শফিকুর রহমান রয়েল
অতিসম্প্রতি আন্দোলনের প্রবাহ বইছিল ইরানে। বাজেট ঘাটতিকে সামাল দিতে গিয়ে আচমকা গ্যাসের দাম বাড়ানোতেই এই পরিণতি; অথচ সরকারের সামনে এছাড়া আর কোনো রাস্তাই খোলা ছিল না। এখানে প্রধান আসামি হচ্ছে সময়। গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি করা হলো এমন একটা সময়ে, যখন উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও ঋণাত্মক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে খাবি খাচ্ছে ইরানিরা। কিন্তু সরকার তো এত সব বোঝে না বা ইচ্ছে করেই বুঝতে চাইছে না। ক্ষুব্ধ প্রতিবাদকারীরা সরকারি স্থাপনাসহ অনেক ব্যাংকে আগুন ধরিয়ে দিল। এমতাবস্থায় স্বাভাবিক ও স্বভাবসুলভ পন্থাই বেছে নিল সরকার। লৌহমুষ্টিতে জবাব দেওয়ার পরিণাম হচ্ছে ২০০রও বেশি প্রতিবাদকারীকে হত্যা, কয়েক হাজার গ্রেফতার এবং এক সপ্তাহের জন্যে দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া।
সরকার-বিরোধী সভা-সমাবেশই যে জায়গায় নিষিদ্ধ, সেখানে সরকারের বিপক্ষে বহুবিস্তৃত প্রতিবাদই বলে দেয় বিষয়টা কতোটুকু মারাত্মক। কিন্তু এসব আন্দোলনের মানে বোঝার জন্য এই দুটি বিষয় জানা জরুরি যে, কী প্ররোচিত করেছিল আন্দোলনকারীদের আর কেনই বা তারা সোত্সাহে যোগ দিয়েছিল আন্দোলনে? আন্দোলনকারীদের নিজেদের নিমিত্তেই তাদের পরিচিতি ও এজেন্ডা জানাটা খুবই জরুরি, যদিও সেগুলো খুবই কঠিন। ইরান হচ্ছে এমন এক দেশ, যারা বরাবরই থাকে স্পটলাইটে এবং প্রায়ই যাদেরকে ভুল বোঝা হয়।
এখানে প্রতিটি আন্দোলনকারীকে প্রশ্ন করা কিংবা বিশ্বস্ততার সঙ্গে জনমত জরিপ করা সম্ভব নয়। কিন্তু ইরানের আন্দোলন সম্পর্কে বিশ্বখ্যাত রাজনৈতিক ম্যাগাজিন ফরেন অ্যাফেয়ার্সের গবেষক দলের কাছে এমন কিছু অর্থবহ উপাত্ত রয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে ঐ আন্দোলনের মানচিত্র বেশ ভালোভাবেই মিলে যায়। অন্তত একদিনের জন্যে হলেও আন্দোলন প্রত্যক্ষ করেছে এমন কাউন্টি বা প্রশাসনিক জেলাগুলোকে চিহ্নিত করেছে তারা, অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি ওয়েবসাইটগুলোতে প্রতিবাদকারীদের আপলোড করা ভিডিওর মাধ্যমে। তারপর ঐসব কাউন্টির আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক উপাত্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। একটি সাধারণ লজিস্টিক প্রত্যাবৃত্তি ব্যবহার করে এমন সব নিয়ামক, যেমন নির্বাচনী অংশগ্রহণ, উন্নয়ন, সম্পদ, জনসংখ্যার আকার ও বেকারত্বের হার আন্দোলনের প্রাদুর্ভাবে কতটা প্রভাব ফেলে তার হিসেব বের করে ফেলতে তারা সমর্থ হন।
