না-ফেরার দেশে জনপ্রিয় দুই নির্মাতা

আপডেট : ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৭:৫৫

চলে

যাওয়া

দেশের শোবিজ অঙ্গনে শোকটা যেন দীর্ঘ রূপ নিয়েছে। ব্যান্ড লিজেন্ড আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যু শোক কাটিয়ে না উঠতেই আবার শোকের ছায়া নামালেন কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা আমজাদ হোসেন না-ফেরার দেশে ঠাঁই নিয়ে। তাঁর মৃত্যুর তিন দিনের ব্যবধানে পরপারের যাত্রী হলেন আরেক চিত্রপরিচালক সাইদুল আনাম টুটুল। না ফেরার দেশে চলে যাওয়া এই দুই গুণী নির্মাতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমাদের এ আয়োজন। লিখেছেন

খালেদ আহমেদ

আমজাদ হোসেন 

 

জনপ্রিয় বাংলা চলচ্চিত্র ‘গোলাপি এখন ট্রেনে’, ‘নয়নমণি’, ‘দুই পয়সার আলতা’ কিংবা ‘ভাত দে’ নির্মাণ করে দেশের কোটি কোটি দর্শকের হূদয় জয় করেছেন কিংবদন্তি চিত্রনির্মাতা আমজাদ হোসেন। দেশের চলচ্চিত্রে নতুন ধারার সৃষ্টিকারী এ মানুষটি ছিলেন একাধারে পরিচালক, প্রযোজক, অভিনেতা, চিত্রনাট্যকার, গীতিকার, নাট্যকার ও ঔপন্যাসিক। ১৯৪২ সালের ১৪ আগস্ট তিনি জামালপুরে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবেই শুরু হয় তার সাহিত্য চর্চা। পঞ্চাশের দশকে ঢাকায় এসে সাহিত্য ও নাট্যচর্চার সঙ্গে জড়িত হন। ১৯৬১ সালে মহিউদ্দিন পরিচালিত ‘তোমার আমার’ চলচ্চিত্রে অভিনয় দিয়েই রুপালি পর্দার সঙ্গে যুক্ত হন। এরপর মুস্তাফিজ পরিচালিত ‘হারানো দিন’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তিনি। ১৯৬৩ সালে আমজাদ হোসেনের লেখা নাটক ‘ধারাপাত’ নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন সালাহ উদ্দিন। এতে আমজাদ হোসেন নায়ক হিসেবে অভিনয় করেন। এরপর তিনি জনপ্রিয় চলচ্চিত্র পরিচালক জহির রায়হানের ইউনিটে কাজ শুরু করেন। অভিনয়ের সঙ্গে ‘বেহুলা’র সংলাপও লেখেন। ১৯৬৭ সালে নুরুল হক বাচ্চুর সঙ্গে মিলে নির্মাণ করেন ‘আগুন নিয়ে খেলা’। সে বছরই ‘জুলেখা’ দিয়ে এককভাবে পরিচালনায় আসেন তিনি। এরপর জহির রায়হান প্রযোজিত ও মোস্তফা মেহমুদ, রহিম নেওয়াজ ও নুরুল হক বাচ্চুর সঙ্গে পরিচালনা করেন ‘দুই ভাই’ ছবিটি। ১৯৬৯ সালে করাচি থেকে ফিরে জহির রায়হান আমজাদ হোসেনের সঙ্গে আবার যুক্ত হলেন এবং দুজনে মিলে নির্মাণ করেন কালজয়ী ঐতিহাসিক ছবি ‘জীবন থেকে নেয়া’। স্বাধীনপরবর্তী বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এই গুণী মানুষটি। একে একে তিনি নির্মাণ করেন ‘বাল্যবন্ধু’, ‘পিতাপুত্র’, ‘এই নিয়ে পৃথিবী’, ‘নয়নমণি’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘সুন্দরী’, ‘কসাই’, ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’, ‘দুই পয়সার আলতা’, ‘সখিনার যুদ্ধ’, ‘ভাত দে’, ‘হীরামতি’, ‘প্রাণের মানুষ’, ‘সুন্দরী বধূ’, ‘কাল সকালে’, ‘গোলাপী এখন ঢাকায়’, ‘গোলাপী এখন বিলেতে’ নামের দর্শকপ্রিয় চলচ্চিত্রগুলো। তার