বাইল্যার চরে জোছনাবিলাস

আপডেট : ২২ ডিসেম্বর ২০১৯, ২০:৫৫

 

আহসান জোবায়ের

 

পর্যটনের অপার সম্ভাবনাময় নিঝুম দ্বীপ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ছোট্ট একটি দ্বীপ। নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলায় নিঝুম দ্বীপকে ‘দ্বীপ’ বলা হলেও এটি মূলত একটি চর। স্থানীয়দের ভাষায় নিঝুম দ্বীপকে ‘বাইল্যার চর’ বলে ডাকা হয়। নিঝুম দ্বীপের পূর্ব নাম ছিল চর ওসমান। ওসমান নামের একজন তার মহিষের বাথান নিয়ে প্রথম নিঝুম দ্বীপে বসত গড়েন। তখন এই নামেই এর নামকরণ হয়েছিল। প্রায় ১৪,০৫০ একরের দ্বীপটি ১৯৫০ সালের দিকে জেগে ওঠে। ১৯৭০ সালের আগ পর্যন্ত কোনো লোকবসতি ছিল না, তাই দ্বীপটি নিঝুমই ছিল। পরে হাতিয়ার সাংসদ আমিরুল ইসলাম কালাম এই নাম বদলে নিঝুম দ্বীপ নামকরণ করেন। মূলত বল্লার চর, চর ওসমান, কামলার চর ও চুর মুরি—এই ৪টি চর মিলে নিঝুম দ্বীপ গঠিত। ৭০-এর দশকে এই দ্বীপে বন বিভাগের কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথমে পরীক্ষামূলক ৪ জোড়া হরিণ ছাড়ে। নিঝুম দ্বীপ এখন হরিণের অভয়ারণ্য। ১৯৯৬ সালে হরিণশুমারি অনুযায়ী, হরিণের সংখ্যা ২২ হাজার। নোনা পানি বেষ্টিত নিঝুম দ্বীপ কেওড়া গাছের অভয়ারণ্য। ম্যানগ্রোভ বনের মধ্যে সুন্দরবনের পর নিঝুম দ্বীপকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন বলে অনেকে দাবি করেন।

এই ম্যানগ্রোভ বনটি ভরা জোছনায় অপরূপ রূপ ধারণ করে। পর্যটকদের কাছে নিঝুম দ্বীপে ভরা জোছনায় ক্যাম্পিং ও বার বি-কিউ পার্টি অন্যরকম রোমাঞ্চ অনুভূতি এনে দেয়। সে রোমাঞ্চকর অনুভূতির সাক্ষী হতে আমাদের যাত্রা শুরুই হলো টানটান উত্তেজনার মধ্য দিয়ে। সদরঘাট থেকে লঞ্চ ছাড়ে ঠিক সন্ধ্যা সাড়ে ৫টায়। শুরু হলো আমাদের অ্যাডভেঞ্চার। নদীর বুকে ভেসে ভেসে চাঁদ দেখা, শিরশির ঠাণ্ডা বাতাস সবাইকে কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। লঞ্চের ডেকে কেউ খেলছে কার্ড, কেউ গল্প করছে, কেউ তো আবার ঘুমিয়েই সাবাড়। গ্রুপর অনেকেই ছিলাম একদম অপরিচিত, পরিচয় পর্বও সেরে নিলাম। ভোরে লঞ্চ আমাদের নামিয়ে দিলো হাতিয়ায়।

 

হাতিয়ার তমুরদ্দি ঘাট থেকে ট্রলারে করে রওনা দিলাম নিঝুম দ্বীপ। নোয়াখালী জেলার বঙ্গোপসাগরের সর্ব দক্ষিণে অবস্থিত কাঁদাজল আর লোনা পানির নিস্তব্ধ নিঝুম দ্বীপ। দ্বীপে নেমে তাবু টাঙানো ছিল আমাদের প্রথম কাজ। সন্ধ্যায় লাল টগবগে সূর্যটা প্রকৃতির কোলে হারিয়ে যাওয়ার দৃশ্য মিস করলাম না। গল্প আর জোছনা দেখতে দেখতে রাত পার হয়ে গেল। পরদিন সকালে ট্রলারে করে চৌধুরী খাল পার হয়ে পৌঁছে গেলাম কবিরাজের চরে। নেমেই জঙ্গলে জঙ্গলে হরিণ খুঁজে বেড়ানোর অ্যাডভেঞ্চার শুরু হলো আমাদের। গহীন জঙ্গলের মাঝে কেওড়া গাছের শ্বাসমূল। সুনসান নীরবতায় পার হয়েছি পুরো পথ, যদি হরিণের দেখা পাওয়া যায়! গাছের পাতা নড়েচড়ে, আমরা পা টিপেটিপে এগিয়ে যাই। সামনে থেকে আমাদের গাইড ছেলেটা বলে, সামনেই রয়েছে এক পাল হরিণ। আমরা আরো গভীর জঙ্গলে ঢুকি। নাহ! দেখা নেই হরিণের। অনেক খোঁজাখুঁজির দেখা মিললো হরিণের। যদিও গ্রুপের সবাই দেখার আগেই হরিণের ভোঁ দৌড়। সন্ধ্যার পরপরই সাদা বালির বিচে বসে চাঁদের আলোয় স্নান, মুরগি পুড়িয়ে বার-বি-কিউ আর তুমুল আড্ডা চলেছে রাতভর। সেদিকে অপু ভাইয়ের গানের গলা থামছেই না। একের পর এক গান গেয়ে সবাইকে মুগ্ধ করে যাচ্ছে।

শেষদিনের রাত ছিল রোমাঞ্চে ঠাসা। পূর্ণিমার চাঁদের উপচেপড়া জোছনায় দাঊদাঊ করে জ্বলছে আগুন। আগুনের লালচে আলো তখন কেওড়া বনজুড়ে। আগুন ঘিরে ছোট ছোট তাঁবু। এক অপার্থিব সৌন্দর্যে বুঁদ হয়ে আছে সবাই। শীতের শিরশির বাতাসে সোহেলী আপু, অংকন ভাই, বিজয়, মেহেদী আর আমি বিচের ঠাণ্ডা পানিতে পা ভিজিয়ে এলাম। অন্য দলগুলোও যার যার মতো আড্ডায় ব্যস্ত। পরদিন ছিল ১৬ ডিসেম্বর আমাদের বিজয় দিবস। ঘটা করে পালনও করলাম। ইমন ভাই আগে থেকেই একগাদা ফানুস এনে রেখেছিল। মুহূর্তেই আকাশে উড়ে গেল আমাদের ফানুসগুলো। পরদিন সকাল পেরুতেই রওনা হলাম আবার ঢাকার উদ্দেশ্যে।