তাদের গবেষণা দেখিয়ে দেয় যে, আন্দোলনের চলমান ঢেউ ভৌগোলিকভাবে বহুবিস্তৃত এবং তীব্র অর্থনৈতিক পীড়ার চেয়েও বেশি কিছুর দ্বারা প্ররোচিত। তারা খুঁজে পান ইরানের মোট কাউন্টির ২০.৫ শতাংশে (৪২৯ এর মধ্যে ৮৯) আন্দোলনের ঢেউ কমপক্ষে একদিনের জন্যে হলেও ছড়িয়ে পড়েছিল। অর্থনৈতিক দুর্দশা প্রাথমিক ক্ষোভের কর্মসূচিতে স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়েছিল ঠিকই। কিন্তু আন্দোলন শুরু হয়ে যাওয়ার পর তা মোড় নিয়ে আবির্ভূত হলো আরো গভীরতার সঙ্গে। সার্বিকভাবে বেআইনি ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের প্রতি অসন্তুষ্টি আর গোপন রাখা সম্ভব হলো না। প্রকৃতপক্ষে তাদের ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোয় বিশেষত ২০১৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যে সমর্থন অর্জন করেছিল,ঐ সমর্থন এখন ক্ষয়িত।
ঠিক কী ঘটেছে, তা জানার জন্য আন্দোলনসমূহের ভৌগোলিক বিন্যাস একটা সূত্র বলে দেয়। দেশের যেসব অঞ্চল পেট্রোলিয়ামের মূল্য বৃদ্ধি প্রতিহত করেছিল, তার সবগুলোই সরকারের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নমূলক কর্মসূচির দ্বারা সবচেয়ে বেশি সুবিধা ভোগ করেছে। সরকার বরাবরের মতো এবারও জোর দিয়েই বলছে যে, এই আন্দোলন ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে নিছক ষড়যন্ত্র। কিন্তু গবেষকদের বিশ্লেষণ বলে, দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নমূলক ও কল্যাণ কর্মসূচিগুলোর মাধ্যমে ইসলামি প্রজাতন্ত্র এমন অধিবাসীদেরকেই ক্ষমতা প্রদান করেছে, যারা এখন নব্য উদারনীতিবাদী নীতিগুলোকে প্রতিহত করে, যেমন জ্বালানি ভর্তুকি কর্তন। তাদের বিশ্লেষণ নিরীক্ষণের জন্য আরো পদ্ধতিগত সমর্থন সরবরাহ করে যে, ইরানের যুববাহিনীই সরকার-বিরোধী আন্দোলনের উেস পরিণত হয়েছে। যতোক্ষণ পর্যন্ত না সরকার জনসংখ্যার এই অংশের চাহিদা ও দাবিগুলো চিহ্নিত করতে না পারবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ফের বিদ্রোহের সম্ভাবনা থেকেই যাবে।
ইরানের শীর্ষ নেতা আয়াতোল্লা আল খামেনি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতি সমর্থন প্রদর্শনের উপায় হিসেবে নির্বাচনগুলোয় মোটামুটি ভোটসালিসি করেন। নাগরিকদের জন্য, আপাতদৃষ্টিতে ভোট হচ্ছে পদ্ধতির মধ্যে থেকে নিজের প্রাধান্য প্রকাশ এবং স্বার্থকে অগ্রসর করার প্রাপ্য মাধ্যমগুলোর একটি। কিন্তু অন্য নির্বাচনী স্বৈরাচারী সরকারের নাগরিকদের মতোই অনেক ইরানি ভোটার বিতর্কে মেতে ওঠেন এই নিয়ে যে, ভোট প্রকৃতপক্ষে তাদের সামনে অর্থবহ বিকল্প পেশ করছে কি না ; সুনির্দিষ্ট কোনো নির্বাচনে মধ্যপন্থি বা বাহুল্যবর্জিত প্রার্থীকে ভোট দিয়ে সরকারকে আরো গণতান্ত্রিক ও উদার অভিমুখে ঠেলে দেওয়ার ব্যাপারে সাহায্য করতে পারেন কি না এবং অন্ততপক্ষে কট্টরপন্থিদের কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিহত করা যায় কি না? অসংখ্য ইরানির বিশ্বাস, নির্বাচনে অংশগ্রহণ কেবলমাত্র সরকারের বৈধতার দাবিতে অবদান রাখে। এসব কারণেই গবেষকদের কাছে ভোটদানের হারের উপাত্ত এবং নির্বাচনী বিকল্পসমূহকে রাষ্ট্রের দিকে জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার সঠিক মাধ্যম বলে মনে হয়েছে। গবেষকরা ১৯৯৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ভোটদানের হারকে ব্যবহার করেছেন ইরানের নাগরিকদের কোন পরিসর বিশ্বাস করে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠানসমূহই তাদের চাহিদাগুলো পূরণের পাশাপাশি সকল দুর্দশা দূর করতে পারে, তা নির্ধারণে সহযোগিতার প্রশ্নে। নাগরিকদের মধ্যে যারা নির্বাচনে অংশ নেয় না, তারা খুব সম্ভবত বিশ্বাসই করে না যে, সরকার যেসব প্রণালী প্রদান করছে সেগুলো তাদের জন্য কার্যকর হতে পারে। তারা খুঁজে পেয়েছেন, নির্বাচনে অংশ নেওয়ার নিম্নতর হারের কাউন্টিগুলো অন্তত একদিনের জন্যে হলেও আন্দোলন প্রত্যক্ষ করেছে। ২০১৭ সালের নির্বাচনে প্রতিবাদে অংশ নেওয়া কাউন্টিগুলোয় অপ্রতিবাদী কাউন্টিগুলোর তুলনায় গড়ে ভোট পড়েছিলো ১৩ শতাংশ কম। মানতে দ্বিধা নেই, অর্থনৈতিক পীড়াগুলো আন্দোলনকে প্ররোচিত করতে সম্ভাব্য ছিল ঐসব অঞ্চলে, যেগুলোয় পুরো ব্যবস্থা নিয়ে হতাশা ছিল সর্বজনিক রোগ। পরিষ্কারভাবে বোঝানোর জন্য এই আবিষ্কারের ব্যাখ্যাটা এমনভাবে দেওয়া যেতে পারে যে, অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার কারণে পুরো ব্যবস্থা নিয়ে হতাশাকে টেনে নিয়েছিল ইতিবাচক আন্দোলন কর্মসূচির দিকে।
গবেষকদের আবিষ্কারকে আরো আকর্ষণীয় মনে হয়, যখন একই বিশ্লেষণ করা হয় এর আগের (২০১৭-২০১৮) আন্দোলন প্রবাহ নিয়ে। ঐ সময়ে নির্বাচনী ভোটের হার নির্দিষ্ট কাউন্টিতে আন্দোলনের বলিষ্ঠ নির্ণায়ক ছিল না। এই পার্থক্যের একটা সম্ভাব্য কারণ হচ্ছে, তখন আন্দোলনকে ছড়িয়ে দিতে ইন্টারনেট পালন করেছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। যে কারণে ঐ আন্দোলনের প্রবাহের মানচিত্র রাজনৈতিক অসন্তোষের মানচিত্রের সঙ্গে মিল খায় না। এ বছরে আন্দোলনের তরঙ্গের সময় ইন্টারনেট বন্ধ ছিল বলে কেবলমাত্র গভীরতা ও অর্থনৈতিক দুর্দশার রাজনীতিকীকরণ আন্দোলনকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে পারত।
২০১৭ সালের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট হাসান রৌহানি ছিলেন সংস্কারবাদী-সমর্থিত একমাত্র প্রার্থী; লড়েছিলেন ইব্রাহিম রাইসির বিপক্ষে, তিনি ছিলেন কট্টরপন্থি অংশের মূল প্রার্থী। মজার ব্যাপার হচ্ছে, যেসব কাউন্টিতে ব্যাপক ভোট পেয়েছিলেন হাসান রৌহানি, তার সব কটিতেই এবার কমপক্ষে একদিনের জন্যে হলেও বিক্ষোভ চলেছে। আন্দোলনে অংশ নেওয়া কাউন্টিগুলোয় রৌহানির প্রাপ্ত ভোট গড়ে ৫৯ শতাংশ, আর আন্দোলনে অংশ না নেওয়া কাউন্টিগুলোতে তিনি পেয়েছিলেন ৫১ শতাংশ ভোট। এর মানে দাঁড়াচ্ছে, তার ওপর বেশি ভরসা করা লোকেরাই আশাহত হয়ে নেমে পড়েছিল রাস্তায়। আপন লোকে কষ্ট দিলে একটু বেশি লাগে বলেই হয়তো চটে গিয়ে চলমান নির্বাচনী পদ্ধতিকেই তারা সমূলে উপড়ে ফেলতে চাইছে।
