপ্তাহে খেলার মাঠে আমাকে দেখে রিয়াজ ভাই কয়েক কদম এগিয়ে এলো। মনটা খারাপ। জিজ্ঞাসা করলাম, ‘রিয়াজ ভাই, নতুন বিয়ে করেছেন অথচ মনমরা কেন?’ তিনি বললেন, ‘কী আর বলব ভাই। তা ছাড়া সে কথা আমি বলতেও চাই না। কারণ, এসব প্রাইভেট কথা যাকে বলছি, সেই আমার সঙ্গে পল্টি নিছে।’ আমি বললাম, ‘বুঝলাম না ভাই। একটু যদি বুঝিয়ে বলতেন।’ তিনি বললেন, ‘শোন, যখন প্রেম করতাম, তখন টুকটাক ঝামেলা হলে থার্ডপারসন হিসেবে মিলিয়ে দিতে আসা বন্ধুটাই আমার গার্লফ্রেন্ডকে ডাইভার্ট করে নিজের বউ করে ফেলেছে। এমন ঘটনা একটি নয়, দুটি নয়, তিন বা ততোধিক। এখন বিয়ে করার পরও আমি যেখানে দুশ্চিন্তায়, হতাশায় দিনাতিপাত করছি, সেখানে তুমি বলছ প্রাইভেট কথা শেয়ার করতে। আচ্ছা ঠিক আছে। তুমি অবশ্য উল্টাপাল্টা করার মানুষ না, সে বিশ্বাস আমার আছে।’ আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভঙ্গিতে মাথা নাড়ালাম। রিয়াজ ভাই বললেন, ‘তোমার ভাবি বলল আঁতুড়ঘরে আমার দাদি-নানি নাকি আমার মুখে মধু বা চিনিজাতীয় কিছু দেয় নাই। সে জন্য আমার মুখের ভাষায় মিষ্টি না, কর্কশ। এখন তুমিই বলো ভাই, এ ঝামেলা থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?’ বিষয়টা আমি আঁচ করে রিয়াজ ভাইকে একটা টিপস দিয়ে সেদিনের মতো বিদায় দিলাম।
গতকাল রিয়াজ ভাইকে ভাবিসহ দেখলাম শপিং
মলে। জি হ্যাঁ, জ্যান্টস শোরুমে। ভাবি নিজে পছন্দ করে শার্ট, প্যান্ট, বেল্ট ভাইকে কিনে দিচ্ছে। সন্ধ্যায় রিয়াজ ভাই আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। হাতে একটা প্যাকেট। প্যাকেটটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘তোমার জন্য একটা টুপি কিনলাম এই নাও।’ আমি ধন্যবাদ জানিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আগে বলেন আপনার সমস্যা দূর হয়েছে কি না?’ রিয়াজ ভাই বললেন, ‘দূর মানে, আটলান্টিকের ওপারে চলে গেছে। তোমার কথামতো, সেদিন থেকে তোমার ভাবির সঙ্গে প্রতি বাক্যে মিষ্টি জুড়ে দিয়েছি, তাতেই হয়ে গেছে। প্রথমে শুরু করেছিলাম এভাবে, মিতা তুমি খুব মিষ্টি মেয়ে, তোমার বাবা মিষ্টি, তোমার মা মিষ্টি, তোমার ভাই মিষ্টি, তোমার বোন মিষ্টি তোমাদের পুরো বাসাটাই মিষ্টির গোডাউন। অবশ্য তার বোনকে মিষ্টি বলাতে সামান্য চোখ রাঙিয়ে ছিল। এখন তরকারিতে ঝাল হলেও হা-হু করে চোখের পানি সংবরণ করে বলি, মিতা একটু পানি দাও তরকারি মিষ্টি হয়ে গেছে।’
দুই
যেখানে অনুষ্ঠান সেখানেই শাহজাহান ভাই। যেখানে মাইক্রোফোন সেখানেই শাহজাহান ভাই। শাহজাহান ভাই মিষ্টি ভাষায় কথা বলতে পারেন। এটাও কম যোগ্যতা না। আমি বলি কী, যার শ্রোতা আছে, সে তো কথা বলবেই। একদিন বড়োভাইদের আড্ডায় যখন মিষ্টি নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছিল, তখন মামুন ভাইয়ের প্রশ্নের উত্তরে শাহজাহান ভাই আঞ্চলিক ভাষায় বলতে শুরু করলেন, ‘আমি মিষ্টিপাগল মানুষ। কারণে অকারণে মিষ্টি খাইতে পছন্দ করি। আসলে হইছে কী, আমার বাবা তো দলিল লেখক। লোকজনের যত জমি বেচাকেনা হয় ততই মিষ্টি খাওনের ধুম পইড়া যায়। হেই সুবাদে আমাদের ঘরে সব সময় মিষ্টি থাকতই। ছুডোকাল থাইক্যা মিষ্টি খাইয়া অভ্যাস হইছে, এহন যেইহানে মিষ্টি দেহি, টুপ কইরা খায়া ফেলি।’ চপল ভাই জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আচ্ছা শাহজাহান, মিষ্টি নিয়ে তোমার কী কোনো মজার ঘটনা আছে?’ শাহজাহান ভাই বললেন, ‘আছে না মানে। মিষ্টি নিয়া কত তিতা তিতা ঘটনা আছে।’ এবার শাহাজাদা ভাই মুখ খুললেন। তিনি শাহজাহান ভাইকে বললেন, ‘বন্ধু, বল শুনি তোমার মিষ্টি নিয়া কিছু তিতা কাহিনি।’ শাহজাহান ভাই বলতে শুরু করলেন, ‘আমি পরিকল্পনা করলাম দেশের যত প্রসিদ্ধ মিষ্টি আছে, সবকয়ডার স্বাদ নিবাম। প্রথমে কুমিল্লার রসমালাই দিয়েই শুরু করি। গেলাম কুমিল্লার প্রসিদ্ধ দোকান মাতৃভান্ডারে। ম্যানেজারকে কইলাম, ভাই, আমি তো কিশোরগঞ্জ থাইকা আইছি। আপনাদের দোকানের অনেক নাম ডাক হুনছি। আজকে আইছি রসমালাই কিনতে। আমি কারখানার ভিতরে একটু দেখতাম চাই। অনুমতি পাইয়া পিছনে গিয়া দেখি সারি সারি রসমালাই ভর্তি গামলা। দেইখ্যা জিব্বার পানি কোন সময় মাটিতে পইড়া গেল বুঝতেই পারি নাই। লোভ হইল খুব। পাশেই আছিন একটা বড় মগ, ডাইনে বামে একটু দেইখ্যা রসমলাইয়ের গামলায় দিলাম মগ ডুবাইয়া। কেও দেহনের আগেই গপাগপ মাইরা দিলাম দুই মগ। মিনিমাম কেজি দুয়েক তো অইবোই। ঠোঁট মুখ চাইট্যা চুইট্যা খাইয়া সামনে আইস্যা কয়েক কেজি কিনলাম। পরে গাড়িতে আওনের সময় পুরা শরীরে এমুন গরম ধরছে, খুলতে খুলতে সেইদিন প্যান্ট ছাড়া বাকি সবকিছুই খুলতে অইছিল।’ g