নির্মিত ‘ভাত দে’ ছবিটি এক অসহায় দরিদ্র বাউল শিল্পীর মেয়ে জরির করুণ কাহিনির সফল চিত্ররূপ। আমজাদ হোসেন নির্মিত ‘দুই পয়সার আলতা’ ও ‘ভাত দে’ ছবির জন্য কিংবদন্তি নায়িকা শাবানা শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেছিলেন। ১৯৭৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘নয়নমণি’ ছবিটিতে ফারুক-ববিতার প্রেম সবাইকে মুগ্ধ করেছিল। লেখালেখির মাধ্যমেই শুরু হয়েছিল তার সৃজনশীল জীবন। তার প্রথম কবিতা ছাপা হয় পশ্চিমবঙ্গের ‘দেশ’ পত্রিকায়। লিখেছেন গল্প, উপন্যাস, জীবনী, ইতিহাসসহ বিভিন্ন গ্রন্থ। এর মধ্যে উপন্যাস :‘ধ্রূপদী এখন ট্রেনে’, ‘দ্বিধাদ্বন্দ্বের ভালোবাসা’, ‘আমি এবং কয়েকটি পোস্টার’, ‘রক্তের ডালপালা’, ‘ফুল বাতাসী’, ‘রাম রহিম’; মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস :‘যুদ্ধে যাবো’, ‘উত্তরকাল, ‘যুদ্ধযাত্রার রাত্রি’; জীবনীগ্রন্থ ‘মওলানা ভাসানীর জীবন ও রাজনীতি’, ‘নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর জীবন ও রাজনীতি’; কিশোর উপন্যাস :‘জন্মদিনের ক্যামেরা’, ‘জাদুর পায়রা’, ‘ভূতের রাণী হিমানী’, ‘সাত ভূতের রাজনীতি’; গল্পগ্রন্থ :‘পরী নামা জোছনায় বৃষ্টি’, ‘কৃষ্ণলীলা’ উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া ছোটদের জন্য তিনি অসংখ্য ছড়া ও গল্প লিখেছেন। তিনি ‘নকালবাড়ী কৃষক আন্দোলন’, ‘বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস’, ‘বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস’-এর মতো ইতিহাসভিত্তিক গ্রন্থও রচনা করেছেন। সাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি ২০০৪ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। আমজাদ হোসেন অসংখ্য কালজয়ী গান লিখেছেন। ‘আছেন আমার মোক্তার, হায়রে কপাল মন্দ চোখ থাকিতে অন্ধ’, ‘কেউ কোনোদিন আমারে তো কথা দিলো না’, ‘একবার যদি কেউ ভালোবাসত’, ‘বাবা বলে গেলো আর কোনোদিন গান করো না’, ‘এমন তো প্রেম হয়’সহ বহু গান তিনি লিখেছেন। শুধু চলচ্চিত্রই নয়, বাংলাদেশ টেলিভিশনের একজন গুণী নাট্যনির্মাতা ও অভিনেতা হিসেবেও আছে আমজাদ হোসেনের ছিলেন সমাদৃত। ৮০-র দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের ঈদের নাটক বলতে ছিল আমজাদ হোসেনের লেখা, পরিচালনায় ও অভিনয়ে ‘জব্বার আলী’ নাটকটি। যা সেই সময়ে বিপুল দর্শকপ্রিয়তা পায়। আমজাদ হোসেন নিজেই অভিনয় করেছেন জব্বার আলী চরিত্রে। চলচ্চিত্রে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ১৯৯৩ সালে একুশে পদক পান। তার পরিচালিত ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ ছবিটি চার দশক ধরে বাংলা চলচ্চিত্রের সর্বাধিক শাখায় ৯টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের রেকর্ড ধরে রেখেছিল। এরপর ‘ভাত দে’ ছবিটি ৯ শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে। ছয়টি বাচসাস পুরস্কার অর্জন করেছেন তিনি।

