শীতে অপরূপা চর কুকরি মুকরি

আপডেট : ২২ ডিসেম্বর ২০১৯, ২০:৫৩

সোলায়মান হাজারী ডালিম

 

ফেনী থেকে যাত্রা শুরু করে নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর মজু চৌধুরী লঞ্চ-ফেরিঘাট হয়ে ভোলার ইলিশা ফেরিঘাটে পৌঁছে ভেবেছিলাম আর হয়তো বেশি পথ নেই, কাছেই চর কুকরি মুকরি। কিন্তু ভোলা শহরে গিয়ে জানতে পারলাম আরো অনেক পথ বাকি। ভোলা জেলা শহর থেকেই ১২০ কিলোমিটারের পথ।

এদিকে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে। তাই সিদ্ধান্ত হলো রাতটা ভোলা শহরে কাটিয়ে সকালেই রওনা দেওয়া যাবে। রাতটা কোনোরকমে কাটিয়ে পরদিন সকালের আলো ফোটার আগেই রওনা করেছিলাম ভোলার চর ফ্যাশন উপজেলার উদ্দেশ্যে। সকাল ৯টায় চর ফ্যাশন পৌঁছে ভাড়ায় একটি মোটর সাইকেল নিয়ে রওনা দেই চর কচ্ছপিয়া ঘাটের উদ্দেশ্যে, সেখান থেকেই নৌকায় করে যেতে হয় চর কুকরিতে। সকাল ১০টা নাগাদ ঘাটে পৌঁছে দেখি নৌকা থেকে নামছে মানুষ। স্থানীয় একজন জানালেন সকাল ১১টা থেকে আরেকটি নৌকা চর কুকরির উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাবে।

অপেক্ষা করছিলাম কখন নৌকা আসবে, সকাল সোয়া ১১টার দিকে নৌকায় উঠতে শুরু করেছে মানুষ। ইঞ্জিনচালিত নৌকাটি ভর্তি হওয়ার পর সকাল সাড়ে ১১টায় চর কচ্ছপিয়া ঘাট ছাড়ে। নৌকার আরেক যাত্রী ষাটোর্ধ খলিলুর রহমান জানালেন দেড় থেকে ২ ঘণ্টায় আমরা গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবো। নৌকায় চলছে আমরাও চলছি, চলতে চলতে হঠাত্ করে শরীরে আরো শীতলতা অনুভব হলো। চোখ চলে যায় নদীপাড়ের সবুজ অরণ্যে। আঁকাবাঁকা খাল ফেরিয়ে আমরা যখন নদীর মোহনায় চোখে পড়ে অপার সৌন্দর্যেও হাতছানি। 

নদীর ঢেউ, নির্মল বাতাস, বাহারি ম্যানগ্রোভ বন, নদীপাড়ের সারিসারি গাছ, দৃষ্টির সীমানার পুরোটা যেন সবুজ আর সবুজ। অপরূপ প্রকৃতির সাজে সাজানো বনভূমি মনে দেখে হলো এ যেন আরেক সুন্দর বন। নৌকা চলতে চলতে ধরা দেয় নানা দৃশ্যপট। বন থেকে কাঠ কেটে নৌকা ভর্তি করে কেউ নিয়ে যাচ্ছে, কেউবা আবার মাছ ধরছে। নদীপাড়ে রাখার গরুর পাল নিয়ে হেঁটে যায় রাখাল। হঠাত্ করে চোখ পড়ে নদীপাড়ে একটি বুনো মহিষ পানি পান করছে। নৌকার আরেক যাত্রী খলিলুর রহমান জানালেন এ বনে মহিষ ছাড়াও শেয়াল, হরিণসহ আরো অনেক ধরনের পশুপাখি রয়েছে। এসব দেখতে দেখতে কখন যে আমরা কুকরি মুকরি ঘাটে এসে পড়েছি আঁচও করতে পারিনি। নৌকার ভাড়া মিটিয়ে যখন কুকরিতে পা রাখছিলাম তখন অন্যরকম অনুভূতি কাজ করছিল। সবুজ দ্বীপ আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপরূপ লীলাভূমি নিবিড় ভালোলাগার এক চিরসবুজ প্রশান্তি ছুঁয়ে যাচ্ছিল।

ঘাট থেকে একটি মোটর সাইকেলযোগে রওনা করেছি কুকরি মুকরি বন-বিভাগের রিসোর্টের উদ্দেশ্যে। যেতে যেতে গল্প হচ্ছিল মোটর সাইকেলের চালক কবিরের সঙ্গে। তিনি জানালেন, ভোলা জেলা শহর থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দূরে অনেকটা সাগরের কোলঘেঁষে মেঘনা ও তেতুঁলিয়া নদীর মোহনায় গড়ে ওঠা এই চর কুকরি মুকরিতেই রয়েছে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য।

