গানের একাল-সেকাল

আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২:১১

রোকসানা সুইটি

আমরা যারা ২০০০ সালের আগে জন্ম নিয়েছি সেই সময়ের গানের কথাগুলো ছিল অন্যরকম আবেগি অনুভবের,  ভালো লাগা এবং হূদয় ছুঁয়ে যেত। গান শুনে মনটা ভরে যেত। নেশার মতো কাজ করত ভালো লাগা গানগুলো। একেকটা গান হাজারবার শুনলেও মনের ক্ষুধা মিটানো যেত না। তখনকার অসখ্য গান এখনো আকৃষ্ট করে আমাদের। এখনো নিজের অজান্তেই গুন গুন করে গেয়ে উঠি সেই গানের কলিগুলো।

বর্তমান যুগের গানের কথা ও সুর এখন অনেক আধুনিক হয়ে গেছে। এখানে আবেগ প্রকাশের ধরনটাও ভিন্ন। এখন তারা বলে, ‘চলে গেছো তাতে কী, নতুন একটা পেয়েছি, তোমার থেকে আরো সুন্দরী... বাহ্ কী দারুণ। আমাদের সময় হলে বলত... যেও না সাথী!’ অথবা তোমাকে হারাতে যদি হয়, লাগে মনে এই ভয়!

আরো কত-শত বিরহের গান যে তখন হয়ে যেত, তার শেষ নেই। ওরা তো হারানোর ভয়ও করে না। নতুন একটা পেয়েছে, তাও আবার আরো সুন্দরী তাতেই তারা মহাখুশি। বাহ্ বাহ্! তারা বাধাও দেয় না যেতে। অপরাধী গান সম্পর্কে বলতে গেলে শেষ হবে না। কত রকম অপরাধী যে হয় এ গানটা ভাইরাল হওয়ার পর বুঝলাম। কেউই বলে না আমি অপরাধী। আর আমাদের সময়ের গানে বলা হতো...

যদি ভুল করে ভুল করে থাকি ক্ষমা করো আমায়! অথবা আমি কষ্ট পেতে ভালোবাসি, তাই তোমার কাছে ছুটে আসি! এখনকার জনপ্রিয় গান তুমি হাতটা শুধু ধরো আমি হব না আর কারো। আর আমি বলব, তুমি হাতটা শুধু ছাড়ো, সে হয়ে যাবে অন্য কারো বেশি সময় লাগবে নাকো।

কী আর করব আমরা অতি আধুনিক হচ্ছি! গান একটা মানুষের মন ভালো করে দিতে পারে। একটা গান পারে আমাদের ফেলে আসা অতীত মনে করিয়ে দিতে। গানের কথাগুলোর মাঝে আমরা অনেক হারানো মধুময় স্মৃতি মনে করে হারিয়ে যাই সুরের মূর্ছনায়। গানের কথাগুলো এতটা ধারালো যে মুহূর্তেই আমাদের মনটা বদলে দিতে পারে। গান হলো মনের খোরাক। সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে গাওয়া দেশের গানগুলোর কথা এবং সুর এত ভালো লাগে, আবেগ জড়িয়ে কণ্ঠের জাদুতে যেন হারিয়ে যাই। দেশের প্রতি যে মমত্ববোধ কাজ করে তা যেন মায়ের প্রতি ভালোবাসার মতোই।

মান্না দের একেকটা গান আমার কাছে মহামূল্যবান। রেঁনেসা, সুবীর নন্দী, কুমার বিশ্বজিত্, আইয়ুব বাচ্চু, জেমস—যেসব গান গেয়েছেন আমরা এখনো তা শুনি। বর্তমানে যেসব ব্যান্ড আছে, তারা কী গায় আর কী     বোঝাতে চায়, আমি তা বুঝতে পারি না। শুধু তাদের বাদ্যযন্ত্রের ভয়ার্ত চিত্কার আর লাফানো ছাড়া আর কিছুই বুঝতে পারার উপায় নেই।

ইদানীং পুরোনো দিনের গানগুলোকে কেমন যেন উদ্ভট সুরে গেয়ে যায় কিছু গায়ক-গায়িকা। তা শুনে মনে হয় যেন কিশমিশ মনে করে এলাচে কামড় দিলে যা হয়, ঠিক তেমনটাই লাগে। আরেকটা ব্যাপার খেয়াল করেছি, এখনকার কিছু নতুন শিল্পী আছেন কণ্ঠও ভালো তারা আমাদের পুরোনো গানগুলোকে নতুন সুরে গাইছেন। তাদের মতো করে। বড়োই আজব শোনা যায় এসব গান তখন।

গান গাওয়া যেন কোনো ব্যাপারই নয় বর্তমান সময়ে। কোনো চর্চা নেই, সাধনা নেই, শুধু গাইলেই যেন হয়ে গেল। কেউ কেউ আছেন, উনারা নিজেই গান লিখেন, নিজের মতো করে সুর করেন, আবার সেই গান  নিজেই গান। অথচ একজন গায়ক, গায়িকা, সুরকার, গানের লেখক—সবকিছু নিয়েই তো তৈরি হয় মনের মতো একেকটি গান। তারা কতটা সম্মানিত তাদের সেই সব গান দিয়ে, তা আমরা তাদের মৃত্যুর পরও অনুধাবন করতে পারি। এমন অনেক শিল্পী আছেন, যারা মৃত্যুর পরও আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন, তাদের গানের মাধ্যমে। রুনা লায়লার মতো করে বলা যায়, ‘শিল্পী হয়ে তোমাদেরই মাঝে চিরদিন আমি রবো...’

একজন মানুষ চিরদিন বেঁচে থাকবে না—এটাই স্রষ্টার নিয়ম। তবে তার সৃষ্টি চির দিন বেঁচে থাকবে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।

n লেখক : সাবেক শিক্ষার্থী, নোয়াখালী

সরকারি মহিলা কলেজ