বাঘারপাড়ার বিকেল

আপডেট : ২২ ডিসেম্বর ২০১৯, ২০:৫৩

মোফরাদ হোসেন অলিন্দ

 

ব্যস্ততার বাড়-বাড়ন্তে বুকের বায়ুথলি থেকে নিঃসৃত বায়ু যখন উচ্ছ্বাসের উপাদান টেনে বের করে নেয় তখন উল্লাস উবে গিয়ে অবসাদ আর শিথিলতা জেঁকে বসে মন থেকে মনে, শরীর থেকে শরীরে। তবে যদি ঠিকঠাক জানা থাকে কোথায় গেলে এ অবস্থার উত্তরণ ঘটানো যাবে, উল্লাসে মাতা যাবে, তখন মনের উচ্ছ্বাস ধরে রাখার উপাদান সংগ্রহ করে নেওয়া যেতে পারে নিভৃতে ঘটে চলা কোনো উত্সব থেকেও।

বলছি শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতিতে অনন্য বৃহত্তর যশোর জেলার বাঘারপাড়ার কথা। যশোর সদর থেকে যার দূরত্ব ২৫ কি. মি.। এ স্থানের পূর্ব নাম বাঘেরপাড়া, এক সময় এ অঞ্চলে বাঘের নিত্য বিচরণ ছিল বলেই এমন নামকরণ হয়েছে। যশোরের অন্য যেকোনো স্থানের চেয়ে এ জনপদটি অপেক্ষাকৃত শান্ত এবং জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশ কম, কিন্তু উত্সব উদযাপনে এ জনপদের মানুষ বেশ আমুদে ও দিলখোলা। ঘোড় দৌড়, ঘুড়ি ওড়ানো, কুস্তি প্রতিযোগিতা ইত্যাদি বঙ্গদেশে খুব পরিচিত বিনোদনের উত্স হলেও তার ব্যাপ্তি কমেছে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে। তবে গতি, রঙ, আর কৌশলের এসব দেশীয় উত্সব জৌলুস ও আদিরূপ না হারিয়ে বাংলার অল্পকিছু স্থানের মতো এখনও টিকে আছে যশোরের বাঘারপাড়া ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে।

নবান্ন শুরু হয়েছে। ফাঁকা ফসলের খেত, ঘোড় দৌড়ের জন্য নবান্নের বিকেল বড়ই মনোরম। পরিবার পরিজন নিয়ে রওনা হলাম বাঘারপাড়ার উদ্দেশ্যে। গন্তব্য দোহাকুলার প্রান্তর। উত্সব স্থানে উপস্থিত হয়ে মোহাচ্ছন্ন হতেই হলো। অত্যন্ত  সাদামাটা আয়োজন শুধুমাত্র মানুষের উপস্থিতিতে হয়ে উঠেছে আড়ম্বরপূর্ণ, আর বিভিন্ন বয়সের মানুষের সরল-সরস আলোচনা এবং ঘোড়ার দৌড় শুরু হওয়ার পূর্ব মুহূর্তের উত্তেজনা যোগ করেছে ভীষণ প্রাণের সঞ্চার। বিশাল প্রান্তরটির পাশে মিঠাপান, গজা, মিষ্টি আর বেলুনের ভ্রাম্যমাণ দোকানগুলোতেও চলছে পুলকিত মানুষের মুখ মিষ্টি করা, উপহার দেওয়া-নেওয়া আর ব্যস্ত বেচাকেনা।

এরইমধ্যে ঘোষণা এলো ঘোড়ার দৌড় শুরু হবে। বিশাল বিস্তীর্ণ প্রান্তরটাই অজস্র মানুষের গুঞ্জন উঠল। এমনকি প্রান্তরটার বিভিন্ন স্থানে খেজুর গাছগুলোতে দেখা গেল রসের হাঁড়ির স্থলে কোলাকুলি করে ঝুলছে শিশু-কিশোরের দল, যেন তারাই প্রথমসারির দর্শক এবং এই অসাধারণ ক্রীড়া নৈপুণ্য বিশেষভাবে প্রত্যক্ষ করে মুখ্য সমালোচকবৃন্দের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে।

অপেক্ষার পালা শেষে দৌড় আরম্ভ হলো। এ যেন নিদারুণ ক্লান্তিকর পথ পাড়ি দিয়ে প্রবল আনন্দের আশ্রয় পাওয়া। প্রচণ্ড হৈ-হুল্লোড়ের শব্দ মানুষে মানুষে ছুঁয়ে তরঙ্গের মতো বিস্তার করছে চারদিকে। যেন বাঁধনহারা কিছু ঘোড়ার সঙ্গে হাজারও মানুষের চিত্তের মুক্তি ঘটল। মুক্ত মানুষ, গতির উন্মাদনা, বিজয়ের সম্ভাবনা সব একাকার হয়ে একটা মিশ্র অনুভূতির আবেশে আবদ্ধ হলাম। তবে বোধ করি এমন আয়োজনে আসলে যে কেউ মেনে নেবেন গতির অপর নাম চার চাকার পরশে, ল্যাম্বারগিনি, মার্সিডিজ বেঞ্জ, রোলস-রয়েস ইত্যাদি না হয়ে চার পায়ের তুফান, বিজলি, বাহাদুর, রাজা ইত্যাদিও হতে পারে এবং বাহারেও তারা কম যায় না।

অতঃপর নবান্নের আরেকটি বিকেলের সমাপ্তি ঘটতে চললো। সূর্যটা হেলে পড়েছে এই বিশাল প্রাণবন্ত ভূ-স্বর্গের পশ্চিমের পাশের গাছপালার আড়ালে। আবার একটা দিন মুক্ত থাকার, ভালো থাকার প্রেরণায় সবেমাত্র মুক্তির স্বাদ পাওয়া মানুষের দল ঘরে ফিরে যাবে। ঘোড়াগুলোও যাবে ক্ষণিকের বিশ্রামে। তারাও ছুটে চলেছে কালের আবর্তনে হয়তো সোনারগাঁও থেকে পলাশীতে।