স্মৃতিভ্রংশ রোধে সচেতনতা প্রয়োজন

আপডেট : ২২ ডিসেম্বর ২০১৯, ২১:৪৯

দ্য টেলিগ্রাফে চার বত্সর পূর্বে প্রকাশিত একটি রিপোর্ট হইতে জানা যায়, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান (১৯৮১ থেকে ১৯৮৯) ডিমেনশিয়ার কঠিন সমস্যায় আক্রান্ত হন। তিনি এমন বিস্মৃতির অতলে তলাইয়া যাইতে থাকেন যে, তিনি যে কোনো দিন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তাহাই ভুলিয়া যাইতেন! সম্প্রতি ইত্তেফাকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, বর্তমান বিশ্বে ৫ কোটি মানুষ ডিমেনশিয়া রোগে আক্রান্ত। ২০৫০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা দাঁড়াইবে ১৫ কোটিরও অধিক। দুশ্চিন্তার কথা হইল, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে এই রোগের প্রকোপ অধিক। আর সেই কারণে এই রোগে আক্রান্ত ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলির মধ্যে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করিতেছেন, বাংলাদেশে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ১০ লক্ষেরও অধিক।

সাধারণত পার্থিব জীবনের নিত্যদিনের টানাপোড়েনে অল্পবিস্তর ভুলিয়া যাওয়াটাই স্বাভাবিক। ভুলিয়া যাওয়া মস্তিষ্কের একধরনের ব্যাধি—ইংরেজিতে সাধারণার্থে যাহাকে ‘ডিমেনশিয়া’ হিসাবে অভিহিত করা হয়। ডিমেনশিয়ার অসংখ্য ধরন রহিয়াছে। ইহার মধ্যে রহিয়াছে আলঝাইমার্স, ভাস্কুলার ডিমেনশিয়া, ফ্রন্টো-টেম্পোরাল ডিমেনশিয়া, লিউই বডি ডিমেনশিয়া ইত্যাদি। ডিমেনশিয়ার প্রধান সমস্যা হইল ইহার কারণে মানুষের স্মৃতি, চিন্তাভাবনা, কর্মক্ষমতা, আচার-ব্যবহার, ব্যক্তিত্ব, আবেগের প্রকাশ ইত্যাদির ওপর নিদারুণ আঘাত আসিয়া থাকে। মস্তিষ্কের এই অবক্ষয়জনিত রোগটি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আগে হইতে বোঝা যায় না। কিছু কিছু উপসর্গের মাধ্যমে ডিমেনশিয়া ক্রমশ প্রকাশ পাইতে থাকে। বয়সজনিত কারণে ভুলিয়া গেলে ধামাচাপা দেওয়ার তাগিদটা থাকে না। অথচ অ্যালঝাইমার্স রোগীদের ক্ষেত্রে অবচেতনভাবেই রোগীরা বানাইয়া বানাইয়া ‘কিছু একটা’ বলিয়া নিজের স্মৃতিশক্তির অক্ষমতা ঢাকিবার চেষ্টা করেন অনেক ক্ষেত্রে। হয়তো দেখা যায় একদিন তিনি ব্যাংকে যান নাই, অথচ বেমালুম বলিয়া দিলেন যে তিনি ব্যাংকে গিয়াছেন। ব্যাংকের নাম ভুলিয়া গিয়া তিনি হয়তো মনগড়া এমন একটি নাম বলিলেন, যাহার কোনো অস্তিত্বই নাই। এইভাবে স্মৃতি ঝাপসা হইতে হইতে ক্রমশ লোপ পাইতে থাকে। চেনা লোক, চেনা জিনিস, চেনা জায়গা চিনিতে না পারা, জিনিসপত্র ভুল জায়গায় রাখা, কথা বলিবার সময় খেই হারাইয়া ফেলা, রাস্তায় বাহির হইয়া পথ হারাইয়া ফেলা ইত্যাদি অনেক ক্ষেত্রেই প্রাথমিক উপসর্গ হিসাবে প্রকাশ পায়। তবে সাধারণ ভুলিয়া যাইবার ক্ষেত্রে একজন বয়স্ক মানুষ একটি নাম বা শব্দ ভুলিলে উহা বাড়ির বাহিরের কিছুর সহিত সম্পর্কিত হইতে পারে। নিজের ছেলের, নাতির নাম সাধারণত কেউ ভোলেন না। যুক্তি, বুদ্ধি, বোধও ঠিক থাকে। আলঝাইমার রোগীর কিন্তু তাহা নহে, ইহাদের পরিবারের সহিত সম্পর্কিত বিষয়ও ভুল হইতে পারে। নিজের স্ত্রীর নাম ভুলিয়া যাইতে পারেন, এমনকি কখনো কখনো দেখা যায় নিজের নামও মনে করিতে পারিতেছেন না।

ডিমেনশিয়া নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেন, এই রোগের নির্দিষ্ট কোনো চিকিত্সা নাই। তবে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হইবার ঝুঁকি কমাইয়া আনা সম্ভব সুষম খাদ্য গ্রহণ এবং জীবনযাত্রা পরিবর্তনের মাধ্যমে। তাহা ছাড়া মধুমেহ, উচ্চরক্তচাপ, স্থূলতা অনেক ক্ষেত্রেই ডিমেনশিয়ার প্রভাবক হিসাবে কাজ করে। সুতরাং নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের মাধ্যমে এই সকল সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। ইহার পাশাপাশি প্রয়োজন বিশেষ সচেতনতা।