কথিত আছে যে, এক সময় এই চরে শুধুমাত্র কুকুর আর ইঁদুর ছাড়া আর তেমন কিছুই চোখে পড়তো না। আর তাই এই চরের নামকরণ হয় চর কুকরি মুকরি। বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে মেঘনা নদীর মোহনায় কুকরি-মুকরির অবস্থান। চারদিকে জলরাশি দ্বারা বেষ্টিত প্রমত্তা মেঘনার উত্তাল ঢেউয়ে পলি জমতে জমতে এ দ্বীপটির জন্ম। জানা যায়, প্রায় ৮শ’ বছরের পুরোনো এই স্বপ্নের দ্বীপ কুকরি মুকরি বর্তমানে অতিপরিচিত নাম।

মিনিট ২০ পরে আমরা পৌঁছাই রিসোর্টে, সেখানে ব্যাগপত্র রেখে ক্যামরা নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম। সহকর্মী ছোটন সাহা জানিয়েছিলেন এখানের দর্শনীয় স্থান নারকেলবাড়িয়া, বালুর ধুম, কেওড়া বাগান, শুঁটকি পল্লী ও চর পাতিলা।

কুকরি মুকরি বাজারে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপ করে জেনে নিলাম আদ্যোপান্ত। বন-বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জানান এ চরের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। তিনি বলেন, ‘এ চরের ইতিহাস বেশ প্রাচীন। ৭০০ বছর আগে এখানে ও মনপুরায় পুর্তগিজ জলদস্যুদের আস্তানা ছিল, কিন্তু কোনো এক সময় এই চরটি পানির তলে হারিয়ে যায়। পরবর্তীতে ১৯১২ সালে এই চরটি আবার জেগে ওঠে। ১৯৭২ সালে ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার কুকুরি মুকুরি চরে বন সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে বনায়ন করার নির্দেশ দিলে ১৯৭৩ সালে বনায়ন শুরু হয়।’

এছাড়া গোটা এলাকাজুড়েই চোখে পড়ে বিপুলসংখ্যক কেওড়া গাছ। মূলত বিশাল এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠা এই সব গাছ আর আশেপাশের নারিকেল গাছ, বাঁশ ও বেত বন মিলেই এখানে তৈরি হয়েছে আকর্ষণীয় একটি ম্যানগ্রোভ বা শ্বাসমূলীয় বনাঞ্চল। বন-বিভাগ ও বিভিন্ন সূত্র জানায়, ভাঙা-গড়ার আবর্তে পড়ে বর্তমান কুকুরি মুকুরি চরে বনায়নের পরিমাণ প্রায় ৭ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে সংরক্ষিত বাগান ৯ হাজার ৪শ’ একর, ৬ ধারায় প্রস্তাবিত ৬ হাজার হেক্টর, বন্যপ্রাণীর অভয়াশ্রম ২১৭ হেক্টর। বসতি ও কৃষি আবাদ আছে প্রায় ৪ হাজার ৮১০ হেক্টর। চরের মানুষের প্রধান পেশা মাছ ধরা ও কৃষিকাজ।

বন কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম জানান, এ চরে চিত্রা হরিণ, বানর, উদ বিড়াল, পাতি শিয়াল, বন্য মহিষ-গরু, বন-বিড়াল, বন মোরগসহ নানা প্রজাতির পশুপাখি রয়েছে। বক, শঙ্খচিল, মথুরা, কাঠময়ূর, কোয়েল, গুঁইসাপ, বেজি, কচ্ছপসহ নানা ধরনের সাপও রয়েছে এ চরে।

বন কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ সেরে বেরিয়ে পড়ি চর দর্শনে। মোটরসাইকেলে করে কিছুদূর যাওয়ার পর চালক নামিয়ে দিলেন, বললেন সামনে কেওড়া বন। বন দিয়ে হেঁটে যেতে হবে শুঁটকি পল্লী ও নারকেলবাড়িয়ায়। সফরসঙ্গী দুলাল তালুকদারকে নিয়ে হাঁটা শুরু করলাম বন দিয়ে। বন ঢুকতেই মনে হয়েছিল যেন সুন্দরবনে ঢুকে পড়ছি। গেওয়া, গরাণ, সুন্দরী ও শ্বাসমূলীয় গাছের বন এটি। প্রায় মিনিট ২০ হাটার পর বন শেষ হলো। তখন বিকেল ৩টা। গহীন বন থেকে বেরিয়ে দেখি এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। শুঁটকি পল্লীতে ব্যস্ত সময় পার করছে জেলেরা। নদী থেকে নৌকাগুলো এসে ভিড়ছে। সেখান থেকে মাছ নামিয়ে খালি মাঠে শুঁটকি বানানোর জন্য শুকাতে দেওয়া হয়েছে। জেলেদের এমন ব্যস্ততা যেন কথা বলার সময়ও কারো নেই।