 

 

 

সাইদুল আনাম টুটুল

 

চিত্র সম্পাদক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন সাইদুল আনাম টুটুল। ১৯৭৯ সালে শেখ নিয়ামত আলী পরিচালিত ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ চলচ্চিত্রের সম্পাদনার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। ২০০৪ সালে চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে পেয়েছেন ফজলুল হক স্মৃতি পুরস্কার। এ ছাড়াও সালাউদ্দিন জাকির ‘ঘুড্ডি’, শেখ নিয়ামত আলীর ‘দহন’, মোরশেদুল ইসলামের ‘দীপু নাম্বার টু’ ও ‘দুখাই’ ছবির সম্পাদনা করেন। চলচ্চিত্র সম্পাদনার পাশাপাশি তিনি চলচ্চিত্র ও নাটক পরিচালনা করেছেন। তার পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র আধিয়ার ২০০৩ সালে মুক্তি পায়। ১৯৪৬-৪৭ সালের বাংলার কৃষক চাষিদের তেভাগা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে চলচ্চিত্রটির কাহিনি লিখেছেন গিয়াসউদ্দিন সেলিম। এরপর তিনি নাটক নির্মাণে মনসংযোগ করেন। ২০০৯ সালে তার নির্মিত তিনটি নাটক ‘বখাটে’, ‘আপন পর’ ও ‘নিশিকাব্য’ জনপ্রিয়তা লাভ করে। সাইকেল চালিয়ে জীবিকা অর্জন করে এমন একটি পরিবারের গল্প নিয়ে ২০১১ সালে নির্মাণ করেন এক পর্বের নাটক ‘হেলিকপ্টার’। এতে সাইকেল চালকের ভূমিকায় অভিনয় করেন আজিজুল হাকিম। এরপর তার নির্মিত উল্লেখযোগ্য নাটকসমূহ হলো ‘৫২ গলির এক গলি’, ‘দায়মার সন্তানেরা’, ‘অপরাজিতা’, ‘মৃতের প্রত্যাবর্তন’, ‘শিউলিমালা’, ‘কুটে কাহার’, ‘গোবরা চোর’। ২০১৪ সাল থেকে তিনি এটিএনবাংলা ও ব্যাকড্রপ লিমিটেডের যৌথ আয়োজনে নির্মিত এটিএনবাংলায় প্রচারিত টেলিভিশন নাটক বিষয়ক রিয়েলিটি শো ‘রয়েলে টাইগার নাট্যযুদ্ধ’-এর বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছেন। সাইদুল আনাম টুটুল ডিরেক্টরস গিল্ডের প্রথম সাধারণ সম্পাদক ও আজীবন সদস্য। সর্বশেষ তিনি শুরু করেছিলেন তার দ্বিতীয় সিনেমা ‘কালবেলা’র কাজ। এর মাধ্যমে দীর্ঘ ১৫ বছর পর চলচ্চিত্রের পরিচালনায় ফিরেছিলেন এই নির্মাতা। আইন ও সালিশ কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত ‘নারীর ৭১’ ও ‘যুদ্ধপরবর্তী কথ্য কাহিনি’ বই থেকে ‘কালবেলা’ ছবির গল্প নেওয়া হয়েছে। ছবিটি প্রযোজনা করছে সাইদুল আনাম টুটুলের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘আকার’। কিন্তু, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সরকারি অনুদানে ‘কালবেলা’ ছবিটির কাজ শেষ না করেই স্মৃতি হয়ে গেলেন এই বরেণ্য নির্মাতা।