অনেক কষ্টে একজনের সঙ্গে কথা বলা গেল। তার কাছে জানতে চাইলাম নারকেলবাড়িয়া এবং চর পাতিলার ঠিকানা। তিনি বললেন, নদী পার হলেই নারকেলবাড়িয়া। বিপত্তি দেখা দিলো সেখানেই। সবাইতো ব্যস্ত মাছ শুকাতে, কে পার করে দেবে। শেষে একজনকে রাজি করানো গেল, যিনি আমারে নদী পার করে দিলেন। নদীর ওপাড়ের রূপ আরো মুগ্ধতার। নদীপাড় যেন শুভ্রতায় মোড়ানো। কারণ সাদা বকের সমারোহ সেখানে। রয়েছে শীতের অতিথি পাখিও। অন্যপাড়ে ম্যানগ্রোভ বন। এসব দেখে যে কারোই মনে হতে পারে সুন্দরবন এসে পড়েছি। 

ঢাকা থেকে আসা আকাশ নামের আরেক পর্যটক জানালেন এ চরে বেড়ানোর জন্য শীতই উপযুক্ত সময়। কুকরি মুকরির শীতকালের চিত্র মুদ্ধ হওয়ার মতো।  বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখির কলতানে মুখরিত হয়ে ওঠে এসব অঞ্চলের চারপাশ। অতিথি পাখিদের আগমনে চরাঞ্চলগুলো যেন নতুনরূপ ধারণ করে। এছাড়া এখানকার সমুদ্র সৈকতটিও বেশ পরিচ্ছন্ন ও নিরিবিলি। দেশের অন্যান্য পর্যটক কেন্দ্রগুলোর তুলনায় কুকরি-মুকরির চিত্র কিছুটা ভিন্ন ধরনের। মাইলের পর মাইল বৃক্ষরাজির বিশাল বনভূমি কুকরি-মুকরিকে সাজিয়েছে ভিন্নভাবে।

স্থানীয় জেলে আবদুল মজিদ জানালেন চর কুকরি মুকরির ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে একটি খাল। খালটির নাম ভাড়ানি খাল। মেঘনার বিশাল বুক থেকে বয়ে গিয়ে খালটি পড়েছে বঙ্গোপসাগরে। এখানকার ধূ ধূ বালিয়াড়ির ওপর দাঁড়ালে সাগরের শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাবে না। স্থানীয় মানুষ এ স্পটটিকে বালুর ধুম নামে ডাকে।  একটু সামনে এগুলেই ঢাল চর। এরপরই বঙ্গোপসাগর। এখানে উত্তাল ঢেউয়ের আঁছড়ে পড়া দেখলেই মনে পড়ে যাবে কক্সবাজার কিংবা কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের কথা।

এখানে বসেই সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তরর সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। তবে কুকরি মুকরির প্রধান আকর্ষণ সাগরপাড়। এখানে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত কিংবা সূর্য ডোবার দৃশ্য ভ্রমণপিপাসুদের মুগ্ধ করবে।

 

যাওয়ার পথ

ঢাকা থেকে লঞ্চে সরাসরি যেতে পারবেন ভোলা জেলার চরফ্যাশনে। নামবেন বেতুয়া কিংবা গোসাইবাড়ি ঘাটে। সেখান থেকে মোটরসাইকেল কিংবা সিএনজি অটোরিকশা ভাড়া করে চর দক্ষিণ আইচা এলাকার চর কচ্ছপিয়া ঘাটে। এরপর চর কচ্ছপিয়া ট্রলার ঘাট হয়ে আবারো ইঞ্জিন নৌকায় বেশ খানিকটা জলপথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছানো যাবে চর কুকরি মুকরিতে। লক্ষ্মীপুর থেকে যেতে হলে মজু চৌধুরী লঞ্চ ও ফেরিঘাট থেকে লঞ্চ/ট্রলার/স্পিটবোটে ভোলার ইলিশা ঘাট, সেখান থেকে অটোরিকশায় ভোল শহর। শহরের উকিলপাড়ায় চরফ্যাশনের বাসে করে চরফ্যাশন গিয়ে পূর্ব নির্দেশিত পথে যেতে হবে।

 

থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা

এ চরে থাকার ব্যবস্থার মধ্যে চর কুকরি মুকরি বাজারের পাশে বন-বিভাগের একটি রিসোর্ট রয়েছে। সেখানে থাকতে হলে যোগাযোগ করতে পারেন সেখানকার কেয়ারটেকার হানিফের সঙ্গে। এছাড়া থাকতে পারেন ইউনিয়ন পরিষদে। সেজন্য যোগাযোগ করতে হবে হবে চেয়ারম্যানের সঙ্গে। বাজারে হোটেল হানিফ নামের একটি হোটেল রয়েছে। রিসোর্ট আর ইউনিয়ন পরিষদে খাওয়ার ব্যবস্থা না থাকলেও এখানে খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। এছাড়া বাবুল মাঝি নামের একজন তার বাড়িতেই পর্যটকদের জন্য থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। সেখানে স্বল্প খরচে থাকা যায়।